ড্যানি কুয়াহ ও আইরিন এনজি
দাভোসে অনুষ্ঠিত বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরামে হার্ড পাওয়ার রাজনীতিই ছিল কেন্দ্রবিন্দু। তবে ‘শক্তিই ন্যায়’—এই ধারণার বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়ার সক্ষমতা ছোট রাষ্ট্রগুলোর একেবারেই নেই, এমন নয়। বরং নিজেদের শক্তি ও দ্রুত অভিযোজনক্ষমতাকে কাজে লাগিয়ে ভবিষ্যতমুখী কৌশল গড়ে তোলাই এখন তাদের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসনের সময় থেকে শুরু হওয়া অর্থনৈতিক ও সামরিক চাপের মুখে ছোট রাষ্ট্র ও মধ্যম শক্তির দেশগুলো দিশেহারা হয়ে পড়েছে বলে মনে করেন লেখকরা। এই বাস্তবতায় সামনে তাকানো কৌশলগত সিদ্ধান্তই হতে পারে তাদের টিকে থাকার মূল চাবিকাঠি।
একটি পরাশক্তি অনেকটা কুমিরের মতো—দেখতে শান্ত হলেও যেকোনো মুহূর্তে তা ভয়ংকর হয়ে উঠতে পারে। সিঙ্গাপুরের প্রথম পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস. রাজরত্নম একবার বলেছিলেন, কুমির যখন দাঁত দেখায়, তখন বোঝা কঠিন সে হাসছে নাকি কামড় বসাতে যাচ্ছে। আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে পরাশক্তির নিষ্ঠুরতা সম্পর্কে তাঁর কোনো ভ্রান্ত ধারণা ছিল না।
তিনি স্পষ্টভাবে মেনে নিয়েছিলেন, পরাশক্তির প্রতিদ্বন্দ্বিতা আন্তর্জাতিক জীবনের এক অবিচ্ছেদ্য বাস্তবতা। তাঁর ভাষায়, পছন্দ হোক বা না হোক, ছোট দেশগুলোকেই পরাশক্তির অস্তিত্বের সঙ্গে মানিয়ে নিতে শিখতে হবে। তবে তিনি বিশ্বাস করতেন যৌথ শক্তিতে। তাই সারাজীবন তিনি রাষ্ট্রগুলোকে একসঙ্গে কাজ করার আহ্বান জানিয়েছেন—নিজেদের স্বার্থ রক্ষা ও অগ্রগতির জন্য, একা একা শিকার হওয়ার অপেক্ষায় না থেকে।
১৯৭৬ সালের এক ভাষণে তিনি বলেছিলেন, নিজেদের মধ্যে ঐক্য বজায় রেখে, অপ্রয়োজনীয় সংঘাত এড়িয়ে এবং পরাশক্তির সঙ্গে সরাসরি সংঘর্ষে না গিয়ে বাস্তবসম্মত আলোচনার পথে এগোতে পারলে, ছোট দেশগুলোও তুলনামূলক নিরাপত্তা ও লাভ নিশ্চিত করতে পারে।
এই চিন্তাধারা আজ আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি প্রাসঙ্গিক। যুক্তরাষ্ট্রের প্রশাসন থেকে আসা অর্থনৈতিক ও সামরিক চাপের উদাহরণ হিসেবে লেখকরা উল্লেখ করেছেন ভেনেজুয়েলার রাষ্ট্রপ্রধানকে অপহরণের ঘটনা, কানাডা, গ্রিনল্যান্ড, কলম্বিয়া ও ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক হস্তক্ষেপের হুমকি, এবং রাজনৈতিক চাপ ও ভূখণ্ডগত সুবিধা আদায়ে শুল্ককে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহারের প্রবণতা।
ঝুঁকি কেবল আন্তর্জাতিক নিয়মভিত্তিক ব্যবস্থার ভাঙনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; বরং বিশ্ব কীভাবে এই পরিস্থিতিতে প্রতিক্রিয়া জানায়, সেটিও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
