ওয়াশিংটন-নয়াদিল্লির বার্তা
রাশিয়া থেকে তেল কেনার কারণে ভারতের ওপর আরোপিত ২৫ শতাংশ অতিরিক্ত শুল্ক প্রত্যাহারের একটি সম্ভাব্য ‘পথ’ রয়েছে বলে ইঙ্গিত দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। মার্কিন অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্টের ভাষ্য অনুযায়ী, এই শুল্ক আরোপের পর ভারতের রাশিয়া থেকে তেল কেনা কার্যত উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে।

৫০ শতাংশ শুল্কের কাঠামো
ভারতের পণ্যের ওপর যুক্তরাষ্ট্র যে মোট ৫০ শতাংশ শুল্ক আরোপ করেছে, তার অর্ধেক এই দণ্ডমূলক শুল্ক। বাকি ২৫ শতাংশকে ওয়াশিংটন ‘পারস্পরিক শুল্ক’ হিসেবে ব্যাখ্যা করছে, যা ভারতের পক্ষ থেকে মার্কিন পণ্যের ওপর আরোপিত শুল্কের প্রতিক্রিয়া। তবে ইলেকট্রনিকসসহ কিছু পণ্য এই শুল্কের বাইরে রাখা হয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের দাবি: শুল্কে লক্ষ্য পূরণ
পলিটিকোকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে বেসেন্ট বলেন, রাশিয়ার তেল কেনার জন্য ভারতের ওপর ২৫ শতাংশ শুল্ক আরোপ করা হয়েছিল এবং এতে কাজ হয়েছে। তাঁর দাবি, ভারতীয় শোধনাগারগুলোর রাশিয়ার তেল কেনা দ্রুত কমে গেছে। শুল্ক এখনো বহাল থাকলেও, ভবিষ্যতে তা প্রত্যাহারের সুযোগ আছে বলেই তিনি মনে করেন।

ইউরোপের ভূমিকা নিয়ে সমালোচনা
মার্কিন অর্থমন্ত্রী ইউরোপীয় মিত্রদের কঠোর সমালোচনা করেন। তাঁর অভিযোগ, ইউক্রেনে রাশিয়ার আগ্রাসনের পরও ইউরোপ নিষেধাজ্ঞার চেয়ে বাণিজ্যিক স্বার্থকে অগ্রাধিকার দিয়েছে। ভারতের সঙ্গে বড় বাণিজ্যচুক্তির আশায় তারা শুল্ক আরোপে আগ্রহ দেখায়নি বলে দাবি করেন তিনি।
ভারত-ইইউ বাণিজ্য চুক্তির প্রেক্ষাপট
এই মন্তব্য এমন সময়ে এলো, যখন ইউরোপীয় ইউনিয়নের শীর্ষ নেতারা ভারত-ইইউ মুক্ত বাণিজ্য চুক্তির আলোচনা চূড়ান্ত করতে ভারতে আসছেন। ইউরোপীয় কাউন্সিলের প্রেসিডেন্ট আন্তোনিও কোস্তা ও ইউরোপীয় কমিশনের প্রেসিডেন্ট উরসুলা ভন ডার লেয়েন ২৬ জানুয়ারি প্রজাতন্ত্র দিবসের অনুষ্ঠানে যোগ দেবেন এবং পরদিন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে শীর্ষ সম্মেলনে বসবেন। এই বৈঠকেই বাণিজ্য চুক্তি চূড়ান্ত হওয়ার ঘোষণা আসতে পারে বলে ধারণা।

রাশিয়ার তেল ও মুনাফার অভিযোগ
বেসেন্টের অভিযোগ, ইউক্রেন যুদ্ধের আগে ভারতের শোধনাগারগুলোতে রাশিয়ার তেলের অংশ ছিল মাত্র ২ থেকে ৩ শতাংশ। নিষেধাজ্ঞার পর বড় ছাড়ে তেল পাওয়া যাওয়ায় তা বেড়ে ১৭ থেকে ১৯ শতাংশে পৌঁছায় এবং এতে শোধনাগারগুলো বড় মুনাফা করেছে। তাঁর আরও দাবি, ভারতীয় শোধনাগারে রাশিয়ার তেল পরিশোধন করে তৈরি পণ্য কিনে ইউরোপই পরোক্ষভাবে রাশিয়ার যুদ্ধের অর্থ জোগাচ্ছে।
ইউরোপকে ‘বোকা’ বলার বিতর্ক
ইউরোপীয়দের ‘বোকা’ বলা হয়েছে কি না—এমন প্রশ্নে বেসেন্ট ব্যাখ্যা দেন, তিনি ব্যক্তিকে নয়, একটি ‘বোকামির কাজের’ কথা বলেছেন।
রাশিয়া থেকে আমদানি কমার পরিসংখ্যান
সরকারি তথ্য অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞার প্রভাবে রাশিয়া থেকে ভারতের আমদানি কমেছে। ডিসেম্বর ২০২৫-এ আমদানি আগের বছরের তুলনায় ২ দশমিক ৭৭ শতাংশ কমে ৪ দশমিক ১৬ বিলিয়ন ডলারে দাঁড়ায়। এপ্রিল থেকে ডিসেম্বর ২০২৫ সময়ে এই আমদানি ৯ দশমিক ৪১ শতাংশ কমে ৪৪ দশমিক ৯৭ বিলিয়ন ডলারে নেমেছে।

ভারতের প্রতিক্রিয়া ও অবস্থান
ভারত এই শুল্ককে ‘অন্যায্য, অযৌক্তিক ও অগ্রহণযোগ্য’ বলে জানিয়েছে। নয়াদিল্লির বক্তব্য, দেশের জ্বালানি নীতি পুরোপুরি জাতীয় স্বার্থের ভিত্তিতে নির্ধারিত।
যুক্তরাষ্ট্র-ভারত বাণিজ্য আলোচনা
দুই দেশ একটি দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য চুক্তি নিয়ে আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছে। কিছু খাতে মার্কিন চাপকে ভারত ‘লাল রেখা’ হিসেবে দেখায় সমঝোতা হয়নি। তবুও সংশ্লিষ্টদের মতে, আলোচনা চলছে এবং অগ্রগতি ইতিবাচক।

উচ্চপর্যায়ের কূটনৈতিক যোগাযোগ
১৯ জানুয়ারি বাণিজ্যমন্ত্রী পীযূষ গোয়াল সদ্য নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত সার্জিও গোর ও সিনেটর স্টিভ ডেইন্সের সঙ্গে বৈঠক করেন। পরে তিনি জানান, দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক নিয়ে ফলপ্রসূ আলোচনা হয়েছে। এর আগের দিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্করের সঙ্গে রাষ্ট্রদূত গোরের বৈঠকেও ভারত-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্কের কৌশলগত গুরুত্ব নিয়ে খোলামেলা আলোচনা হয়।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















