১০:৫০ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ২৭ জানুয়ারী ২০২৬
আমেরিকার সনায় ইউরোপীয় বিস্ময়: ঘামঘর নাকি ফিটনেস শো মিনেসোটায় হত্যাকাণ্ডের জেরে চাপ, অভিবাসন অভিযানে হোয়াইট হাউসের পিছু হটার ইঙ্গিত ক্ষমতার লাগাম টানছে বাস্তবতা ও জনরোষ, দ্বিতীয় মেয়াদে ট্রাম্পের কঠোর দখলদারি কৌশলে ধাক্কা চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের শাটল ট্রেনে পাথর নিক্ষেপ, শিক্ষার্থী আহত নির্বাচিত হলে বন্ধ শিল্পকারখানা চালু ও নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি করবে জামায়াত: আমির জামায়াত ক্ষমতায় এলে হিন্দুরা থাকবে জামাই-আদরে: কৃষ্ণ নন্দী বাংলাদেশ ইস্যুতে আইসিসির সিদ্ধান্ত নিয়ে প্রশ্ন তুললেন পাকিস্তানি ক্রিকেটার মোহাম্মদ ইউসুফ জামায়াতের দুই মন্ত্রী কেন পদত্যাগ করেননি, ময়মনসিংহে প্রশ্ন তারেক রহমানের রেকর্ড নিম্নস্তরের কাছে ভারতীয় রুপি, চাপ বাড়ার পেছনে সাত কারণ নির্বাচনের আগে রংপুরে সেনাপ্রধানের পরিদর্শন

গুটি বসন্ত নির্মূলের নেপথ্য নায়ক উইলিয়াম ফোগে আর নেই

বিশ্ব জনস্বাস্থ্যের ইতিহাসে গুটি বসন্ত নির্মূলকে সবচেয়ে বড় সাফল্য হিসেবে ধরা হয়। সেই ঐতিহাসিক অর্জনের অন্যতম প্রধান কারিগর, প্রখ্যাত জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ উইলিয়াম হারবার্ট ফোগে আর নেই। যুক্তরাষ্ট্রের আটলান্টায় নিজ বাসভবনে হৃদ্‌যন্ত্রের জটিলতায় তাঁর মৃত্যু হয়েছে। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল ঊননব্বই বছর।

গুটি বসন্ত নির্মূলে ‘রিং টিকাদান’ নামে পরিচিত কৌশলটির উদ্ভাবক হিসেবে উইলিয়াম ফোগে বিশ্বজুড়ে পরিচিত ছিলেন। এই পদ্ধতিতে পুরো অঞ্চলকে একযোগে টিকা দেওয়ার বদলে আক্রান্ত ব্যক্তি ও তার সংস্পর্শে আসা মানুষদের ঘিরে টিকাদানের বৃত্ত তৈরি করা হতো। এতে সীমিত সম্পদ ব্যবহার করেও সংক্রমণ দ্রুত নিয়ন্ত্রণ সম্ভব হয়। এই কৌশলই পরে আফ্রিকা থেকে শুরু করে বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে গুটি বসন্ত নির্মূলে যুগান্তকারী ভূমিকা রাখে।

William H. Foege, Key Figure in the Eradication of Smallpox, Dies at 89 - The New York Times

আফ্রিকার মাটিতে জন্ম নেয় বিপ্লবী কৌশল

ষাটের দশকে আফ্রিকার পশ্চিম ও মধ্যাঞ্চলে গুটি বসন্ত ছিল ভয়াবহ এক আতঙ্কের নাম। তরুণ চিকিৎসক উইলিয়াম ফোগে তখন পরিবার নিয়ে নাইজেরিয়ার এনুগু শহরে বসবাস করছিলেন। বিদ্যুৎ ও বিশুদ্ধ পানির সুবিধাবিহীন কাদামাটির ঘরে থেকে তিনি কাজ করতেন গ্রাম থেকে গ্রামে। টিকার স্বল্পতার মুখে পড়ে তিনি প্রচলিত গণটিকাদান পদ্ধতির বদলে নতুন কৌশল প্রয়োগের সিদ্ধান্ত নেন। আক্রান্তদের আলাদা করে, তাদের সংস্পর্শে আসা মানুষদের দ্রুত টিকা দিয়ে তিনি সংক্রমণের শিকল ভেঙে দেন। এই উদ্যোগই পরবর্তীতে ‘রিং টিকাদান’ নামে বিশ্বজুড়ে স্বীকৃতি পায়।

গৃহযুদ্ধের মাঝেও থামেনি লড়াই

নাইজেরিয়ায় গৃহযুদ্ধ শুরু হলে তাঁর পরিবারকে সরিয়ে নেওয়া হয়। কিন্তু ফোগে নিজে থেকে যান ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায়। টিকা সরবরাহ বন্ধ হয়ে গেলে তিনি সাহসী সিদ্ধান্ত নেন। সরকারি গুদাম থেকে টিকা সংগ্রহ করে বিপজ্জনক পথ পাড়ি দিয়ে আবার আক্রান্ত অঞ্চলে ফিরে যান। সেই দুঃসাহসিক উদ্যোগের ফলেই কয়েক মাসের মধ্যেই নাইজেরিয়ার পূর্বাঞ্চল থেকে গুটি বসন্ত নির্মূল সম্ভব হয়।