শক্তিধর রাষ্ট্র যখন ‘আমরাই সেরা, শক্তিই শেষ কথা’—এই কৌশল নিয়ে আগ্রাসী হয়, তখন তিন ধরনের পক্ষ সামনে আসে। প্রথম দল মনে করে পরাশক্তি তাদের পক্ষেই কাজ করছে; দ্বিতীয় দল মনে করে তাদের বিরুদ্ধেই কাজ করছে। এই দুই পক্ষের ক্ষেত্রে বিষয়টি শূন্য-সম খেলায় পরিণত হয়—এক পক্ষ জিতলে অন্য পক্ষ হারবে।
তৃতীয় পক্ষ হলো সেই দেশগুলো, যারা সরাসরি আঘাতের মুখে নেই। অনেকেই মনে করেন, তাদের নিরপেক্ষ থাকা উচিত। কিন্তু বাস্তবে দেখা যায়, কেউ কেউ আগ্রাসী শক্তির পক্ষেও দাঁড়ায়—কারণ এতে তারা নিজেদের শক্তিশালী ভাবতে পারে, কিংবা ভয় পায় যে না দাঁড়ালে পরবর্তী টার্গেট তারাই হবে। আবার কেউ কেউ মনে করে, শক্তিই স্বাভাবিক নিয়ম, তাই শক্তিশালীর পক্ষেই থাকা শ্রেয়।
লেখকদের মতে, এই তৃতীয় পক্ষ আরও ভালো করতে পারে। তাদের একত্রিত হয়ে আন্তর্জাতিক নীতিমালা রক্ষা করা এবং আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘনকারী আগ্রাসনের বিরুদ্ধে স্পষ্ট অবস্থান নেওয়া উচিত। ছোট রাষ্ট্রগুলোর জন্য নিয়মভিত্তিক আন্তর্জাতিক ব্যবস্থা কেবল কূটনৈতিক অবস্থান নয়, বরং সার্বভৌমত্ব রক্ষার একটি গুরুত্বপূর্ণ নিরাপত্তা কৌশল।
অভিযোজন ও প্রশমন
‘শক্তিই ন্যায়’ ধরনের আগ্রাসনের সঙ্গে নিঃশর্তভাবে মানিয়ে নেওয়া বা নীরব সম্মতি দেওয়া আগ্রাসীকেই আরও উৎসাহিত করে। জলবায়ু সংকটের ধারণা থেকে উদাহরণ টেনে লেখকরা বলেন, তৃতীয় পক্ষের দেশগুলোকে অভিযোজন ও প্রশমন—এই দুই ধরনের কৌশল নিতে হবে।
জলবায়ু সংকটে অভিযোজন মানে এর প্রভাব মোকাবিলা করা, আর প্রশমন মানে এর কারণ কমানো। একইভাবে ভূরাজনীতিতে অভিযোজন হতে পারে—একটি দমনমূলক পরাশক্তির ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা কমিয়ে বিকল্প সমৃদ্ধির পথ খোঁজা। প্রশমন কৌশলের মধ্যে পড়ে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বিশ্বাসযোগ্যতা গড়া, অন্যদের কাছে অপরিহার্য হয়ে ওঠা, এবং সমমনস্ক নতুন অংশীদারদের সঙ্গে জোট গঠন।
ডাভোসে ২০ জানুয়ারি দেওয়া ভাষণে কানাডার প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নি সতর্ক করে বলেছেন, বিশ্ব এখন এমন এক নিষ্ঠুর বাস্তবতার শুরুতে দাঁড়িয়ে, যেখানে পরাশক্তির রাজনীতি আর কোনো নিয়ন্ত্রণ মানছে না। তবুও, ছোট ও মধ্যম শক্তির দেশগুলোর নিজস্ব সক্ষমতা রয়েছে। সমস্যাভিত্তিক জোট গড়ে তারা বৈশ্বিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে পারে এবং নতুন বৈশ্বিক ব্যবস্থার রূপরেখা তৈরিতে ভূমিকা রাখতে পারে।
