যুক্তরাষ্ট্রে প্রতি বছর প্রায় এক লাখ মানুষের মৃত্যু হয় মাদক অতিরিক্ত সেবনের কারণে। এই বাস্তবতাকে সামনে রেখে সাবেক প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দাবি করেছেন, ভেনেজুয়েলার ৩৫টি নৌযানে চালানো তাঁর বিমান হামলা প্রতিটিই নাকি অন্তত পঁচিশ হাজার মানুষের জীবন বাঁচিয়েছে। তাঁর যুক্তি, মাদক পাচারের পথ ধ্বংস করা হয়েছে। কিন্তু এত বড় দাবির পক্ষে এখনো কোনো মাদক বোঝাই থাকার প্রমাণ প্রকাশ পায়নি। বিশেষজ্ঞদের মতে, ভেনিজুয়েলা যুক্তরাষ্ট্রে ফেন্টানিল প্রবেশের প্রধান পথ নয়, অথচ এই ফেন্টানিলই অধিকাংশ অতিরিক্ত সেবন জনিত মৃত্যুর মূল কারণ।
ওভাল অফিস থেকে যুদ্ধ ঘোষণা
২০২৫ সালের ডিসেম্বরে হোয়াইট হাউসের ওভাল অফিসে দাঁড়িয়ে ট্রাম্প এক নির্বাহী আদেশে ফেন্টানিলকে গণবিধ্বংসী অস্ত্র ঘোষণা করেন। এরপরই শুরু হয় ব্যাপক সামরিক তৎপরতা। ঐতিহ্যগতভাবে মাছ ধরার কাজে ব্যবহৃত ছোট নৌযান গুলোকে লক্ষ্য করে চালানো অভিযানে যুক্ত করা হয় পশ্চিম গোলার্ধের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় নৌবহর। একটি বিশাল বিমানবাহী রণতরী, আরও দশটি যুদ্ধজাহাজ, সত্তরটি যুদ্ধবিমান, একটি পারমাণবিক সাবমেরিন এবং পনেরো হাজার সেনা এতে অংশ নেয়। এই অভিযানের নাম দেওয়া হয় পূর্ণ সংকল্প অভিযান।

ভেনেজুয়েলায় ক্ষমতা দখলের নাটক
এই অভিযানের ধারাবাহিকতায় জানুয়ারির শুরুতে ভেনিজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরো ও তাঁর স্ত্রীকে গ্রেপ্তারের ঘোষণা আসে। অভিযোগ আনা হয় মাদক পাচারের। একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র ভেনেজুয়েলার তেল খাতের নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার এবং দেশ পরিচালনার কথাও প্রকাশ্যে জানায়। ট্রাম্প তখন বিশ্বজুড়ে অন্য দেশগুলোকেও সতর্ক করেন, প্রয়োজনে তাদের বিরুদ্ধে ও একই ধরনের অভিযান চালানো হতে পারে।
মাদক গবেষকদের ঐকমত্য
মাদক নিয়ে কাজ করা গবেষকদের মধ্যে একটি বিষয়ে স্পষ্ট ঐকমত্য রয়েছে। শুধু সরবরাহ বন্ধ করে অতিরিক্ত সেবন জনিত মৃত্যু কমানো কার্যত অসম্ভব, যদি একই সঙ্গে চাহিদা কমানোর উদ্যোগ না নেওয়া হয়। একতরফা দমনমূলক পদক্ষেপ প্রায়ই উল্টো ফল দেয়। বড় মাদক ব্যবসায়ীদের গ্রেপ্তারের পর অনেক সময় আরও বেশি মৃত্যু ঘটে, কারণ আসক্তরা তখন আরও বিপজ্জনক উৎসের দিকে ঝুঁকে পড়ে। যুক্তরাষ্ট্রে অতীতেও ওষুধ কোম্পানির অনিয়ন্ত্রিত প্রচারণা ঠেকাতে নেওয়া কঠোর পদক্ষেপের পর দেশজুড়ে অতিরিক্ত সেবনের মৃত্যু হঠাৎ বেড়ে গিয়েছিল।