Dr. William Foege, leader in smallpox eradication, dies | KHON2

বিশ্বজয়ী সাফল্য ও আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি

উনিশশো সত্তরের বসন্তে পশ্চিম ও মধ্য আফ্রিকা গুটি বসন্তমুক্ত ঘোষণা করা হয়। পরে উনিশশো আটাত্তরে সোমালিয়ায় বিশ্বের শেষ গুটি বসন্ত রোগী শনাক্ত হয়। এর দুই বছর পর বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা দেয়, মানব ইতিহাসে প্রথমবারের মতো একটি সংক্রামক রোগ পুরোপুরি নির্মূল হয়েছে। এই কৃতিত্বের মূল স্থপতি হিসেবে উইলিয়াম ফোগে বিশ্বজুড়ে সম্মানিত হন।

যুক্তরাষ্ট্রে নেতৃত্ব ও এইডস সংকট

গুটি বসন্ত নির্মূলের পর উইলিয়াম ফোগে যুক্তরাষ্ট্রের রোগ নিয়ন্ত্রণ কেন্দ্রের পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব নেন। সেই সময়েই প্রথম এইডস রোগের অস্তিত্ব ধরা পড়ে। রাজনৈতিক চাপ, বাজেট সংকট ও সামাজিক বিতর্কের মধ্যেও তিনি গবেষণা ও রোগীর গোপনীয়তা রক্ষার পক্ষে দৃঢ় অবস্থান নেন। তাঁর নেতৃত্বে প্রাথমিক এইডস গবেষণার ভিত্তি গড়ে ওঠে।

African women, men and children are huddled on the ground, many smiling for the camera, beside a sign that urges Nigerians to “be vaccinated today.”

শিশু স্বাস্থ্য ও ভবিষ্যৎ প্রজন্ম

সরকারি দায়িত্ব ছাড়ার পর ফোগে বৈশ্বিক শিশুস্বাস্থ্য উন্নয়নে নিজেকে নিয়োজিত করেন। আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর সঙ্গে কাজ করে তিনি শিশুদের টিকাদান বাড়াতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। পরবর্তীতে বিশ্বজুড়ে টিকাদান জোট গঠনের ক্ষেত্রেও তাঁর চিন্তাধারা গভীর প্রভাব ফেলে।

জীবনের শুরু ও শেষ

আইওয়ার এক ধর্মযাজকের পরিবারে জন্ম নেওয়া উইলিয়াম ফোগে ছোটবেলা থেকেই মানবসেবার শিক্ষা পেয়েছিলেন। জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত তিনি জনস্বাস্থ্যকে মানবতার সেবার মাধ্যম হিসেবে দেখেছেন। স্ত্রী, সন্তান, নাতি-নাতনি ও প্রজন্মের পর প্রজন্ম তাঁর স্মৃতি বহন করবে।

 

জনপ্রিয় সংবাদ

আমেরিকার সনায় ইউরোপীয় বিস্ময়: ঘামঘর নাকি ফিটনেস শো

গুটি বসন্ত নির্মূলের নেপথ্য নায়ক উইলিয়াম ফোগে আর নেই

০৮:৪৫:৩৬ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ২৭ জানুয়ারী ২০২৬

বিশ্ব জনস্বাস্থ্যের ইতিহাসে গুটি বসন্ত নির্মূলকে সবচেয়ে বড় সাফল্য হিসেবে ধরা হয়। সেই ঐতিহাসিক অর্জনের অন্যতম প্রধান কারিগর, প্রখ্যাত জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ উইলিয়াম হারবার্ট ফোগে আর নেই। যুক্তরাষ্ট্রের আটলান্টায় নিজ বাসভবনে হৃদ্‌যন্ত্রের জটিলতায় তাঁর মৃত্যু হয়েছে। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল ঊননব্বই বছর।

গুটি বসন্ত নির্মূলে ‘রিং টিকাদান’ নামে পরিচিত কৌশলটির উদ্ভাবক হিসেবে উইলিয়াম ফোগে বিশ্বজুড়ে পরিচিত ছিলেন। এই পদ্ধতিতে পুরো অঞ্চলকে একযোগে টিকা দেওয়ার বদলে আক্রান্ত ব্যক্তি ও তার সংস্পর্শে আসা মানুষদের ঘিরে টিকাদানের বৃত্ত তৈরি করা হতো। এতে সীমিত সম্পদ ব্যবহার করেও সংক্রমণ দ্রুত নিয়ন্ত্রণ সম্ভব হয়। এই কৌশলই পরে আফ্রিকা থেকে শুরু করে বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে গুটি বসন্ত নির্মূলে যুগান্তকারী ভূমিকা রাখে।

