ঘানায় ম্যালেরিয়ার বিরুদ্ধে দীর্ঘ লড়াইয়ে বড় সাফল্য এনে দিয়েছে নতুন দুটি টিকা। সরকারি স্বাস্থ্য বিভাগ ও আন্তর্জাতিক টিকা সহায়তা সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, এই টিকা চালুর পর দেশটিতে পাঁচ বছরের নিচে শিশুদের ম্যালেরিয়া জনিত মৃত্যুর হার নাটকীয়ভাবে কমেছে। আফ্রিকার মতো উচ্চ ঝুঁকির অঞ্চলে যেখানে প্রতি বছর বিপুলসংখ্যক শিশু এই রোগে মারা যায়, সেখানে ঘানার অভিজ্ঞতা ম্যালেরিয়া দমনে নতুন আশার বার্তা দিচ্ছে। তবে একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক সহায়তা কমে যাওয়ায় এই সাফল্য টেকসই হবে কি না, তা নিয়ে উদ্বেগ ও বাড়ছে।
টিকায় ঘানার অগ্রগতি
ঘানায় দীর্ঘদিন ধরেই ম্যালেরিয়া নিয়ন্ত্রণে মশারি ব্যবহার, প্রতিরোধমূলক ওষুধ এবং দ্রুত চিকিৎসা নিশ্চিত করার মতো উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছিল। এসব ব্যবস্থায় মৃত্যুর হার কমলেও পুরোপুরি সাফল্য আসছিল না। এই পরিস্থিতিতে দুটি নতুন ম্যালেরিয়া টিকা চালু হওয়ায় শেষ বড় বাধাটি ও অনেকটা দূর হয়েছে। একটি টিকা তৈরি করেছে ব্রিটিশ ওষুধ প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠান এবং অন্যটি অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণায় তৈরি হয়ে ভারতের একটি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে উৎপাদিত। ঘানার টিকাদান কর্মসূচির দায়িত্বে থাকা কর্মকর্তারা বলছেন, বাস্তব মাঠপর্যায়ে এই টিকা কার্যত খেলা বদলকারী ভূমিকা রাখছে।
সরকারি হিসাব অনুযায়ী, পাঁচ বছরের নিচে শিশুদের নিশ্চিত ম্যালেরিয়া মৃত্যুর সংখ্যা কয়েক বছরের ব্যবধানে প্রায় ছিয়াশি শতাংশ কমেছে। এক দশক আগে যেখানে বছরে প্রায় এক হাজার শিশুর মৃত্যু হতো, সেখানে সাম্প্রতিক বছরে সেই সংখ্যা কয়েক দশকে নেমে এসেছে। সংক্রমণের সংখ্যা লক্ষণীয়ভাবে কমেছে, যদিও সব রোগী শনাক্ত না হওয়ায় প্রকৃত সংখ্যা আরও বেশি হতে পারে বলে বিশেষজ্ঞদের ধারণা।
সহায়তা কমায় শঙ্কা
এই সাফল্যের মাঝেই বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠেছে আন্তর্জাতিক অর্থায়ন। আফ্রিকার দেশগুলোর জন্য ম্যালেরিয়া টিকা কেনার দায়িত্বে থাকা সংস্থাটি জানিয়েছে, আগামী কয়েক বছরে তাদের হাতে থাকা অর্থ প্রয়োজনের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে কম। ফলে টিকাদান কর্মসূচির পরিসর সংকুচিত হতে পারে। সংস্থার অভ্যন্তরীণ হিসাব অনুযায়ী, অর্থ সংকটের কারণে টিকাদান কমে গেলে অতিরিক্ত প্রায় উনিশ হাজার শিশুর জীবন ঝুঁকিতে পড়তে পারে।
