দুবাই মেট্রোকে অনেক যাত্রীই বিশ্বমানের গণপরিবহন হিসেবে দেখেন। দ্রুতগতি, নির্ভরযোগ্যতা ও পরিষ্কার ব্যবস্থাপনার জন্য এটি শহরের লাখো মানুষের দৈনন্দিন জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ। তবে ভিড়ের সময়ে যাত্রীদের কিছু আচরণ এই অভিজ্ঞতাকে অনেকের জন্য অস্বস্তিকর করে তোলে। বিশেষ করে সকাল ও সন্ধ্যার ব্যস্ত সময়ে প্ল্যাটফর্ম ও বগিতে অতিরিক্ত চাপ তৈরি হলে ভদ্রতা ও সহনশীলতার অভাব স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
এই বাস্তবতায় দুবাইয়ের সড়ক ও পরিবহন কর্তৃপক্ষ সম্প্রতি মেট্রো ও ট্রামজুড়ে নিরাপত্তা ও গণপরিবহন শিষ্টাচার বিষয়ক একটি প্রচারণা শুরু করেছে। সাইনবোর্ড, ঘোষণাসহ ভিডিও বার্তার মাধ্যমে যাত্রীদের নিয়ম মেনে চলার কথা নিয়মিত মনে করিয়ে দেওয়া হচ্ছে। পাশাপাশি পরিদর্শনের ব্যবস্থাও রাখা হয়েছে। তবু অনেকের মতে, কিছু সাধারণ সৌজন্যবোধের অভাব এখনো যাত্রাকে কম আরামদায়ক করে তোলে।
দরজার সামনে ভিড়ের সমস্যা
নিয়মিত মেট্রো ব্যবহারকারী অনেকেই বলেন, সবচেয়ে সাধারণ অথচ বিরক্তিকর বিষয় হলো দরজার সামনে দাঁড়িয়ে থাকা। যাত্রীরা নামার আগেই ওঠার চেষ্টা করলে অযথা জট তৈরি হয়। জনসংযোগ পরামর্শক নিসরিন আরসিওয়ালার মতে, যাত্রীদের আগে নামতে দেওয়া একটি ছোট কিন্তু অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ শিষ্টাচার। এতে সময় বাঁচে এবং যাত্রা হয় আরও মসৃণ। তার ভাষায়, সবার একটু সচেতন আচরণই মেট্রোর বিশ্বমানের মান ধরে রাখতে পারে।

আসন নিয়ে নীরব টানাপোড়েন
ব্যস্ত সময়ে আসন পাওয়া অনেকের জন্য দৈনন্দিন সংগ্রাম। দীর্ঘ কর্মদিবস শেষে একাধিক জোন পার হতে হলে দাঁড়িয়ে থাকা শারীরিকভাবে ক্লান্তিকর হয়ে ওঠে। জনসংযোগ পেশাজীবী জয়নাব এ জিমোহ বলেন, বগির ভেতরে এক ধরনের নীরব চাপ কাজ করে। কে কখন নামবে, সেই অনুমান থেকে আসনের আশায় মানুষ অস্বস্তিকরভাবে দাঁড়িয়ে থাকে। তবু তিনি মনে করেন, অধিকাংশ যাত্রীই আসলে ভদ্র এবং নিজেদের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেন, যা মেট্রো সংস্কৃতির ইতিবাচক দিক।
প্রযুক্তির সম্ভাব্য সমাধান
এই আসনসংকটের ভাবনা থেকেই একটি নতুন অ্যাপ তৈরির কাজ করছেন জয়নাব। প্রস্তাবিত এই ব্যবস্থায় যাত্রীরা স্বেচ্ছায় কোন স্টেশনে নামবেন তা জানাতে পারবেন, ফলে একই বগির অন্য যাত্রীরা আগেভাগে ধারণা পাবেন কোথায় আসন খালি হতে পারে। তার মতে, এতে অপ্রয়োজনীয় ভিড় ও অস্বস্তি কমবে এবং যাত্রা হবে আরও স্বাচ্ছন্দ্যময়।
জাপানের অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা

