ইউরোপের রাজনৈতিক কেন্দ্র নতুন বছরের শুরুতেই গভীর অনিশ্চয়তায়। জনসমর্থনহীন সরকার, ডান ও বাম উগ্রপন্থার চাপ এবং যুক্তরাষ্ট্রের নতুন প্রশাসনের প্রকাশ্য দূরত্ব—সব মিলিয়ে মহাদেশজুড়ে শাসনক্ষমতার ভিত নড়বড়ে। এ বছর বড় কোনো জাতীয় নির্বাচন না থাকলেও একের পর এক দেশে রাজনৈতিক অচলাবস্থার ঝুঁকি স্পষ্ট, যা দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতির দিকেই ইঙ্গিত দিচ্ছে।
যুক্তরাজ্যে স্টারমারের কঠিন পরীক্ষা
বছরের প্রথম বড় রাজনৈতিক পরীক্ষার মুখে যুক্তরাজ্য। দীর্ঘ সময় ধরে জনমত জরিপে এগিয়ে থাকা সংস্কারপন্থী শক্তির উত্থান স্থানীয় নির্বাচনে বাস্তবে রূপ নিলে মূলধারার রাজনীতি আরও প্রান্তিক হয়ে পড়বে। জনপ্রিয়তা ধরে রাখতে শাসক ও বিরোধী দলকে নিজ নিজ প্রান্তে সরে যেতে হতে পারে। স্টারমারের সরকারের প্রতি অসন্তোষ এতটাই গভীর যে বসন্ত পেরোনোর আগেই নেতৃত্ব পরিবর্তনের সম্ভাবনা আলোচনায়। দলীয় ভেতরের বামঘেঁষা নেতৃত্ব এলে লেবার পার্টির গ্রহণযোগ্যতা আরও সংকুচিত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। ধারাবাহিক ব্যর্থতার পর রক্ষণশীল শিবিরের ভাঙনও স্পষ্ট, ফলে শতাব্দীজুড়ে গড়ে ওঠা দ্বিদলীয় কাঠামো টিকে থাকবে কি না, তা নিয়েও প্রশ্ন উঠছে।

ফ্রান্সে শাসন অচলাবস্থা
ফ্রান্সে পরিস্থিতি আরও জটিল। অল্প সময়ে একাধিক সরকার বদল, বাজেট পাসে ব্যর্থতা এবং ঝুলন্ত সংসদ দেশটিকে কার্যত অশাসনযোগ্য করে তুলেছে। বর্তমান সরকার পতনের মুখে পড়লে নতুন নির্বাচনের চাপ বাড়বে। সেই সুযোগে উগ্র জাতীয়তাবাদী শক্তি সংসদে আরও শক্ত অবস্থান নিতে পারে, এমনকি আধুনিক ইতিহাসে প্রথমবারের মতো দেশটি পপুলিস্ট প্রধানমন্ত্রীর মুখ দেখার সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।
জার্মানিতে ডানপন্থীদের চাপ
জার্মানিতে একের পর এক প্রাদেশিক নির্বাচনের আগে ডানপন্থী শক্তির উত্থান শাসক জোটকে চাপে ফেলছে। সামাজিক গণতান্ত্রিকদের দুর্বলতা রক্ষণশীলদের ঐতিহাসিক দূরত্ব নীতিকে প্রশ্নের মুখে ফেলছে। পূর্বাঞ্চলে সীমিত সমঝোতার ইঙ্গিতও কেন্দ্রীয় জোটের স্থিতি ভেঙে দিতে পারে।

ইউরোপীয় কেন্দ্র কেন ভাঙছে
গত এক দশকে অভিবাসন নিয়ে ক্ষোভ, স্থবির জীবনমান, শিল্পহ্রাস এবং শহুরে অভিজাত ও সাধারণ মানুষের দূরত্ব রাজনৈতিক কেন্দ্রকে দুর্বল করেছে। তরুণ ভোটারদের হতাশা এই ভাঙনকে আরও ত্বরান্বিত করছে। একই সময়ে আটলান্টিক সম্পর্কেও টানাপোড়েন। ইউক্রেন ও সামরিক জোটে দায় ভাগাভাগি নিয়ে অনীহা ইউরোপের নিরাপত্তা প্রশ্নকে আরও জটিল করেছে। দুর্বল সরকারগুলোর পক্ষে দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ ও প্রতিরক্ষা ব্যয় বজায় রাখা কঠিন হয়ে পড়ছে।
টিকে থাকা মানেই শাসন নয়
কিছু দেশে নেতৃত্ব হয়তো টিকে যাবে, কোথাও উগ্র শক্তি প্রত্যাশা অনুযায়ী ফল নাও পেতে পারে। কিন্তু টিকে থাকাই শাসন নয়। অর্থনৈতিক প্রতিযোগিতা, উৎপাদনশীলতা ও নিরাপত্তা জোরদারে সিদ্ধান্তহীনতা চললে কেন্দ্রের প্রতি অনাস্থা আরও বাড়বে। প্রতিটি ব্যর্থতা সেই ধারণাকেই শক্ত করে যে ব্যবস্থার বাইরে থাকা শক্তিরাই নাকি সমাধান দিতে পারে।

কাজের সময় কমানোর ভাবনা
এই রাজনৈতিক অস্থিরতার মধ্যেই কাজ ও উৎপাদনশীলতা নিয়ে নতুন আলোচনা গুরুত্ব পাচ্ছে। অভিজ্ঞতা বলছে, বেশি সময় কাজ করলেই অর্থনীতি শক্তিশালী হয় না। বরং কম সময়ে বেশি কার্যকর ফল আনাই ভবিষ্যতের চাবিকাঠি। কর্মীদের বিশ্রাম ও মনোযোগ ফিরলে উৎপাদনশীলতা বাড়ে। চার দিনের কর্মসপ্তাহ কোনো বিলাস নয়, বরং দক্ষতা বাড়ানোর একটি প্রণোদনা। কাজের অগ্রাধিকার ঠিক করা, অপ্রয়োজনীয় বৈঠক কমানো এবং প্রযুক্তির যথাযথ ব্যবহার—এসবের মধ্য দিয়েই কম সময়ে বেশি ফল সম্ভব।
ভবিষ্যতের দিশা
জ্ঞানভিত্তিক অর্থনীতি ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার যুগে সবচেয়ে সফল হবে তারা, যারা সময়ের সঠিক ব্যবহার জানে। ইউরোপের রাজনৈতিক কেন্দ্রের জন্যও শিক্ষা একই—দৃঢ় সিদ্ধান্ত, বাস্তব সংস্কার আর মানুষের জীবনে দৃশ্যমান পরিবর্তনই পারে আস্থা ফিরিয়ে আনতে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















