০৯:৫২ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ০৫ ফেব্রুয়ারী ২০২৬
ঢাকা-দিল্লি সম্পর্ক কিছুটা স্থবির ও বাধাগ্রস্ত ছিল: পররাষ্ট্র উপদেষ্টা ইউক্রেন-রাশিয়া শান্তি আলোচনায় বন্দি বিনিময় চুক্তি, তবু যুদ্ধবিরতি অনিশ্চিত নির্বাচনী পরিবেশ নিয়ে শঙ্কা: অবাধ ভোট না হলে প্রশ্নবিদ্ধ হবে গণতন্ত্র তরুণদের হাতে দেশের হাল ধরার আহ্বান, বেকার ভাতার বদলে দক্ষতা ও মর্যাদার প্রতিশ্রুতি জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে ফুটবল ফাইনাল ঘিরে রক্তাক্ত সংঘর্ষ, সাংবাদিকসহ আহত অন্তত ২০ বাংলাদেশের পক্ষ নিয়ে ভারতের বিরুদ্ধে না খেলার সিদ্ধান্তে অনড় থাকতে পারবে পাকিস্তান? ভারত–যুক্তরাষ্ট্র জোটে নতুন অধ্যায়, গুরুত্বপূর্ণ খনিজ বাণিজ্য জোটে চীনের আধিপত্য ঠেকাতে যৌথ অগ্রযাত্রা সরকারি টাকার ছয় কোটি একত্রিশ লাখ আত্মসাৎ, গণপূর্ত বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী সাময়িক বরখাস্ত স্বর্ণ-রূপার দামে হঠাৎ তীব্র উত্থান, অস্থির বাজারে বিনিয়োগকারীদের নতুন ভরসা ইমরানের ছেলেদের ভিসা আটকে রাখার অভিযোগে নতুন বিতর্ক, আন্তর্জাতিক মহলের হস্তক্ষেপ চাইলেন কাসিম

মির্জা আব্বাস, নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী, মেঘনা আলম- ‘ভাইরাল’ ঢাকা ৮ আসনে কী চলছে?

  • Sarakhon Report
  • ০৭:৫৮:৪৯ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ৫ ফেব্রুয়ারী ২০২৬
  • 17

অনলাইন গেম ‘পাটাব্বাস’ খেলছিলেন একজন, আর তার ওপর ঝুঁকে বেশ আগ্রহ নিয়ে খেলাটি দেখছিলেন আরো দুইজন। ঢাকার শান্তিনগর মোড়ের পাশে একটি গলিতে দেখা যায় এই দৃশ্য।

“বের হওয়ার পর থেকেই গেমটা খেলতেছি। খুব মজা পাইতেছি,” বিবিসি বাংলাকে বলছিলেন মোহাম্মদ কামরুল।

গত কিছুদিন ধরে ফেসবুকসহ সামাজিক বিভিন্ন যোগাযোগ মাধ্যমে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়া নতুন ওই অনলাইন গেমটি তৈরি হয়েছে ঢাকা-৮ আসনের দুই প্রতিন্দ্বন্দী প্রার্থী মির্জা আব্বাস এবং নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারীর মধ্যকার সাম্প্রতিক রেষারেষির সম্পর্কের পটভূমিতে।

‘পাটাব্বাস’ নামটিও রাখা হয়েছে তাদের দু’জনের নামের সংমিশ্রণে।

“গেমটাতে নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী হইলো মশা। আর মির্জা আব্বাস হইলো ঢাকা-৮ এর কিং। এখন যে গেমটা খেলবে, তার কাজ হলো নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারীর কামড় থেকে মির্জা আব্বাসকে রক্ষা করা। সেটা না করতে পারলে মির্জা আব্বাস রাগ হয়ে যায়, তখন গেমও ওভার হয়ে যায়,” বলেন মি. কামরুল।

বস্তুত, প্রার্থী হিসেবে নাম ঘোষণার পর থেকেই বিভিন্ন বিষয়ে একে অপরের বিরুদ্ধে পাল্টা-পাল্টি অভিযোগ করে আসছিলেন বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) ও জাতীয় নাগরিক পার্টি’র (এনসিপি) এই দুই প্রার্থী।

সম্প্রতি ঢাকায় একটি অনুষ্ঠানে মি. পাটওয়ারীকে লক্ষ্য করে ডিম নিক্ষেপের ঘটনাও ঘটেছে। এ ঘটনার পর দু’পক্ষের বৈরিতায় নতুন মাত্রা যুক্ত হয়েছে, যা নিয়ে ভোটারদের মধ্যে উদ্বেগ লক্ষ্য করা যাচ্ছে।

