০৯:৪৪ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ২৭ জানুয়ারী ২০২৬
বিতর্কের বোর্ড প্রজাতন্ত্রে আদিবাসীদের প্রাপ্য কি সত্যিই নিশ্চিত হয়েছে? প্রতীক নয়, ন্যায্যতা: প্রজাতন্ত্রের অসমাপ্ত প্রতিশ্রুতি নিয়ে শৈলজা পাইকের কথা আগাথা ক্রিস্টি কেন আজও রহস্যের রানী ইতিহাসকে নতুন করে দেখার আহ্বান, বৌদ্ধ স্মৃতিস্তম্ভে সত্যের আলো ফেললেন শশাঙ্ক শেখর সিনহা শব্দে শব্দে বিভাজনের বিরুদ্ধে: সাহিত্য উৎসবে সহাবস্থানের সন্ধান পঞ্চান্নে স্বয়ম্বর, মধ্যবয়সে বিদ্রোহ: সোনোরা ঝা উপন্যাসে নারীর আকাঙ্ক্ষার নতুন ভাষা এআইএমএসের লড়াইয়ে সুপারবাগ, অ্যান্টিবায়োটিক ব্যর্থ হলে ভরসা গবেষণা ও দ্রুত শনাক্তকরণ ছাত্রলীগ নেতা সাদ্দামের স্ত্রী ও সন্তানের মৃত্যু, শ্বশুরের করা হত্যা মামলা নির্বাচন বাধাগ্রস্ত করতে একটি পক্ষ উঠেপড়ে লেগেছে: তারেক রহমান

বিতর্কের বোর্ড

গাজা নিয়ে তাঁর শান্তি পরিকল্পনার দ্বিতীয় ধাপ ঘোষণা করতে গিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প একটি জটিল চারস্তরবিশিষ্ট শাসন কাঠামোর কথা জানান। এই কাঠামোর শীর্ষ তিন স্তরেই ফিলিস্তিনিদের কোনো প্রতিনিধিত্ব নেই। তাদের কেবল একটি ‘টেকনোক্র্যাটিক কমিটি’-তে রাখা হয়েছে, যার দায়িত্ব মূলত পৌর প্রশাসনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ।

গাজার শাসনব্যবস্থা তদারকির জন্য গঠিত ‘বোর্ড অব পিস’-এর প্রতিষ্ঠাতা নির্বাহী পরিষদের প্রধান হিসেবে নিজেকেই বসিয়েছেন ট্রাম্প। এই পরিষদে রয়েছেন মূলত ইসরায়েলপন্থী মার্কিন নাগরিকরা, যার মধ্যে তাঁর জামাতা, টনি ব্লেয়ার এবং এক ধনকুবেরও আছেন। মুসলিম বিশ্বের কোনো প্রতিনিধি এখানে নেই। বাস্তবে এটি গাজার ওপর বাইরের শক্তির নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার এক ধরনের ঔপনিবেশিক ব্যবস্থাই নির্দেশ করে। স্বাভাবিকভাবেই ফিলিস্তিনিদের কাছ থেকে এটি তীব্র বিরোধিতার মুখে পড়ে। দ্বিতীয় স্তরে ‘গাজা এক্সিকিউটিভ বোর্ড’ গঠন করা হয়, যেখানে শীর্ষ স্তরের কয়েকজন সদস্যও অন্তর্ভুক্ত।

