দশকের পর দশক ধরে স্থলযুদ্ধের রাজা ছিল ট্যাংক। কিন্তু ড্রোনের যুগে সেই আধিপত্য কি টিকে থাকবে। যুক্তরাষ্ট্রের সেনাবাহিনী নতুন প্রজন্মের ট্যাংক উন্মোচন করলেও যুদ্ধবিশেষজ্ঞদের একাংশ মনে করছেন এটি হয়তো ঐতিহ্যবাহী ট্যাংকের শেষ বড় সংস্করণ।
ডেট্রয়েটের আন্তর্জাতিক গাড়ি প্রদর্শনীতে ঝকঝকে বিলাসবহুল গাড়ির ভিড়ে আলাদা করে নজর কেড়েছে সেনাবাহিনীর নতুন ট্যাংক এম ওয়ান ই থ্রি। বাইরে থেকে আগের মতোই শক্তপোক্ত চেহারা। ভেতরে রয়েছে আধুনিক ডিজিটাল ব্যবস্থা, বড় পর্দা, উন্নত ক্যামেরা ও জ্বালানি সাশ্রয়ী হাইব্রিড ইঞ্জিন। সেনা কর্মকর্তাদের ভাষায়, গতি ও আগুনশক্তির সঙ্গে যুক্ত হয়েছে প্রযুক্তির নতুন স্তর।
সস্তা ড্রোনে ব্যয়বহুল ট্যাংকের সংকট
তবে উন্মোচনের আনন্দের আড়ালেই রয়েছে অস্বস্তিকর বাস্তবতা। আধুনিক যুদ্ধক্ষেত্রে হাজার ডলারের ড্রোন এখন কোটি টাকার ট্যাংকের জন্য প্রাণঘাতী হুমকি। রাশিয়া ও ইউক্রেনের যুদ্ধে সেই চিত্র স্পষ্ট। আকাশজুড়ে ঘুরে বেড়ানো বিস্ফোরকবাহী ছোট ড্রোনে ধ্বংস হয়েছে অসংখ্য সাঁজোয়া যান। ফলে টিকে থাকতে ট্যাংককে অনেক সময় সামনের সারি ছেড়ে বহু দূরে অবস্থান নিতে হচ্ছে।
যুদ্ধবিশ্লেষকদের মতে, একসময় যে নিখুঁত অস্ত্র ছিল ট্যাংক, ড্রোনের ভিড়ে তার কার্যকারিতা প্রশ্নের মুখে। কম খরচে ব্যাপক নির্ভুল আঘাতের সক্ষমতা যুদ্ধের হিসাব পাল্টে দিয়েছে। বহু ড্রোন একসঙ্গে হামলা চালালে উন্নত প্রতিরক্ষা ও ভেঙে পড়তে পারে।
ইতিহাসে ট্যাংক বনাম নতুন অস্ত্র
ট্যাংকের সংকট নতুন নয়। প্রথম মহাযুদ্ধে এর জন্মের পর থেকেই পাল্টা অস্ত্রের সঙ্গে লড়াই চলছে। কাঁধে বহনযোগ্য রকেট, নির্দেশিত ক্ষেপণাস্ত্র, আকাশ থেকে আক্রমণকারী হেলিকপ্টার—প্রতিটি ধাপে ট্যাংক নিজেকে বদলেছে। ওজন বেড়েছে, গতি বেড়েছে, বর্ম হয়েছে আরও শক্ত। আজকের আধুনিক ট্যাংকে রয়েছে স্বয়ংক্রিয় প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ও বিস্ফোরক প্রতিরোধী বর্ম।

কিন্তু এই উন্নতির দাম ও আকাশছোঁয়া। একটি আধুনিক ট্যাংকের মূল্য কোটি কোটি টাকা। রক্ষণাবেক্ষণ ও জ্বালানির খরচ যোগ হলে ব্যয় আরও বাড়ে। সেই ট্যাংক যদি কয়েকটি সস্তা ড্রোনে ধ্বংস হয়, তাহলে যুদ্ধক্ষেত্রে তার মূল্য নিয়ে প্রশ্ন ওঠাই স্বাভাবিক।
ভবিষ্যতের ট্যাংকের রূপ বদল
তবু সামরিক বিশ্লেষকদের সবাই ট্যাংকের বিদায় ঘোষণা করছেন না। তাঁদের মতে, অতীতেও বহুবার ট্যাংকের মৃত্যু সংবাদ লেখা হয়েছে, কিন্তু ট্যাংক টিকে আছে। মানবচালিত সুরক্ষিত আগুন শক্তির প্রয়োজন এখনও শেষ হয়ে যায়নি। তবে ভূমিকায় আসছে বড় পরিবর্তন।
ভবিষ্যতে ট্যাংকের সংখ্যা কমতে পারে, অবস্থান হতে পারে আরও পেছনে। সরাসরি আক্রমণের বদলে এটি কাজ করতে পারে চলমান কমান্ড কেন্দ্র হিসেবে। সেখান থেকে নিয়ন্ত্রণ করা হবে সস্তা ও ব্যয়যোগ্য ড্রোন ও রোবট যান। নতুন এম ওয়ান ই থ্রি সেই ধারণার দিকেই এগোচ্ছে। এর ভেতরের সফটওয়্যার সহজে বদলানো যাবে, নতুন সেন্সর বা ড্রোন প্রতিরোধ ব্যবস্থা দ্রুত যুক্ত করা সম্ভব হবে। এমনকি দূরনিয়ন্ত্রণে চালানোর ব্যবস্থাও উন্নয়নের পথে, যেখানে ক্রু ছাড়াই ট্যাংক চলবে।
ড্রোনের যুগে টিকে থাকার জন্য ট্যাংকের সামনে একটাই পথ খোলা। নিজেই ড্রোনে রূপ নেওয়া, অথবা ড্রোনের সঙ্গে একীভূত হয়ে যুদ্ধক্ষেত্রে নতুন ভূমিকা নেওয়া।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