এদিকে, নিরাপত্তা শঙ্কায় বর্তমানে নির্বাচনী প্রচারণা থেকে দূরে রয়েছেন বলে বিবিসি বাংলাকে জানিয়েছেন একই আসনের গণঅধিকার পরিষদের প্রার্থী মেঘনা আলম। মাথায় মুকুট পরে ভোটের প্রচারণায় অংশ নিয়ে সম্প্রতি বেশ আলোচনার জন্ম দেন তিনি।

ঢাকার রাস্তায় অনলাইন গেম 'পাটাব্বাস' খেলছেন তরুণরা
মির্জা আব্বাস এবং নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারীর মধ্যকার সাম্প্রতিক রেষারেষির সম্পর্কের পটভূমিতে তৈরি হয়েছে অনলাইন গেম ‘পাটাব্বাস’

বাকযুদ্ধ ঘিরে উত্তাপ

শুরুতে বিভিন্ন ইস্যুতে মির্জা আব্বাস ও নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারীকে পাল্টাপাল্টি বক্তব্য দিতে দেখা গেলেও সেটি ক্রমেই বাকযুদ্ধে রূপ নিতে থাকে গত ২২শে জানুয়ারি ভোটের প্রচারণা শুরু হওয়ার পর থেকে।

এর মধ্যে গত ২৭শে জানুয়ারির একটি ঘটনায় পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হয়ে ওঠে।

ওইদিন ঢাকার হাবিবুল্লাহ বাহার কলেজে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে গিয়ে দফায় দফায় ডিম হামলার শিকার হন ঢাকা-৮ আসনে জামায়াত জোট সমর্থিত এনসিপি’র প্রার্থী নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী।

ওই ঘটনার পেছনে বিএনপি প্রার্থী মির্জা আব্বাসের হাত রয়েছে বলে অভিযোগ করেছেন তিনি।

“ছাত্রদলের কিছু ছেলে, যারা মির্জা আব্বাসের লোক, তারা উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে এই ঘটনা ঘটিয়েছে। তা না হলে ক্যাম্পাসে ডিম কোত্থেকে আসবে? ক্যাম্পাস তো আর হোটেল-রেস্তোরাঁ না যে অনেক ডিম রাখা থাকবে,” বিবিসি বাংলাকে বলছিলেন মি. পাটওয়ারী।

যদিও অভিযোগ অস্বীকার করে মি. আব্বাস উল্টো দাবি করেছেন, মানুষের সহানুভূতি পাওয়ার উদ্দেশ্য এনসিপি’র প্রার্থী তার বিরুদ্ধে ‘মিথ্যা অভিযোগ’ তুলছেন।

“মানুষের সিম্প্যাথি (সহানুভূতি) পাওয়ার জন্য উনি এসব মিথ্যা অভিযোগ তুলছেন। আমার ব্যাপারে ওই একজন প্রার্থী বাদে আর কেউ কোনো বাজে কথা বলছে না, অভিযোগও করছে না। উনি এগুলো বলছেন, কারণে তার নিজের সম্পর্কে বলার মতো কিছু নাই,” বিবিসি বাংলাকে বলেন মি. আব্বাস।

ভোটের প্রচারণায় ব্যস্ত মির্জা আব্বাস
ভোটের প্রচারণায় ব্যস্ত মির্জা আব্বাস

সুষ্ঠু ভোট নিয়ে শঙ্কা

শুরুর দিকে সুষ্ঠু ভোটের ব্যাপারে আশাবাদী জানালেও নির্বাচনের দিন যতই এগিয়ে আসছে, ততই সংশয় বাড়তে দেখা যাচ্ছে প্রার্থীদের মধ্যে।

বিশেষ করে, বিএনপি ও এনসিপি’র প্রার্থীরা একে অন্যের বিরুদ্ধে কেন্দ্র দখল ও ভোট কারচুপির ষড়যন্ত্র করার অভিযোগ তুলছেন।

“আমরা জানতে পেরেছি যে, এই আসনে ভোট কেনা, কেন্দ্র দখল বা ইলেকশন রিগিং করার একটা পরিকল্পনা চলছে। বিভিন্ন জায়গা সরকারি যে অফিসগুলো রয়েছে, সেগুলোতে বিএনপি’র লোকরা সরাসরি গিয়ে ভয়ভীতি দেখাচ্ছে যেন ভোটে তারা বিজয়ী হয়,” বলছিলেন এনসিপি’র প্রার্থী মি. পাটওয়ারী।