বিশ্বব্যাপী সবচেয়ে বেশি দৃষ্টি ও বিতর্ক সৃষ্টি করে ট্রাম্পের প্রস্তাবিত আন্তর্জাতিক ‘বোর্ড অব পিস’। এতে ৫৯টি দেশের রাষ্ট্রপ্রধানকে আমন্ত্রণ জানানো হলেও ফিলিস্তিনিদের সম্পূর্ণভাবে বাদ দেওয়া হয়। বোর্ডের সনদ ফাঁস হওয়ার পর কূটনৈতিক অঙ্গনে ঝড় ওঠে। সনদে গাজার কোনো উল্লেখ নেই; বরং এটিকে যুক্তরাষ্ট্রনিয়ন্ত্রিত একটি বৈশ্বিক ‘শান্তি প্রতিষ্ঠা সংস্থা’ হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে, যা আন্তর্জাতিক শান্তি ও নিরাপত্তা রক্ষায় জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের বিকল্প হতে চায়। ট্রাম্প প্রকাশ্যেই বলেছেন, এই বোর্ড জাতিসংঘকে প্রতিস্থাপন করতে পারে। এর আইনগত বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন থাকলেও, এর কার্যপরিধি গাজার বাইরেও বৈশ্বিক সংঘাত মধ্যস্থতার দিকে বিস্তৃত।

সনদে বলা হয়েছে, ‘আরও দ্রুত ও কার্যকর আন্তর্জাতিক শান্তি প্রতিষ্ঠা সংস্থার প্রয়োজন’, এবং ‘যেসব প্রতিষ্ঠান বারবার ব্যর্থ হয়েছে’ তাদের সমালোচনা করা হয়েছে। চেয়ারম্যান হিসেবে ট্রাম্পকে দেওয়া হয়েছে ব্যাপক ক্ষমতা ও ভেটো অধিকার। সব সিদ্ধান্তের জন্য তাঁর অনুমোদন বাধ্যতামূলক এবং বিরোধ নিষ্পত্তিতে চূড়ান্ত কর্তৃত্বও তাঁর হাতে। সদস্য দেশগুলো তিন বছরের মেয়াদে দায়িত্ব পালন করবে এবং গাজার পুনর্গঠনে অর্থ সহায়তা দিতে হবে। যে দেশ এক বিলিয়ন ডলার দেবে, তারা স্থায়ী সদস্যপদ পাবে—যা বিশ্বজুড়ে ন্যায্য সমালোচনার জন্ম দিয়েছে। ট্রাম্পের মেয়াদ শেষ হওয়ার পরও এই সংস্থার অস্তিত্ব থাকবে বলে বলা হয়েছে, যা তাঁর ব্যক্তি ও পরিবারকেন্দ্রিক একটি কাঠামো ভবিষ্যতে কীভাবে টিকে থাকবে—সে প্রশ্ন তোলে।

ট্রাম্পের গাজা পরিকল্পনার দ্বিতীয় ধাপ তাই শুরু থেকেই বিতর্কে ঘেরা এবং এর ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত।

এই সংস্থা গঠনের উদ্দেশ্য স্পষ্ট। এটি মূলত একটি পর্দা, যার মাধ্যমে ট্রাম্প গাজা ও তার বাইরের একতরফা উদ্যোগগুলোর জন্য আন্তর্জাতিক সমর্থন ও বৈধতা দেখাতে চান, অথচ সদস্য রাষ্ট্রগুলোর কোনো বাস্তব ক্ষমতা থাকবে না। অর্থাৎ, সদস্য দেশগুলোর সঙ্গে পরামর্শ ছাড়াই তাঁর ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার জন্য আগাম বৈশ্বিক অনুমোদন নিশ্চিত করা।

Trump plans to announce Gaza government, Board of Peace by Christmas,  officials say

বিভিন্ন কারণে অনেক দেশই ট্রাম্পের আমন্ত্রণে সতর্ক বা সন্দিহান প্রতিক্রিয়া জানায়। গ্রিনল্যান্ড দখলের হুমকিতে ক্ষুব্ধ ফ্রান্স দ্রুতই না বলে দেয়। জবাবে ট্রাম্প ফরাসি ওয়াইনের ওপর শুল্ক বাড়ানোর হুমকি দেন। স্পেন, নরওয়ে, সুইডেন, ডেনমার্ক ও স্লোভেনিয়াও যোগ দিতে অস্বীকৃতি জানায়। রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনকে আমন্ত্রণ জানানোর কারণে যুক্তরাজ্য আপাতত যোগ দিচ্ছে না বলে জানায়। পাকিস্তান ও ইসরায়েল দ্রুত সম্মতি জানালেও, অনেক দেশ জাতিসংঘকে দুর্বল করবে—এমন সংগঠন নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে। জানুয়ারির ২১ তারিখ ডাভোসে স্বাক্ষর অনুষ্ঠানের ঘোষণার পরও বহু দেশ সিদ্ধান্ত ঝুলিয়ে রাখে।

