যুক্তরাষ্ট্রের বিচার বিভাগ বহু প্রতীক্ষিত জেফ্রি এপস্টেইন সংক্রান্ত বিপুল নথি প্রকাশ করেছে। কংগ্রেসে পাস হওয়া স্বচ্ছতা আইনের আওতায় প্রায় ত্রিশ লক্ষ পৃষ্ঠার নথি জনসমক্ষে আনা হয়েছে। এই প্রকাশ ঘিরে শুরু হয়েছে নতুন রাজনৈতিক বিতর্ক, আইনি প্রশ্ন এবং নৈতিক দায়বদ্ধতা নিয়ে তীব্র আলোচনা।
নথির পরিমাণ এতটাই বিশাল যে সম্পূর্ণ তথ্য বিশ্লেষণে সময় লাগবে। তবে প্রাথমিক পর্যায়ে কয়েকটি বিষয় স্পষ্ট হয়ে উঠেছে, যা যুক্তরাষ্ট্রের রাজনীতিতে নতুন চাপ তৈরি করছে।
ট্রাম্পকে ঘিরে অপ্রমাণিত অভিযোগের নথি
প্রকাশিত কাগজপত্রে সাবেক প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের নাম বহুবার এসেছে। এর মধ্যে রয়েছে তদন্ত সংক্রান্ত নথি, ইমেইল এবং সংবাদসংকলন। একটি ইমেইল চেইনে এফবিআইয়ের একজন কর্মীর তৈরি তালিকায় ট্রাম্প ও এপস্টেইন সংক্রান্ত কিছু অভিযোগের উল্লেখ দেখা যায়, যেগুলো নিজেরাই অপ্রমাণিত বলে চিহ্নিত করেছেন কর্মকর্তারা। নথিতে বলা হয়েছে, এসব তথ্যের অনেকটাই দ্বিতীয় বা তৃতীয় হাতের এবং অনেক ক্ষেত্রেই অভিযোগকারীদের সঙ্গে যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি।
বিচার বিভাগ জানিয়েছে, ট্রাম্পের বিরুদ্ধে এপস্টেইন সংশ্লিষ্ট কোনো অপরাধে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর আনুষ্ঠানিক অভিযোগ নেই এবং তিনি সব ধরনের সংশ্লিষ্টতার কথা অস্বীকার করে আসছেন। হোয়াইট হাউসের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, আইনের বাধ্যবাধকতায় এমন কিছু নথি ও প্রকাশ করতে হয়েছে, যেখানে ভুয়া বা মিথ্যা দাবি থাকতে পারে।

মার আ লাগো থেকে ওঠা অভিযোগ ও ম্যাক্সওয়েলের ইমেইল
নথিতে এপস্টেইনের ঘনিষ্ঠ সহযোগী গিসলেইন ম্যাক্সওয়েলের সঙ্গে তার ইমেইল কথোপকথনের তথ্যও রয়েছে। সেখানে এক ভুক্তভোগীর প্রসঙ্গে আলোচনা দেখা যায়, যিনি ট্রাম্পের মার আ লাগো রিসোর্টে কাজ করতেন। অভিযোগের সত্যতা প্রশ্নবিদ্ধ করতে কীভাবে তথ্য জোগাড় করা যায়, সে বিষয়েও আলোচনা ছিল। এই বর্ণনা এপস্টেইনের পরিচিত ভুক্তভোগী ভার্জিনিয়া জিউফ্রের আগের বক্তব্যের সঙ্গে মিল খুঁজে পাচ্ছেন বিশ্লেষকেরা।
সম্ভাব্য সহ অপরাধী ও অসম্পূর্ণ বিচার
এপস্টেইন কেলেঙ্কারির সবচেয়ে বড় প্রশ্ন ছিল, তার অপরাধে আর কারা জড়িত ছিলেন। প্রকাশিত নথিতে ফ্লোরিডার একটি পুরোনো খসড়া অভিযোগপত্রের উল্লেখ রয়েছে, যেখানে এপস্টেইনের পাশাপাশি আরও কয়েক জনকে অভিযুক্ত করার পরিকল্পনা ছিল। নামগুলো মুছে ফেলা হলেও বর্ণনায় বলা হয়েছে, তারা অপ্রাপ্তবয়স্কদের সঙ্গে যোগাযোগের ব্যবস্থা করতেন। শেষ পর্যন্ত কেন তাদের বিরুদ্ধে মামলা হয়নি, তা নিয়ে আবারও প্রশ্ন উঠেছে।

প্রভাবশালী ব্যক্তিদের যোগাযোগ নিয়ে নতুন চাপ
নথিতে ট্রাম্প প্রশাসনের ঘনিষ্ঠ কয়েকজন ব্যক্তির নামও সামনে এসেছে। বাণিজ্যমন্ত্রী হাওয়ার্ড লুটনিকের ২০১২ সালের একটি ইমেইলে এপস্টেইনের দ্বীপে যাওয়ার পরিকল্পনার ইঙ্গিত পাওয়া যায়, যদিও তিনি পরে দাবি করেন যে তিনি এপস্টেইনের সঙ্গে কোনো সময় কাটাননি। একইভাবে প্রযুক্তি উদ্যোক্তা ইলন মাস্কের ইমেইলেও ওই দ্বীপে যাওয়ার সমন্বয়ের কথা উঠে এসেছে, যদিও বাস্তবে তিনি গিয়েছিলেন কি না, তা স্পষ্ট নয়।
সাবেক প্রেসিডেন্ট বিল ক্লিনটনের নামও নথিতে একাধিকবার এসেছে। যদিও তার পক্ষ থেকে বারবার বলা হয়েছে, এপস্টেইনের অপরাধ সম্পর্কে তিনি কিছুই জানতেন না এবং দ্বীপে যাননি।
ভুক্তভোগীদের তথ্য ফাঁস নিয়ে তীব্র সমালোচনা
নথি প্রকাশের সবচেয়ে গুরুতর বিতর্ক তৈরি হয়েছে ভুক্তভোগীদের পরিচয় সংক্রান্ত তথ্য যথাযথভাবে গোপন না রাখার অভিযোগে। এপস্টেইনের বহু ভুক্তভোগীর পক্ষে লড়া আইনজীবীরা বলেছেন, এতে তাদের গোপনীয়তা ও অধিকার মারাত্মকভাবে লঙ্ঘিত হয়েছে। বিচার বিভাগের পক্ষ থেকে স্বীকার করা হয়েছে, বিপুল নথির কারণে ভুল হওয়া অনিবার্য ছিল, তবে এই ব্যাখ্যা অনেকের কাছে গ্রহণযোগ্য হয়নি।

অপ্রকাশিত কষ্টের স্মৃতি
নথিতে উঠে এসেছে ভুক্তভোগীদের ভয়াবহ অভিজ্ঞতার বিবরণ, যা এপস্টেইন অপরাধের গভীরতা নতুন করে স্মরণ করিয়ে দেয়। বিচার শেষ হওয়ার আগেই তার মৃত্যু হওয়ায় বহু মানুষ ন্যায়বিচার পাওয়ার সুযোগ হারিয়েছেন। নতুন প্রকাশিত তথ্য সেই ক্ষত আবারও উন্মুক্ত করেছে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