যুক্তরাষ্ট্রসহ কয়েকটি ধনী দেশ তাদের বৈদেশিক সহায়তা কমিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের নতুন নীতির ফলে আগের মতো টিকা সহায়তা পাওয়া যাচ্ছে না। একই সঙ্গে ইউরোপের বড় দাতারাও আগের তুলনায় কম অর্থ দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে। যদিও সংশ্লিষ্ট দেশগুলো বলছে, তারা এখনও ম্যালেরিয়া মোকাবিলায় বৈশ্বিক উদ্যোগে নীতিগতভাবে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।
মাঠের বাস্তবতা ও মায়েদের সিদ্ধান্ত
ঘানার বিভিন্ন এলাকায় মা–বাবাদের অভিজ্ঞতা এই টিকার প্রভাব আরও স্পষ্ট করে। অনেক পরিবার অতীতে ম্যালেরিয়ায় আপনজন হারিয়েছে বা শিশুদের নিয়ে হাসপাতালে ছোটাছুটি করেছে। নতুন টিকা পাওয়ার পর সেই ভয় অনেকটা কমেছে। এক মা জানিয়েছেন, নিজের ভাই ও সন্তানের অসুস্থতার অভিজ্ঞতা তাকে টিকা নেওয়ার সিদ্ধান্তে দৃঢ় করেছে। তার সন্তান একাধিক ডোজ নেওয়ার পর আর কখনও ম্যালেরিয়ায় হাসপাতালে ভর্তি হতে হয়নি।
স্থানীয় স্বাস্থ্য কর্মকর্তারা বলছেন, টিকা আসার আগেই মৃত্যুর হার কিছুটা কম ছিল, কিন্তু রোগীর চাপ ছিল অনেক। টিকা চালুর পর হাসপাতালের ওপর চাপ কমেছে এবং অন্যান্য গুরুতর রোগের চিকিৎসার সুযোগ বেড়েছে। শুরুতে কিছু ধর্মীয় ও সামাজিক গোষ্ঠীর মধ্যে সংশয় থাকলেও, বাস্তব ফলাফল দেখেই অনেকেই এখন টিকার পক্ষে কথা বলছেন।
আফ্রিকায় ভবিষ্যৎ চ্যালেঞ্জ
বিশেষজ্ঞদের মতে, আফ্রিকার কিছু অঞ্চল টিকা ছাড়াই ম্যালেরিয়া নিয়ন্ত্রণে সফল হলেও উপ-সাহারান অঞ্চলের দেশগুলো ভিন্ন বাস্তবতার মুখোমুখি। দারিদ্র্য, দুর্বল স্বাস্থ্যব্যবস্থা, ওষুধ প্রতিরোধী জীবাণু এবং সংঘাত ও প্রাকৃতিক দুর্যোগ ম্যালেরিয়া দমনের পথ কঠিন করে তুলেছে। টিকা সেখানে নতুন সম্ভাবনা তৈরি করেছে, কিন্তু একাধিক ডোজের প্রয়োজন হওয়ায় পরিবহন ও সংরক্ষণ ব্যবস্থায় চ্যালেঞ্জ রয়ে গেছে।
আগামী কয়েক বছরে আরও কয়েকটি দেশ টিকাদান শুরু করার পরিকল্পনা করেছে। পাশাপাশি ওষুধ প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠানগুলো দাম কমানোর ঘোষণা দিয়েছে, যা অর্থসংকট কিছুটা লাঘব করতে পারে। তবু বিশেষজ্ঞদের মতে, পর্যাপ্ত আন্তর্জাতিক সহায়তা না থাকলে ঘানার মতো সাফল্য সব দেশে ছড়িয়ে দেওয়া কঠিন হবে।
ঘানার অভিজ্ঞতা প্রমাণ করেছে, ম্যালেরিয়া টিকা আফ্রিকার শিশুদের জীবন বাঁচাতে বাস্তব ও কার্যকর সমাধান হতে পারে। কিন্তু একই সঙ্গে এটি দেখিয়ে দিয়েছে, বৈশ্বিক সহায়তা কমে গেলে সেই সাফল্য ঝুঁকির মুখে পড়ে। এখন প্রশ্ন একটাই, এই অগ্রযাত্রা থামবে নাকি আন্তর্জাতিক সহযোগিতায় আরও বিস্তৃত হবে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