ফিনান্সিয়াল টাইমস-এর বিশ্লেষণে বলা হয়, ডাভোসে বোর্ডের প্রাথমিক সদস্যদের মধ্যে ছিলেন ছয়জন রাজা, সাবেক সোভিয়েত ঘরানার তিন নেতা, সেনাবাহিনী-সমর্থিত দুই শাসনব্যবস্থা এবং একজন নেতা, যিনি যুদ্ধাপরাধের অভিযোগে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের নজরে রয়েছেন। প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, এতে যোগ দেওয়া শুধু আনুগত্য প্রদর্শনের ঝুঁকিই নয়, আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘনের আশঙ্কাও তৈরি করে। দ্য গার্ডিয়ান একে আখ্যা দেয় ‘একজন মানুষের অহংকারের সেবায় নিয়োজিত আন্তর্জাতিক সংস্থা’ হিসেবে। অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল এটিকে আন্তর্জাতিক আইনের প্রতি ‘নির্লজ্জ অবজ্ঞা’ বলে মন্তব্য করে এবং জানায়, এটি জাতিসংঘ, আন্তর্জাতিক বিচারব্যবস্থা ও সার্বজনীন নীতিমালার ওপর ক্রমবর্ধমান আক্রমণের নতুন প্রকাশ।

ডাভোসেই বোর্ডের আন্তর্জাতিক গ্রহণযোগ্যতার প্রথম পরীক্ষা হয়। পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রীসহ ২০টিরও কম দেশ আনুষ্ঠানিকভাবে যোগ দেয়। যদিও কিছু দেশ ডাভোসে উপস্থিত না থেকেও যোগদানের কথা জানায়, তবু উদ্বোধনী অনুষ্ঠানটি ট্রাম্প প্রশাসনের প্রচারের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ কোনো বৈশ্বিক উৎসাহ দেখাতে পারেনি। পশ্চিম ইউরোপের কোনো নেতা উপস্থিত ছিলেন না, যা কার্যত একটি সম্মিলিত বয়কটের ইঙ্গিত দেয়। বিশ্বজুড়ে বোর্ডটির কার্যকারিতা নিয়েও প্রশ্ন ওঠে।

তবে জটিল শাসন কাঠামোর বাইরে, গাজা পরিকল্পনার দ্বিতীয় ধাপ বাস্তবায়নে নেওয়া পদক্ষেপগুলোই শেষ পর্যন্ত সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। পরিকল্পনাকে বাস্তব পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হবে। এখানে দেখা যাচ্ছে, যুদ্ধবিরতির প্রথম ধাপে ইসরায়েল পূর্ণভাবে তা মানেনি। অক্টোবর থেকে কার্যকর যুদ্ধবিরতির পরও ইসরায়েলি বাহিনী প্রতিদিন তা লঙ্ঘন করেছে এবং ৪৫০-এর বেশি ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছে। সহায়তার ওপর কঠোর বিধিনিষেধ গাজার মানবিক সংকট লাঘব করতে পারেনি। পশ্চিম তীরে ইসরায়েলি হামলা ও বসতি স্থাপনকারীদের সহিংসতা ফিলিস্তিনিদের জন্য ভয়াবহ পরিস্থিতি তৈরি করেছে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, গাজা থেকে সেনা প্রত্যাহারের বিষয়ে তেল আবিব এখনো প্রতিশ্রুতিবদ্ধ নয়, যা শান্তি পরিকল্পনার মূল শর্ত। ট্রাম্পের সাম্প্রতিক বক্তব্যে দায় চাপানো হয়েছে মূলত হামাসের ওপর। ডাভোসে তিনি আবারও বলেন, হামাসকে নিরস্ত্র হতে হবে, নইলে তাদের শেষ হবে। ইসরায়েলের গাজা ত্যাগের বিষয়ে তিনি কিছুই বলেননি।