মৃত্যুর প্রকৃত উৎস কোথায়
বর্তমানে আঠারো থেকে চুয়াল্লিশ বছর বয়সীদের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রে মৃত্যুর প্রধান কারণ অতিরিক্ত মাদক সেবন। এসব মৃত্যুর বেশির ভাগই অবৈধ ফেন্টানিলের কারণে ঘটে। এই ফেন্টানিল সাধারণত মেক্সিকোতে তৈরি হয়, যেখানে চীন থেকে আসা রাসায়নিক উপাদান ব্যবহার করা হয়। এরপর তা বৈধ প্রবেশপথ দিয়ে ব্যক্তিগত যানবাহনের মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রে ঢোকে। ভেনেজুয়েলা মূলত ইউরোপমুখী কোকেন পাচারের একটি কেন্দ্র। যুক্তরাষ্ট্রে অবৈধ ওপিওয়েড প্রবাহে তাদের ভূমিকা প্রায় নেই বললেই চলে। এমনকি ভেনিজুয়েলা থেকে আসা সব মাদক পুরোপুরি বন্ধ করলেও যুক্তরাষ্ট্রে অতিরিক্ত সেবনজনিত মৃত্যুর সংখ্যায় উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন হবে না বলেই বিশেষজ্ঞদের ধারণা।
ঘরে ভেঙে পড়ছে চিকিৎসা ব্যবস্থা
বিদেশে মাদকবিরোধী যুদ্ধের গল্প শোনানো হলেও দেশের ভেতরে একই সময়ে ভেঙে পড়ছে চিকিৎসা ও প্রতিরোধ কাঠামো। স্বাস্থ্য দপ্তরের নেতৃত্বে থাকা রবার্ট এফ কেনেডি জুনিয়রের সিদ্ধান্তে মাদকাসক্তি ও মানসিক স্বাস্থ্য সেবা সংস্থার কার্যক্রম ব্যাপকভাবে সংকুচিত হয়। প্রায় দুই বিলিয়ন ডলারের অনুদান বন্ধ হয়ে যায়, যার মধ্যে আসক্তি ও অতিরিক্ত সেবন প্রতিরোধে বরাদ্দ ছিল বিপুল অর্থ। সংস্থাটির অর্ধেক কর্মী এবং শীর্ষ পর্যায়ের বহু নেতা পদ হারান।

গবেষণা ও নজরদারিতে কাটছাঁট
মাদক গবেষণা প্রতিষ্ঠানে শত শত মিলিয়ন ডলারের প্রকল্প বাতিল করা হয়, হাজারের বেশি গবেষক ও কর্মী ছাঁটাই হন। এমনকি পুরো প্রতিষ্ঠান বিলুপ্তির প্রস্তাব ও আসে। অথচ ২০২৫ সালের মাঝামাঝি সময়ে রোগ নিয়ন্ত্রণ কেন্দ্র জানিয়েছিল, সাময়িক হিসাব অনুযায়ী আগের বছরে অতিরিক্ত সেবন জনিত মৃত্যু সাতাশ শতাংশ কমেছে। এটি ছিল তিন দশকের মধ্যে প্রথম ধারাবাহিক পতন, বিশেষ করে অবৈধ ফেন্টানিল জনিত মৃত্যুর ক্ষেত্রে। এই তথ্য ইঙ্গিত দিচ্ছিল, ভেতরের কিছু কর্মসূচি হয়তো কাজ করছিল।
নীরব যুদ্ধের পরিণতি
নতুন প্রশাসনের সময়ে রোগ নিয়ন্ত্রণ কেন্দ্র ও ব্যাপক জনবল হারায় এবং স্থায়ী নেতৃত্বশূন্য হয়ে পড়ে। অতিরিক্ত সেবন প্রতিরোধ বিভাগ বিলুপ্ত করার প্রস্তাব আসে, যেখানে ওপিওয়েড শব্দটি ই নেই স্বাস্থ্য বিষয়ক ঘোষণাপত্রে। ফলে প্রশ্ন উঠছে, বিদেশে সামরিক শক্তি প্রদর্শনের আড়ালে কি দেশের ভেতরের একটি নীরব যুদ্ধ হারিয়ে যাচ্ছে। জনপ্রিয়তা সংকটে থাকা একটি প্রশাসন কি ইতিহাসের মতোই বাইরের শূন্য জয়ে মনোযোগ দিচ্ছে, যখন ঘরে প্রতিদিন অসংখ্য মানুষ অদৃশ্যভাবে প্রাণ হারাচ্ছে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