এশিয়া ও ইউরোপে অনেকেই এই চিন্তার সঙ্গে একমত। বিশেষ করে গ্রিনল্যান্ড নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থানের পর ইউরোপীয় নেতারা আরও ঐক্যবদ্ধভাবে ‘শক্তিই ন্যায়’ নীতির বিরোধিতা করছেন। যদিও এশিয়ার কিছু বিশ্লেষক এটিকে সরলতা বলে উড়িয়ে দেন, তবু সবাইকে মানতে হবে—সময়টির ঐতিহাসিক গুরুত্ব রয়েছে, এবং বর্তমান বাস্তবতাকে বর্তমান হিসেবেই পড়তে হবে। পুরোনো কৌশল আঁকড়ে ধরা এই অস্থির সময়ে বিপজ্জনক হতে পারে।
ডাভোসে সিঙ্গাপুরের প্রেসিডেন্ট থারমান শানমুগারত্নম বলেন, কেবল আদর্শবাদ নয়, বরং জাতীয় স্বার্থ ও বৈশ্বিক কল্যাণের সংযোগস্থলকে স্বীকার করে বিকল্প পরিকল্পনা দরকার। এর অর্থ, অভিন্ন চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় বহু-পাক্ষিক জোট গড়ে তোলা।
আসিয়ান ও সিঙ্গাপুর
পূর্ব এশিয়ার ভূরাজনীতি আজ মূলত যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের কৌশলগত প্রতিদ্বন্দ্বিতায় প্রভাবিত। দক্ষিণ চীন সাগরের উত্তেজনা ও বৈশ্বিক বাণিজ্য পথ—সবখানেই এই প্রতিযোগণার ছাপ। ছোট দেশগুলোর ওপর পক্ষ বেছে নেওয়ার চাপ বাড়ছে।

এই প্রেক্ষাপটে আসিয়ানের জন্য সময়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া এখন পরাশক্তির প্রতিদ্বন্দ্বিতার বড় মঞ্চে পরিণত হয়েছে। চীন দক্ষিণ চীন সাগরে আগ্রাসী দাবি ও অন্য দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে হস্তক্ষেপ করছে, আর যুক্তরাষ্ট্র শুল্ক ও আন্তর্জাতিক আইন উপেক্ষার মাধ্যমে চাপ সৃষ্টি করছে—দু’পক্ষই দাঁত দেখিয়েছে।
আসিয়ান যদি নিজেদের ঐক্য সুসংহত করতে পারে, তবে তারা দুই পরাশক্তির চাপ মোকাবিলায় যৌথ শক্তি কাজে লাগাতে পারবে, একই সঙ্গে উভয়ের সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রেখেও। তবে এর জন্য অভ্যন্তরীণ বিভাজন ও সংকীর্ণ জাতীয় স্বার্থকে দূরে সরিয়ে সমন্বিত কৌশল প্রয়োজন।
এটি সিঙ্গাপুরবাসীর জন্যও শিক্ষণীয় মুহূর্ত। পরাশক্তির প্রতিযোগণায় বিদেশি শক্তি সমাজের দুর্বলতা কাজে লাগিয়ে নীতিনির্ধারণে প্রভাব ফেলতে চাইবে। তাই অভ্যন্তরীণ সংহতি অত্যন্ত জরুরি।
সিঙ্গাপুর সবসময় দ্রুত অভিযোজনে বিশ্বাস করেছে—আন্তর্জাতিক পরিবর্তন বুঝে প্রয়োজনে নীতি বদলাতে পিছপা হয়নি। পরিবর্তনের মধ্যেও একটি কাজ অপরিবর্তিত থেকেছে: সম্পর্ক পরিচালনা ও জোট গড়া, যাতে স্থিতিশীলতা বজায় থাকে এবং কূটনৈতিক কৌশলের জন্য সর্বোচ্চ সুযোগ থাকে।
দেশটির প্রতিষ্ঠাতা পররাষ্ট্রমন্ত্রীর আরেকটি বক্তব্য স্মরণ করিয়ে লেখকরা বলেন, কুমির বন্ধুত্বপূর্ণ হলেও বিপজ্জনক—এই কথা মনে রাখলে কূটনৈতিক সৌজন্য বজায় রাখতে কোনো ক্ষতি নেই।
ড্যানি কুয়াহ ও আইরিন এনজি 



