হামাসকে নিরস্ত্র করার প্রশ্নটি এখনো অমীমাংসিত। ফিলিস্তিনি প্রতিরোধ সংগঠনটি স্পষ্ট করেছে, ইসরায়েলি দখল শেষ না হওয়া এবং ফিলিস্তিনি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার নিশ্চয়তা না পাওয়া পর্যন্ত তারা অস্ত্র ত্যাগ করবে না। ইসরায়েলের প্রত্যাহারের প্রতিশ্রুতি ছাড়া নিরস্ত্রীকরণ কীভাবে হবে, তা স্পষ্ট নয়। এর পাশাপাশি রয়েছে প্রস্তাবিত আন্তর্জাতিক স্থিতিশীলতা বাহিনীর বিতর্কিত বিষয়টি। এর ম্যান্ডেট ও যুদ্ধনীতিমালা নির্ধারিত না হওয়ায় কোনো দেশই এখনো সেনা পাঠানোর দৃঢ় অঙ্গীকার করেনি। কেবল একজন মার্কিন মেজর জেনারেলকে বাহিনীর প্রধান করার ঘোষণা এসেছে। হামাস বিদেশি সেনা মোতায়েনের বিরোধিতা করছে, কারণ তারা মনে করে, তাদের নিরস্ত্র করাই যদি লক্ষ্য হয়, তবে এই বাহিনী ফিলিস্তিনি প্রতিরোধের বিরুদ্ধেই কাজ করবে। জাতিসংঘের তত্ত্বাবধানে সীমান্তে মোতায়েন বাহিনী ছাড়া অন্য কোনো ব্যবস্থায় তারা সম্মত নয়।

সব মিলিয়ে স্পষ্ট, ইসরায়েল ও হামাস—এই দুই প্রধান পক্ষের পূর্ণ সমর্থন ছাড়াই একটি পরিকল্পনা বাস্তবায়নে সামনে রয়েছে বহু বাধা। ফিলিস্তিনিরা যখন শান্তি ও ন্যায়ের অপেক্ষায়, তখন এই পরিকল্পনা ভেস্তে গিয়ে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে ওঠার ঝুঁকি থেকেই যাচ্ছে।

লেখক : যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য ও জাতিসংঘে পাকিস্তানের সাবেক রাষ্ট্রদূত।

জনপ্রিয় সংবাদ

বিতর্কের বোর্ড

বিতর্কের বোর্ড

০৮:০০:১৯ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ২৭ জানুয়ারী ২০২৬

গাজা নিয়ে তাঁর শান্তি পরিকল্পনার দ্বিতীয় ধাপ ঘোষণা করতে গিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প একটি জটিল চারস্তরবিশিষ্ট শাসন কাঠামোর কথা জানান। এই কাঠামোর শীর্ষ তিন স্তরেই ফিলিস্তিনিদের কোনো প্রতিনিধিত্ব নেই। তাদের কেবল একটি ‘টেকনোক্র্যাটিক কমিটি’-তে রাখা হয়েছে, যার দায়িত্ব মূলত পৌর প্রশাসনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ।

