ইউক্রেন যুদ্ধ থামাতে আন্তর্জাতিক চাপ ও কূটনৈতিক তৎপরতা বাড়লেও ডনেস্ক অঞ্চল নিয়ে মতবিরোধ এখনো সবচেয়ে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। রাশিয়া ও ইউক্রেন—দুই পক্ষই এই অঞ্চলকে নিজেদের জন্য অস্তিত্বগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ মনে করায় সমঝোতার পথ কার্যত বন্ধ হয়ে আছে।
ডনেস্কই কেন মূল দ্বন্দ্বের কেন্দ্র
ডনেস্ক ইউক্রেনের পূর্বাঞ্চলের দনবাস এলাকার অন্যতম প্রধান অঞ্চল। রাশিয়া ইতোমধ্যে দনবাসের আরেক অঞ্চল লুহানস্কের প্রায় পুরোটা নিয়ন্ত্রণে নিলেও ডনেস্কের একটি বড় অংশ এখনো ইউক্রেনের হাতে রয়েছে। রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন চান ইউক্রেন এই অবশিষ্ট অংশ থেকেও সেনা প্রত্যাহার করুক। অন্যদিকে ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কির স্পষ্ট অবস্থান, যুদ্ধ করে রক্ষা করা ভূখণ্ড তিনি স্বেচ্ছায় ছেড়ে দেবেন না।
রাশিয়া ২০২২ সালে একতরফাভাবে ডনেস্কসহ চারটি ইউক্রেনীয় অঞ্চল নিজেদের সঙ্গে যুক্ত করার ঘোষণা দেয়। তবে ইউক্রেন ও পশ্চিমা দেশগুলো সেই গণভোটকে ভুয়া বলে প্রত্যাখ্যান করে। আন্তর্জাতিকভাবে এখনো ডনেস্ককে ইউক্রেনের অংশ হিসেবেই স্বীকৃতি দেওয়া হয়, যদিও পুতিন একে রাশিয়ার ঐতিহাসিক ভূখণ্ড বলে দাবি করে আসছেন।
সামরিক দৃষ্টিকোণ থেকে ডনেস্কের গুরুত্ব
ডনেস্কের যে অংশ এখনো ইউক্রেনের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে, সেখানে স্লোভিয়ানস্ক ও ক্রামাতোরস্কের মতো শক্তভাবে সুরক্ষিত শহর রয়েছে। এই শহরগুলোকে কেন্দ্র করে পরিখা, বাঙ্কার, মাইনফিল্ড ও ট্যাংক প্রতিরোধক ব্যবস্থা গড়ে তোলা হয়েছে। কিয়েভের দৃষ্টিতে এগুলো পুরো ইউক্রেন রক্ষার জন্য ঢাল হিসেবে কাজ করছে। কারণ ডনেস্কের পশ্চিম দিকের ভূপ্রকৃতি তুলনামূলক সমতল, যেখানে রাশিয়ার অগ্রসর হওয়া সহজ হবে।
জেলেনস্কির আশঙ্কা, ডনেস্ক পুরোপুরি হারালে রাশিয়া ভবিষ্যতে আবার শক্তি সঞ্চয় করে ইউক্রেনের ভেতরে আরও গভীরে হামলার সুযোগ পাবে। তাই শান্তিচুক্তির নামে এই অঞ্চল ছেড়ে দেওয়া তার কাছে দীর্ঘমেয়াদি নিরাপত্তার জন্য হুমকি।
দুই পক্ষের ক্ষয়ক্ষতি ও মনস্তাত্ত্বিক চাপ
ডনেস্ক নিয়ে লড়াইয়ে দুই পক্ষই বিপুল প্রাণহানি ও অর্থনৈতিক ক্ষতির মুখে পড়েছে। বাখমুত শহরকে কেন্দ্র করে দীর্ঘ যুদ্ধ রাশিয়ার জন্য এক ধরনের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধে পরিণত হয়, যেখানে হাজার হাজার সেনা নিহত হয়। এই ক্ষতির স্মৃতি দুই পক্ষের জন্যই সমঝোতাকে আরও কঠিন করে তুলেছে।
পশ্চিমা সামরিক বিশ্লেষকদের মতে, বর্তমান অগ্রগতির হারে রাশিয়ার পুরো ডনেস্ক দখল করতে আরও অন্তত এক বছর সময় লাগতে পারে। তবে রাশিয়ার শীর্ষ সামরিক কর্মকর্তারা দাবি করছেন, পুরো ফ্রন্টলাইনেই তারা ধীরে ধীরে এগিয়ে যাচ্ছে।
![]()
ডনেস্কের শিল্প ও সম্পদের ভূমিকা
যুদ্ধের আগে ডনেস্ক ছিল ইউক্রেনের শিল্পের প্রাণকেন্দ্র। কয়লা, ইস্পাত, কোক ও লোহা উৎপাদনের বড় অংশ এখান থেকেই আসত। যদিও যুদ্ধের ফলে অনেক খনি ও কারখানা ধ্বংস হয়েছে, তবু এই অঞ্চলে থাকা বিরল খনিজ, টাইটানিয়াম ও জিরকোনিয়ামের মতো সম্পদ যে কোনো নিয়ন্ত্রকের জন্য ভবিষ্যৎ আয়ের বড় উৎস হতে পারে।
এই কারণে ডনেস্কের ভবিষ্যৎ শুধু সামরিক নয়, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক দিক থেকেও পুতিন ও জেলেনস্কির উত্তরাধিকার নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
সম্ভাব্য সমঝোতার প্রস্তাব ও বাধা
জেলেনস্কি জানিয়েছেন, যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে ডনবাস এলাকাকে নিরস্ত্রীকৃত মুক্ত অর্থনৈতিক অঞ্চল হিসেবে গড়ে তোলার একটি ধারণা আলোচনায় এসেছে। তবে এ বিষয়ে এখনো কোনো আনুষ্ঠানিক ঘোষণা নেই। রাশিয়ার পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, শান্তি চুক্তির আওতায় তারা নিয়মিত সেনার বদলে জাতীয় রক্ষী বাহিনী ও পুলিশ মোতায়েনের কথা ভাবতে পারে, যা ইউক্রেনের কাছে গ্রহণযোগ্য নয়।
রাশিয়ার অবস্থান স্পষ্ট—ডনেস্ক তাদের ভূখণ্ড এবং প্রশাসনও মস্কোর হাতেই থাকবে। এই প্রশ্নে যুক্তরাষ্ট্রও এখনো পরিষ্কার অবস্থান জানায়নি।

আইনি জটিলতা ইউক্রেনের জন্য বড় বাধা
জেলেনস্কি বারবার বলেছেন, তার সাংবিধানিক অধিকার নেই ভূখণ্ড ছেড়ে দেওয়ার। ইউক্রেনের সংবিধান অনুযায়ী, ভূখণ্ড পরিবর্তনের জন্য দেশব্যাপী গণভোট দরকার, যেখানে বিপুল সংখ্যক নাগরিকের সমর্থন থাকতে হবে। সাম্প্রতিক জরিপেও দেখা গেছে, অধিকাংশ ইউক্রেনীয় ডনেস্ক থেকে সেনা প্রত্যাহারের বিপক্ষে।
এই সব কারণ মিলিয়ে ডনেস্ক এখন শুধু একটি ভূখণ্ড নয়, বরং ইউক্রেন যুদ্ধের ভবিষ্যৎ নির্ধারণকারী কেন্দ্রীয় প্রশ্নে পরিণত হয়েছে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