যদিও অভিযোগ অস্বীকার করেছেন বিএনপি’র প্রার্থী মির্জা আব্বাস।

“এসব অভিযোগের কোনো ভিত্তি নেই। বরং কিছু কিছু প্রার্থীর কথা শুনে আমার মনে হচ্ছে, ওরা জিতেই আছে। এতেই আমার সন্দেহ ঘনীভূত হচ্ছে যে, নির্বাচনে একটা কারচুপি করার কিংবা ইলেকশন ইঞ্জিনিয়ারিং করার একটা চিন্তা তারা করতেছে,” বলেন মি. আব্বাস।

এনসিপি’র প্রার্থীর দিকে ইঙ্গিত করে তিনি আরও বলেন, “ওদের যদি ইলেকশন ইঞ্জিনিয়ারিং করার পরিকল্পনা না-ই থাকে, তাহলে তারা এতটা শিওর (নিশ্চিত) হয় কী করে? আমি এতবছর ধরে রাজনীতি করার পরও ভোটে জেতার ব্যাপারে শিওর হতে পারি না, ওরা এতটা শিওর হয় কী করে? এটা সম্ভব তখনই, যদি কারচুপি করার মতো একটা প্রক্রিয়া তাদের হাতে থাকে।”

এমন অভিযোগের বিষয়ে মন্তব্য জানতে চাইলে নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী দাবি করেন যে, তারা ভোটারদের কাছে যেভাবে সাড়া পেয়েছেন, সেটির প্রেক্ষিতেই জয়ের ব্যাপারে আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন।

“আমি সৎভাবে জনগণের জন্য কাজ করছি। আর যখন মানুষের জন্য কাজ করে থাকি, মানুষ তো অবশ্যই তাদের প্রতিনিধিকে নির্বাচন করবে। জনগণের তো মন মানসিকতা আগের চেয়ে পরিবর্তন হয়েছে। জনগণ যদি আমাকে চায়, উনি তো জোর করে সেটা থামাতে পারবের না,” বিবিসি বাংলাকে বলেন মি. পাটওয়ারী।

মাথায় মুকুট পরে প্রচারণায় অংশ নিচ্ছেন মেঘনা আলম, তার পাশে তিন চারজন লোক
মাথায় মুকুট পরে প্রচারণায় অংশ নিয়ে ইতোমধ্যেই সামাজিক মাধ্যমে আলোচিত হয়েছেন মেঘনা আলম

প্রচারণার মাঠে নেই মেঘনা আলম

বিএনপি ও এনসিপি’র প্রার্থীদের বাইরে ঢাকা-৮ আসনে গণঅধিকার পরিষদের প্রার্থী মেঘনা আলমকে ঘিরেও নানান আলোচনা হতে দেখা যাচ্ছে।

বাংলাদেশে একটি সুন্দরী প্রতিযোগিতায় প্রথম স্থান অর্জন করা মিজ আলম মাথায় মুকুট পরে প্রচারণায় অংশ নিয়ে ইতোমধ্যেই সামাজিক মাধ্যমে আলোচিত হয়েছেন।

“আমরা সবসময় সৌন্দর্য প্রতিযোগিতায় বলি যে, দেশ বদলে ফেলবো এবং সবাই মনে করে, এটা জাস্ট বলার জন্য বলছে। তারা মনে হয় কাজ করছে না,” বিবিসি বাংলাকে বলছিলেন মিজ আলম।

“কিন্তু এখন আমি মাথায় ক্রাউন পরে মানুষের কাছে যাচ্ছি এবং সাধারণ মানুষ যখন আমাকে দেখছে, তখন তাদের ভুল ধারণাটা ভেঙে যাচ্ছে,” যোগ করেন গণঅধিকার পরিষদের এই প্রার্থী।

তবে নিরাপত্তা শঙ্কায় গত কিছুদিন ধরে নির্বাচনী প্রচারণায় অংশ নিচ্ছেন না তিনি। যদিও তার দলের নেতাকর্মীরা প্রচারণার কাজ চালিয়ে যাচ্ছেন।

“প্রচারণায় নামার পর থেকেই আমি এবং আমার কর্মীরা নানান হুমকি-ধামকি পেয়ে আসছিলাম। কিছুদিন আগে আমাকে রেপ থ্রেটও (ধর্ষণের হুমকি) দেওয়া হয়েছে। সেজন্য নিরাপত্তা ঝুঁকি থাকায় আপাতত কিছুদিন মাঠের প্রচারণায় অংশ না নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছি,” বিবিসি বাংলাকে বলেন মিজ আলম।

নির্বাচন কমিশনে ঘোষণা অনুযায়ী, আগামী দশই ফেব্রুয়ারি সকাল সাড়ে সাতটা পর্যন্ত প্রচারণা চালাতে পারবেন প্রার্থীরা। কাজেই ভোট চাওয়ার জন্য সময়ও বেশি বাকি নেই।