গাজার শাসনব্যবস্থা তদারকির জন্য গঠিত ‘বোর্ড অব পিস’-এর প্রতিষ্ঠাতা নির্বাহী পরিষদের প্রধান হিসেবে নিজেকেই বসিয়েছেন ট্রাম্প। এই পরিষদে রয়েছেন মূলত ইসরায়েলপন্থী মার্কিন নাগরিকরা, যার মধ্যে তাঁর জামাতা, টনি ব্লেয়ার এবং এক ধনকুবেরও আছেন। মুসলিম বিশ্বের কোনো প্রতিনিধি এখানে নেই। বাস্তবে এটি গাজার ওপর বাইরের শক্তির নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার এক ধরনের ঔপনিবেশিক ব্যবস্থাই নির্দেশ করে। স্বাভাবিকভাবেই ফিলিস্তিনিদের কাছ থেকে এটি তীব্র বিরোধিতার মুখে পড়ে। দ্বিতীয় স্তরে ‘গাজা এক্সিকিউটিভ বোর্ড’ গঠন করা হয়, যেখানে শীর্ষ স্তরের কয়েকজন সদস্যও অন্তর্ভুক্ত।

বিশ্বব্যাপী সবচেয়ে বেশি দৃষ্টি ও বিতর্ক সৃষ্টি করে ট্রাম্পের প্রস্তাবিত আন্তর্জাতিক ‘বোর্ড অব পিস’। এতে ৫৯টি দেশের রাষ্ট্রপ্রধানকে আমন্ত্রণ জানানো হলেও ফিলিস্তিনিদের সম্পূর্ণভাবে বাদ দেওয়া হয়। বোর্ডের সনদ ফাঁস হওয়ার পর কূটনৈতিক অঙ্গনে ঝড় ওঠে। সনদে গাজার কোনো উল্লেখ নেই; বরং এটিকে যুক্তরাষ্ট্রনিয়ন্ত্রিত একটি বৈশ্বিক ‘শান্তি প্রতিষ্ঠা সংস্থা’ হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে, যা আন্তর্জাতিক শান্তি ও নিরাপত্তা রক্ষায় জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের বিকল্প হতে চায়। ট্রাম্প প্রকাশ্যেই বলেছেন, এই বোর্ড জাতিসংঘকে প্রতিস্থাপন করতে পারে। এর আইনগত বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন থাকলেও, এর কার্যপরিধি গাজার বাইরেও বৈশ্বিক সংঘাত মধ্যস্থতার দিকে বিস্তৃত।

সনদে বলা হয়েছে, ‘আরও দ্রুত ও কার্যকর আন্তর্জাতিক শান্তি প্রতিষ্ঠা সংস্থার প্রয়োজন’, এবং ‘যেসব প্রতিষ্ঠান বারবার ব্যর্থ হয়েছে’ তাদের সমালোচনা করা হয়েছে। চেয়ারম্যান হিসেবে ট্রাম্পকে দেওয়া হয়েছে ব্যাপক ক্ষমতা ও ভেটো অধিকার। সব সিদ্ধান্তের জন্য তাঁর অনুমোদন বাধ্যতামূলক এবং বিরোধ নিষ্পত্তিতে চূড়ান্ত কর্তৃত্বও তাঁর হাতে। সদস্য দেশগুলো তিন বছরের মেয়াদে দায়িত্ব পালন করবে এবং গাজার পুনর্গঠনে অর্থ সহায়তা দিতে হবে। যে দেশ এক বিলিয়ন ডলার দেবে, তারা স্থায়ী সদস্যপদ পাবে—যা বিশ্বজুড়ে ন্যায্য সমালোচনার জন্ম দিয়েছে। ট্রাম্পের মেয়াদ শেষ হওয়ার পরও এই সংস্থার অস্তিত্ব থাকবে বলে বলা হয়েছে, যা তাঁর ব্যক্তি ও পরিবারকেন্দ্রিক একটি কাঠামো ভবিষ্যতে কীভাবে টিকে থাকবে—সে প্রশ্ন তোলে।

ট্রাম্পের গাজা পরিকল্পনার দ্বিতীয় ধাপ তাই শুরু থেকেই বিতর্কে ঘেরা এবং এর ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত।

