বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষা ব্যবস্থায় বড় ধরনের পরিবর্তনের পথে এগোচ্ছে সরকার। ঢাকা কেন্দ্রীয় বিশ্ববিদ্যালয় অধ্যাদেশ, ২০২৬ অনুমোদনের মধ্য দিয়ে রাজধানীর সাতটি সরকারি কলেজকে একীভূত করে নতুন একটি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। এই উদ্যোগকে দেশের উচ্চশিক্ষার ক্ষেত্রে একটি নতুন অধ্যায় হিসেবে দেখা হচ্ছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বিচ্ছেদ
এই অধ্যাদেশ কার্যকর হওয়ার ফলে দীর্ঘদিন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত থাকা সাতটি সরকারি কলেজের সেই সম্পর্কের অবসান ঘটেছে। প্রশাসনিক জটিলতা, পরীক্ষা বিলম্ব এবং শিক্ষায় বৈষম্যের অভিযোগে বছরের পর বছর যে সমস্যাগুলো চলছিল, নতুন কাঠামোর মাধ্যমে সেগুলোর সমাধানই এই উদ্যোগের মূল লক্ষ্য। অধ্যাদেশ অনুযায়ী কলেজগুলো এখন একাডেমিকভাবে ঢাকা কেন্দ্রীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত হবে, তবে তাদের নিজস্ব পরিচয়, অবকাঠামো ও প্রশাসনিক স্বায়ত্তশাসন বহাল থাকবে।

সরকারি সিদ্ধান্ত ও উদ্দেশ্য
২২ জানুয়ারি অধ্যাদেশটি অনুমোদিত হয়। প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিব শফিকুল আলম জানান, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে আগের সম্পর্ক থেকে সৃষ্ট জটিলতা দূর করা এবং উচ্চশিক্ষার মান উন্নয়ন করাই এই সিদ্ধান্তের উদ্দেশ্য।
নতুন বিশ্ববিদ্যালয়, পৃথক কলেজ
ঢাকা কেন্দ্রীয় বিশ্ববিদ্যালয় নিজস্ব একাডেমিক কার্যক্রম পরিচালনার পাশাপাশি অধিভুক্ত কলেজগুলোকেও অন্তর্ভুক্ত করবে। ভবিষ্যতে একটি পূর্ণাঙ্গ স্থায়ী ক্যাম্পাস নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে, তবে ততদিন ভাড়াকৃত ভবন বা নির্ধারিত অস্থায়ী স্থানে কার্যক্রম চলবে। অধিভুক্ত সাতটি কলেজ হলো ঢাকা কলেজ, ইডেন মহিলা কলেজ, সরকারি শহীদ সোহরাওয়ার্দী কলেজ, কবি নজরুল সরকারি কলেজ, বেগম বদরুন্নেসা সরকারি মহিলা কলেজ, মিরপুর সরকারি বাংলা কলেজ এবং সরকারি তিতুমীর কলেজ। এসব কলেজে বর্তমানে প্রায় দুই লাখ শিক্ষার্থী অধ্যয়নরত।
প্রশাসনিক কাঠামো

অধ্যাদেশে ঢাকা কেন্দ্রীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের পূর্ণাঙ্গ প্রশাসনিক কাঠামো নির্ধারণ করা হয়েছে। রাষ্ট্রপতি হবেন বিশ্ববিদ্যালয়ের আচার্য। সিনেট মনোনীত প্যানেল থেকে উপাচার্য নিয়োগ দেওয়া হবে। সিনেট, সিন্ডিকেট ও একাডেমিক কাউন্সিলসহ সব প্রয়োজনীয় দপ্তর থাকবে। বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন একাডেমিক, পরীক্ষা, গবেষণা ও প্রশাসনিক কার্যক্রম তদারকির ক্ষমতা রাখবে।
ভর্তি ও ডিগ্রি প্রদান
নতুন অধ্যাদেশ অনুযায়ী পাঠ্যক্রম প্রণয়ন, পরীক্ষা গ্রহণ এবং ডিগ্রি, ডিপ্লোমা ও সনদ প্রদান করবে ঢাকা কেন্দ্রীয় বিশ্ববিদ্যালয়। এসএসসি ও এইচএসসি ফলাফল এবং কেন্দ্রীয় ভর্তি পরীক্ষার মাধ্যমে শিক্ষার্থীরা মূল ক্যাম্পাস বা অধিভুক্ত কলেজে ভর্তি হতে পারবে। কলেজগুলোর সব সম্পদ ও অধিকার অপরিবর্তিত থাকবে।
স্কুলভিত্তিক একাডেমিক ব্যবস্থা
এই অধ্যাদেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো প্রচলিত ফ্যাকাল্টি পদ্ধতির পরিবর্তে স্কুলভিত্তিক একাডেমিক কাঠামো চালু করা। কলা, বিজ্ঞান, সামাজিক বিজ্ঞান, ব্যবসায় শিক্ষা, আইন ও চারুকলার জন্য আলাদা স্কুল থাকবে, প্রতিটির নেতৃত্বে থাকবেন একজন প্রধান। স্নাতক ও স্নাতকোত্তর পর্যায়ে অভিন্ন একাডেমিক ক্যালেন্ডার ও মূল্যায়ন ব্যবস্থা অনুসরণ করা হবে। এমফিল ও পিএইচডি কার্যক্রমও কেন্দ্রীয়ভাবে পরিচালিত হবে।