বিভিন্ন দেশের মেট্রো ব্যবস্থায় ভ্রমণের অভিজ্ঞতা রয়েছে বিপণন যোগাযোগ পেশাজীবী অর্ণব ঘোষের। জাপানের উদাহরণ টেনে তিনি বলেন, সেখানে ফোনে কথা বললেও মানুষ এত নিচু স্বরে কথা বলেন যে পাশের জনের বিরক্তি হয় না। কিন্তু দুবাইয়ে এখনো অনেক সময় হেডফোন ব্যবহার করেও উচ্চ শব্দে ভিডিও বা গান শোনা যায়। তার মতে, গণপরিবহন কোনো ব্যক্তিগত ঘর নয়, এখানে অন্যের স্বাচ্ছন্দ্যের কথাও ভাবতে হয়।
উচ্চ শব্দ ও ব্যক্তিগত অস্বস্তি
একই অভিজ্ঞতার কথা জানান যাত্রী আন্না ইভানোভা গালিৎসিনা। তার অভিযোগ, অনেকেই ভয়েস বার্তা বা ভিডিও স্পিকারে চালান, ফলে আশপাশের মানুষের মনোযোগ নষ্ট হয়। তার মতে, হেডফোন ছাড়া এমন ব্যবহার বন্ধ হওয়া উচিত, কারণ এটি সাধারণ সৌজন্যের মধ্যেই পড়ে।
অতিরিক্ত ভিড় ও ঠাসাঠাসি
মেট্রো কর্মীরা ব্যস্ত স্টেশনে ভিড় সামলানোর চেষ্টা করলেও অনেক সময় যাত্রীরা অতিরিক্ত ঠাসাঠাসি করে পূর্ণ বগিতে ঢুকে পড়েন। এতে ভেতরের যাত্রীদের শ্বাস নিতেও কষ্ট হয়। হিসাব ব্যবস্থাপক সামিতা রাজপালের মতে, একটি বগি পূর্ণ হলে পরবর্তী স্টেশনে দরজা না খোলার ব্যবস্থা থাকলে এই সমস্যা অনেকটাই কমতে পারে।

রঙভিত্তিক নির্দেশনার প্রস্তাব
যাত্রী সুকাইনা কাজমি প্ল্যাটফর্মে রঙভিত্তিক নির্দেশনার কথা বলেন। তার ধারণা, সবুজ মানে জায়গা আছে, হলুদ মানে প্রায় পূর্ণ আর লাল মানে পূর্ণ বগি বোঝালে মানুষ স্বাভাবিকভাবেই আচরণ বদলাবে। এতে বারবার ঘোষণার প্রয়োজনও কমবে।
অগ্রাধিকার আসন নিয়ে অবহেলা
বয়স্ক, অন্তঃসত্ত্বা নারী ও বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন যাত্রীদের জন্য নির্ধারিত আসন থাকা সত্ত্বেও ব্যস্ত সময়ে অনেকেই তা মানেন না। তরুণ ও সক্ষম যাত্রীদের বসে থাকতে দেখে বয়স্কদের দাঁড়িয়ে থাকতে হয় বলে অভিযোগ করেন সামিতা রাজপাল। অর্ণব ঘোষ স্মরণ করেন, কাজাখস্তানে তরুণরা স্বতঃস্ফূর্তভাবে বয়স্কদের আসন ছেড়ে দিতেন। এই স্বাভাবিক সৌজন্যবোধ দুবাইতেও আরও বেশি দেখা গেলে যাত্রা হতো মানবিক।
সামাজিক মাধ্যমে যাত্রী মতামত
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে যাত্রীরা আরও কিছু সমস্যার কথা তুলে ধরেছেন। বড় আকারের ব্যাগ বা সামগ্রী নিয়ে বগিতে ওঠা এবং দরজার সামনে দাঁড়িয়ে অন্যদের ওঠানামায় বাধা দেওয়ার বিষয়টি বারবার উঠে এসেছে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