এই সংস্থা গঠনের উদ্দেশ্য স্পষ্ট। এটি মূলত একটি পর্দা, যার মাধ্যমে ট্রাম্প গাজা ও তার বাইরের একতরফা উদ্যোগগুলোর জন্য আন্তর্জাতিক সমর্থন ও বৈধতা দেখাতে চান, অথচ সদস্য রাষ্ট্রগুলোর কোনো বাস্তব ক্ষমতা থাকবে না। অর্থাৎ, সদস্য দেশগুলোর সঙ্গে পরামর্শ ছাড়াই তাঁর ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার জন্য আগাম বৈশ্বিক অনুমোদন নিশ্চিত করা।

Trump plans to announce Gaza government, Board of Peace by Christmas,  officials say

বিভিন্ন কারণে অনেক দেশই ট্রাম্পের আমন্ত্রণে সতর্ক বা সন্দিহান প্রতিক্রিয়া জানায়। গ্রিনল্যান্ড দখলের হুমকিতে ক্ষুব্ধ ফ্রান্স দ্রুতই না বলে দেয়। জবাবে ট্রাম্প ফরাসি ওয়াইনের ওপর শুল্ক বাড়ানোর হুমকি দেন। স্পেন, নরওয়ে, সুইডেন, ডেনমার্ক ও স্লোভেনিয়াও যোগ দিতে অস্বীকৃতি জানায়। রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনকে আমন্ত্রণ জানানোর কারণে যুক্তরাজ্য আপাতত যোগ দিচ্ছে না বলে জানায়। পাকিস্তান ও ইসরায়েল দ্রুত সম্মতি জানালেও, অনেক দেশ জাতিসংঘকে দুর্বল করবে—এমন সংগঠন নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে। জানুয়ারির ২১ তারিখ ডাভোসে স্বাক্ষর অনুষ্ঠানের ঘোষণার পরও বহু দেশ সিদ্ধান্ত ঝুলিয়ে রাখে।

ফিনান্সিয়াল টাইমস-এর বিশ্লেষণে বলা হয়, ডাভোসে বোর্ডের প্রাথমিক সদস্যদের মধ্যে ছিলেন ছয়জন রাজা, সাবেক সোভিয়েত ঘরানার তিন নেতা, সেনাবাহিনী-সমর্থিত দুই শাসনব্যবস্থা এবং একজন নেতা, যিনি যুদ্ধাপরাধের অভিযোগে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের নজরে রয়েছেন। প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, এতে যোগ দেওয়া শুধু আনুগত্য প্রদর্শনের ঝুঁকিই নয়, আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘনের আশঙ্কাও তৈরি করে। দ্য গার্ডিয়ান একে আখ্যা দেয় ‘একজন মানুষের অহংকারের সেবায় নিয়োজিত আন্তর্জাতিক সংস্থা’ হিসেবে। অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল এটিকে আন্তর্জাতিক আইনের প্রতি ‘নির্লজ্জ অবজ্ঞা’ বলে মন্তব্য করে এবং জানায়, এটি জাতিসংঘ, আন্তর্জাতিক বিচারব্যবস্থা ও সার্বজনীন নীতিমালার ওপর ক্রমবর্ধমান আক্রমণের নতুন প্রকাশ।

ডাভোসেই বোর্ডের আন্তর্জাতিক গ্রহণযোগ্যতার প্রথম পরীক্ষা হয়। পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রীসহ ২০টিরও কম দেশ আনুষ্ঠানিকভাবে যোগ দেয়। যদিও কিছু দেশ ডাভোসে উপস্থিত না থেকেও যোগদানের কথা জানায়, তবু উদ্বোধনী অনুষ্ঠানটি ট্রাম্প প্রশাসনের প্রচারের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ কোনো বৈশ্বিক উৎসাহ দেখাতে পারেনি। পশ্চিম ইউরোপের কোনো নেতা উপস্থিত ছিলেন না, যা কার্যত একটি সম্মিলিত বয়কটের ইঙ্গিত দেয়। বিশ্বজুড়ে বোর্ডটির কার্যকারিতা নিয়েও প্রশ্ন ওঠে।