এইচএসসি শিক্ষা বহাল
সাতটি কলেজের মধ্যে পাঁচটি কলেজে উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষা চালু রয়েছে। অধ্যাদেশের আগের খসড়ায় এই স্তরের শিক্ষার্থীদের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি হলেও চূড়ান্ত অনুমোদিত অধ্যাদেশে স্পষ্ট করা হয়েছে যে উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষা আগের ব্যবস্থাতেই চলবে।
আন্দোলন থেকে নীতিগত সিদ্ধান্ত
ঢাকা কেন্দ্রীয় বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার পেছনে দীর্ঘদিনের ছাত্র আন্দোলনের বড় ভূমিকা রয়েছে। ২০২৪ সালের আন্দোলনের সময় শিক্ষার্থীরা একাডেমিক সেশন জটের বিষয়টি জোরালোভাবে তুলে ধরেন। এরপর শিক্ষা মন্ত্রণালয় বিশেষজ্ঞ কমিটি গঠন করে কাঠামো প্রণয়নের উদ্যোগ নেয়। ২০২৫ সালের ১৮ মে অবসরপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ অধ্যাপক এ কে এম ইলিয়াসকে অন্তর্বর্তী প্রশাসক নিয়োগ দেওয়া হয়।
বিলম্ব ও উদ্বেগ

২০২৪–২৫ শিক্ষাবর্ষে ভর্তি প্রক্রিয়া শেষ হলেও এখনো ক্লাস শুরু না হওয়ায় শিক্ষার্থীদের এক বছরের সেশনজটের আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। এ অবস্থায় বিভিন্ন সময় সড়ক অবরোধসহ আন্দোলন চলতে থাকে। ১৫ জানুয়ারির সর্বশেষ কর্মসূচিতেও রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় যান চলাচলে বিঘ্ন ঘটে।
প্রতিক্রিয়া ও প্রত্যাশা
অধ্যাপক এ কে এম ইলিয়াস জানান, ঢাকা কেন্দ্রীয় বিশ্ববিদ্যালয় চালু হলে কলেজগুলোর শিক্ষার মান উন্নত হবে। তিনি বলেন, দীর্ঘসূত্রতা থাকলে এ ধরনের পরিস্থিতি তৈরি হয়। সমস্যা আগেই সমাধান হলে জনভোগান্তি এড়ানো যেত। তিনি আরও জানান, বিসিএস শিক্ষা ক্যাডারের শিক্ষকরা কলেজে পাঠদান অব্যাহত রাখবেন এবং চাইলে বিশ্ববিদ্যালয়ের পদেও যোগ দিতে পারবেন।
আন্দোলনের সমন্বয়কারী জাকারিয়া বারী সাগর বলেন, দীর্ঘ দেড় বছরের আন্দোলনের পর অধ্যাদেশ অনুমোদিত হওয়ায় শিক্ষার্থীদের অপেক্ষার অবসান হয়েছে। তিনি এই অধ্যাদেশ উৎসর্গ করেন আন্দোলনে নিহত চার শিক্ষার্থীর স্মৃতির প্রতি।
সব মিলিয়ে, ঢাকা কেন্দ্রীয় বিশ্ববিদ্যালয় অনুমোদনের মাধ্যমে রাজধানীর হাজারো শিক্ষার্থীর জন্য স্থিতিশীল, সময়মতো ও মর্যাদাপূর্ণ উচ্চশিক্ষার পথ খুলবে—এমন প্রত্যাশাই এখন সবার।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