William H. Foege, Key Figure in the Eradication of Smallpox, Dies at 89 - The New York Times

আফ্রিকার মাটিতে জন্ম নেয় বিপ্লবী কৌশল

ষাটের দশকে আফ্রিকার পশ্চিম ও মধ্যাঞ্চলে গুটি বসন্ত ছিল ভয়াবহ এক আতঙ্কের নাম। তরুণ চিকিৎসক উইলিয়াম ফোগে তখন পরিবার নিয়ে নাইজেরিয়ার এনুগু শহরে বসবাস করছিলেন। বিদ্যুৎ ও বিশুদ্ধ পানির সুবিধাবিহীন কাদামাটির ঘরে থেকে তিনি কাজ করতেন গ্রাম থেকে গ্রামে। টিকার স্বল্পতার মুখে পড়ে তিনি প্রচলিত গণটিকাদান পদ্ধতির বদলে নতুন কৌশল প্রয়োগের সিদ্ধান্ত নেন। আক্রান্তদের আলাদা করে, তাদের সংস্পর্শে আসা মানুষদের দ্রুত টিকা দিয়ে তিনি সংক্রমণের শিকল ভেঙে দেন। এই উদ্যোগই পরবর্তীতে ‘রিং টিকাদান’ নামে বিশ্বজুড়ে স্বীকৃতি পায়।

গৃহযুদ্ধের মাঝেও থামেনি লড়াই

নাইজেরিয়ায় গৃহযুদ্ধ শুরু হলে তাঁর পরিবারকে সরিয়ে নেওয়া হয়। কিন্তু ফোগে নিজে থেকে যান ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায়। টিকা সরবরাহ বন্ধ হয়ে গেলে তিনি সাহসী সিদ্ধান্ত নেন। সরকারি গুদাম থেকে টিকা সংগ্রহ করে বিপজ্জনক পথ পাড়ি দিয়ে আবার আক্রান্ত অঞ্চলে ফিরে যান। সেই দুঃসাহসিক উদ্যোগের ফলেই কয়েক মাসের মধ্যেই নাইজেরিয়ার পূর্বাঞ্চল থেকে গুটি বসন্ত নির্মূল সম্ভব হয়।

Dr. William Foege, leader in smallpox eradication, dies | KHON2

বিশ্বজয়ী সাফল্য ও আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি

উনিশশো সত্তরের বসন্তে পশ্চিম ও মধ্য আফ্রিকা গুটি বসন্তমুক্ত ঘোষণা করা হয়। পরে উনিশশো আটাত্তরে সোমালিয়ায় বিশ্বের শেষ গুটি বসন্ত রোগী শনাক্ত হয়। এর দুই বছর পর বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা দেয়, মানব ইতিহাসে প্রথমবারের মতো একটি সংক্রামক রোগ পুরোপুরি নির্মূল হয়েছে। এই কৃতিত্বের মূল স্থপতি হিসেবে উইলিয়াম ফোগে বিশ্বজুড়ে সম্মানিত হন।

যুক্তরাষ্ট্রে নেতৃত্ব ও এইডস সংকট

গুটি বসন্ত নির্মূলের পর উইলিয়াম ফোগে যুক্তরাষ্ট্রের রোগ নিয়ন্ত্রণ কেন্দ্রের পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব নেন। সেই সময়েই প্রথম এইডস রোগের অস্তিত্ব ধরা পড়ে। রাজনৈতিক চাপ, বাজেট সংকট ও সামাজিক বিতর্কের মধ্যেও তিনি গবেষণা ও রোগীর গোপনীয়তা রক্ষার পক্ষে দৃঢ় অবস্থান নেন। তাঁর নেতৃত্বে প্রাথমিক এইডস গবেষণার ভিত্তি গড়ে ওঠে।

African women, men and children are huddled on the ground, many smiling for the camera, beside a sign that urges Nigerians to “be vaccinated today.”

শিশু স্বাস্থ্য ও ভবিষ্যৎ প্রজন্ম

সরকারি দায়িত্ব ছাড়ার পর ফোগে বৈশ্বিক শিশুস্বাস্থ্য উন্নয়নে নিজেকে নিয়োজিত করেন। আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর সঙ্গে কাজ করে তিনি শিশুদের টিকাদান বাড়াতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। পরবর্তীতে বিশ্বজুড়ে টিকাদান জোট গঠনের ক্ষেত্রেও তাঁর চিন্তাধারা গভীর প্রভাব ফেলে।

জীবনের শুরু ও শেষ

আইওয়ার এক ধর্মযাজকের পরিবারে জন্ম নেওয়া উইলিয়াম ফোগে ছোটবেলা থেকেই মানবসেবার শিক্ষা পেয়েছিলেন। জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত তিনি জনস্বাস্থ্যকে মানবতার সেবার মাধ্যম হিসেবে দেখেছেন। স্ত্রী, সন্তান, নাতি-নাতনি ও প্রজন্মের পর প্রজন্ম তাঁর স্মৃতি বহন করবে।