ঢাকা-৮ আসনের নির্বাচন ঘিরে সাম্প্রতিক দিনগুলোতে যে রাজনৈতিক উত্তেজনা তৈরি হয়েছে, তার কেন্দ্রে উঠে এসেছে বিএনপির প্রবীণ নেতা মির্জা আব্বাস ও জাতীয় নাগরিক পার্টির মুখ্য সমন্বয়ক নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারীর মুখোমুখি অবস্থান। ব্যক্তিগত অভিযোগ, পাল্টা বক্তব্য ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া মন্তব্য এই প্রতিদ্বন্দ্বিতাকে রূপ দিয়েছে এক ধরনের ‘বিষাক্ত সহাবস্থানে’, যেখানে রাজনীতির চেয়ে বাকযুদ্ধই বেশি দৃশ্যমান।

নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারীর ওপর হামলার অভিযোগ সামনে আসার পরপরই রাজনৈতিক অঙ্গনে আলোড়ন শুরু হয়। অভিযোগের তীর গিয়ে পড়ে বিএনপির প্রার্থী মির্জা আব্বাসের দিকে। তবে এসব অভিযোগ সরাসরি নাকচ করে দিয়ে মির্জা আব্বাস নিজেকে উপস্থাপন করেন একজন অভিজ্ঞ, ধৈর্যশীল রাজনীতিক হিসেবে, যিনি উত্তেজনায় পা না দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।
মালিবাগ–গুলবাগ এলাকায় নির্বাচনি প্রচারণায় বক্তব্য রাখতে গিয়ে মির্জা আব্বাস বলেন, একটি সাধারণ চা খাওয়ার দাওয়াতকেও হুমকি হিসেবে উপস্থাপন করা হচ্ছে। তার ভাষায়, কোথাও কিছু ঘটলেই দায় চাপানো হচ্ছে তার ওপর। তিনি দাবি করেন, বয়স ও রাজনৈতিক অভিজ্ঞতার কারণে তিনি পরিস্থিতি বুঝে কথা বলতে জানেন এবং ইচ্ছাকৃত উসকানিতে জড়াতে চান না।

এই বক্তব্যের মধ্য দিয়ে মির্জা আব্বাস মূলত নিজের দীর্ঘ রাজনৈতিক অতীতের কথা সামনে আনেন। তিনি স্মরণ করিয়ে দেন, ১৯৯১ সাল থেকে তিনি নিয়মিত নির্বাচনে অংশ নিচ্ছেন এবং আন্দোলন-সংগ্রামের সময় এলাকায় থেকেছেন। পুলিশের হামলার মুখেও স্থানীয় মানুষের সহায়তা পেয়েছেন—এমন দাবি করে তিনি পরোক্ষভাবে প্রশ্ন তোলেন, তার প্রতিদ্বন্দ্বীরা আদৌ এমন সময় এলাকায় ছিলেন কি না।
অন্যদিকে নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী ও তার রাজনৈতিক সহযোগীরা শুরু থেকেই অভিযোগ করে আসছেন, বিএনপির প্রার্থী ও তার সমর্থকেরা ভয়ভীতি প্রদর্শনের চেষ্টা করছেন। এই অভিযোগ আরও জোরালো হয় হাবিবুল্লাহ বাহার কলেজ এলাকায় ডিম নিক্ষেপের ঘটনার পর। কোনো তদন্ত বা প্রত্যক্ষ প্রমাণের আগেই ঘটনার দায় বিএনপি নেতৃত্বের ওপর চাপানো হয় বলে অভিযোগ করেন বিএনপির নির্বাচন পরিচালনা কমিটির মুখপাত্র ড. মাহদী আমিন।
ড. মাহদী আমিন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক বক্তব্যে বলেন, নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারীর রাজনৈতিক আচরণে একটি নির্দিষ্ট কৌশল লক্ষ্য করা যাচ্ছে—যেখানে বিতর্কিত ও মুখরোচক মন্তব্যের মাধ্যমে ভাইরাল হওয়াই যেন মুখ্য উদ্দেশ্য। তার মতে, প্রমাণ ছাড়াই রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের শীর্ষ নেতৃত্বের নাম জড়িয়ে দেওয়া একটি বিপজ্জনক সংস্কৃতি, যা অতীতের কর্তৃত্ববাদী রাজনীতির স্মৃতি মনে করিয়ে দেয়।
এই টানাপোড়েনের মধ্যে মির্জা আব্বাস আরও আক্রমণাত্মক ভাষায় বলেন, নির্বাচনের সময় কিছু ‘অতিথি পাখি’ এলাকায় আসে, যাদের পরে আর খুঁজে পাওয়া যায় না। তিনি এলাকার সামাজিক সম্পর্ক, জানাজা-বিয়ে থেকে শুরু করে ব্যক্তিগত সহায়তার উদাহরণ টেনে এনে নিজেকে ‘এলাকার মানুষ’ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করার চেষ্টা করেন।
চাঁদাবাজির অভিযোগ নিয়েও দুই পক্ষের বক্তব্য পরস্পরবিরোধী। নাসীরুদ্দীন শিবিরের পক্ষ থেকে চাঁদাবাজির বিরুদ্ধে ‘লাল কার্ড’ দেখানোর কথা বলা হলে মির্জা আব্বাস পাল্টা দাবি করেন, এই অভিযোগ রাজনৈতিক ট্যাগ হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে। তার ভাষায়, প্রকৃত চাঁদাবাজদের গ্রেপ্তার না করে একটি দলের ওপর দায় চাপানো হচ্ছে।

বিশ্লেষকদের মতে, এই দ্বন্দ্ব কেবল দুই প্রার্থীর ব্যক্তিগত বিরোধ নয়; বরং এটি বাংলাদেশের নির্বাচনকেন্দ্রিক রাজনীতির একটি পরিচিত চিত্র। নতুন ও পুরোনো রাজনৈতিক শক্তির মুখোমুখি অবস্থানে ভাষার আগ্রাসন, অভিযোগের দ্রুত বিস্তার এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ভূমিকা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে।
সব মিলিয়ে ঢাকা-৮ আসনের এই নির্বাচন এখন শুধু ভোটের হিসাবেই সীমাবদ্ধ নেই। আব্বাস ও নাসীরুদ্দীনের পাল্টাপাল্টি বক্তব্য রাজনীতির পরিবেশকে এমন এক জায়গায় নিয়ে গেছে, যেখানে আস্থা ও সংলাপের বদলে সন্দেহ ও উত্তেজনাই প্রধান হয়ে উঠছে। এই ‘বিষাক্ত দিনগুলো’ শেষ পর্যন্ত ভোটারদের সিদ্ধান্তকে কতটা প্রভাবিত করবে, সেটিই এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