তবে জটিল শাসন কাঠামোর বাইরে, গাজা পরিকল্পনার দ্বিতীয় ধাপ বাস্তবায়নে নেওয়া পদক্ষেপগুলোই শেষ পর্যন্ত সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। পরিকল্পনাকে বাস্তব পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হবে। এখানে দেখা যাচ্ছে, যুদ্ধবিরতির প্রথম ধাপে ইসরায়েল পূর্ণভাবে তা মানেনি। অক্টোবর থেকে কার্যকর যুদ্ধবিরতির পরও ইসরায়েলি বাহিনী প্রতিদিন তা লঙ্ঘন করেছে এবং ৪৫০-এর বেশি ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছে। সহায়তার ওপর কঠোর বিধিনিষেধ গাজার মানবিক সংকট লাঘব করতে পারেনি। পশ্চিম তীরে ইসরায়েলি হামলা ও বসতি স্থাপনকারীদের সহিংসতা ফিলিস্তিনিদের জন্য ভয়াবহ পরিস্থিতি তৈরি করেছে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, গাজা থেকে সেনা প্রত্যাহারের বিষয়ে তেল আবিব এখনো প্রতিশ্রুতিবদ্ধ নয়, যা শান্তি পরিকল্পনার মূল শর্ত। ট্রাম্পের সাম্প্রতিক বক্তব্যে দায় চাপানো হয়েছে মূলত হামাসের ওপর। ডাভোসে তিনি আবারও বলেন, হামাসকে নিরস্ত্র হতে হবে, নইলে তাদের শেষ হবে। ইসরায়েলের গাজা ত্যাগের বিষয়ে তিনি কিছুই বলেননি।

হামাসকে নিরস্ত্র করার প্রশ্নটি এখনো অমীমাংসিত। ফিলিস্তিনি প্রতিরোধ সংগঠনটি স্পষ্ট করেছে, ইসরায়েলি দখল শেষ না হওয়া এবং ফিলিস্তিনি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার নিশ্চয়তা না পাওয়া পর্যন্ত তারা অস্ত্র ত্যাগ করবে না। ইসরায়েলের প্রত্যাহারের প্রতিশ্রুতি ছাড়া নিরস্ত্রীকরণ কীভাবে হবে, তা স্পষ্ট নয়। এর পাশাপাশি রয়েছে প্রস্তাবিত আন্তর্জাতিক স্থিতিশীলতা বাহিনীর বিতর্কিত বিষয়টি। এর ম্যান্ডেট ও যুদ্ধনীতিমালা নির্ধারিত না হওয়ায় কোনো দেশই এখনো সেনা পাঠানোর দৃঢ় অঙ্গীকার করেনি। কেবল একজন মার্কিন মেজর জেনারেলকে বাহিনীর প্রধান করার ঘোষণা এসেছে। হামাস বিদেশি সেনা মোতায়েনের বিরোধিতা করছে, কারণ তারা মনে করে, তাদের নিরস্ত্র করাই যদি লক্ষ্য হয়, তবে এই বাহিনী ফিলিস্তিনি প্রতিরোধের বিরুদ্ধেই কাজ করবে। জাতিসংঘের তত্ত্বাবধানে সীমান্তে মোতায়েন বাহিনী ছাড়া অন্য কোনো ব্যবস্থায় তারা সম্মত নয়।

সব মিলিয়ে স্পষ্ট, ইসরায়েল ও হামাস—এই দুই প্রধান পক্ষের পূর্ণ সমর্থন ছাড়াই একটি পরিকল্পনা বাস্তবায়নে সামনে রয়েছে বহু বাধা। ফিলিস্তিনিরা যখন শান্তি ও ন্যায়ের অপেক্ষায়, তখন এই পরিকল্পনা ভেস্তে গিয়ে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে ওঠার ঝুঁকি থেকেই যাচ্ছে।

লেখক : যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য ও জাতিসংঘে পাকিস্তানের সাবেক রাষ্ট্রদূত।