“সেজন্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করে দ্রুত প্রচারণায় যোগ দিতে চাই। এরই মধ্যে অস্ত্রের লাইসেন্সের জন্য আবেদন করেছি এবং স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টাকে বিষয়টি জানানোও হয়েছে। কিন্তু তারপরও এখন পর্যন্ত আমাকে লাইসেন্স দেওয়া হয়নি,” বলেন মেঘনা আলম।

“অথচ আমার পরে আবেদন করেও অনেকে লাইসেন্স পেয়ে গেছেন। কেউ কেউ পুলিশি নিরাপত্তাও পাচ্ছেন। এক্ষেত্রে সরকার ও নির্বাচন কমিশন পক্ষপাতমূলক আচরণ করছে বলে আমি মনে করি,” যোগ করেন গণঅধিকার পরিষদের এই প্রার্থী।

হাত নেড়ে ভোট চাচ্ছেন নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী
জামায়াত জোটের প্রার্থী হিসেবে লড়াই করছেন নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী

ভোটাররা কী বলছেন?

নির্বাচন ঘিরে প্রার্থীদের মধ্যে পাল্টা-পাল্টি অভিযোগ ও রেষারেষির যেসব ঘটনা ঘটছে, সেগুলো দেখে হতাশা প্রকাশ করেছেন ঢাকা-৮ আসনের ভোটাররা।

“প্রতিদ্বন্দিতা থাকতে পারে, দুই-চার কথা হইতে পারে। কিন্তু সার্বিকভাবে এটা ভালো লক্ষণ না। এভাবে রেষারেষি চলতে থাকলে পরবর্তীতে মারামারিতে রূপ নেবে,” বলছিলেন শাহজাহানপুর এলাকার ভোটার জসিম উদ্দিন, যিনি পেশায় একজন ব্যবসায়ী।

ঢাকা-৮ আসনটি মূলত রাজধানীর রমনা, শাহবাগ, মতিঝিল, কাকরাইল, মগবাজারের অংশবিশেষ নিয়ে গঠিত।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, সচিবালয় এ এলাকায় হওয়ায় আসনটিকে দেশের প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের কেন্দ্রস্থল বলা যায়। এ আসনে রয়েছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা মেডিকেল কলেজ, কমলাপুর রেলস্টেশনের মতো গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা।

বিএনপি, এনসিপি ও গণঅধিকার ছাড়াও আসনটিতে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের কেফায়েত উল্লা, জনতার দলের মো. গোলাম সারোয়ার, বাংলাদেশ জাসদের এ এফ এম ইসমাইল চৌধুরী, বাংলাদেশ ইসলামী ফ্রন্টের এস এম সরওয়ার, বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির ত্রিদ্বীপ কুমার সাহা, জাতীয় পার্টির জুবের আলম খান, মুক্তিজোটের মো. রাসেল কবির এবং বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দলের এ এইচ এম রাফিকুজ্জামান আকন্দ ভোট করছেন।

প্রার্থীদের সবার নজর এখন আসনের প্রায় দুই লাখ ৭৫ হাজার ৪৭১ জন ভোটারের দিকে, যাদের বড় অংশই বয়সে তরুণ।

জুলাই গণঅভ্যুত্থানে নেতৃত্ব দেওয়া ছাত্র নেতাদের বড় একটি অংশ এখন এনসিপি’র সঙ্গে রয়েছেন। এবারের নির্বাচনে তরুণ ভোটারদের সমর্থন পাওয়ার জন্য তারা সর্বাত্মক চেষ্টা চালাচ্ছেন।

“গণঅভ্যুত্থানে নেতৃত্ব দেওয়া ছাত্র নেতারা এনসিপি গড়ে তোলার পর আমরাও ভেবেছিলাম, রাজনীতিতে হয়তো একটা ইতিবাচক পরিবর্তন তারা আনতে পারবে,” বিবিসি বাংলাকে বলছিলেন বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া শিক্ষার্থী নুসাইবা সাইফ ইশতু।

“কিন্তু কিছু ঘটনা দেখার পর এখন মনে হয় যে, এনসিপিও নো বেটার দ্যান আদার পলিটিক্যাল টিমস (অন্য রাজনৈতিক দলগুলোর তুলনায় ভালো কোনো দল নয়),” বলেন মিজ ইশতু।

বিবিসি নিউজ বাংলা, ঢাকা

জনপ্রিয় সংবাদ

ঢাকা-দিল্লি সম্পর্ক কিছুটা স্থবির ও বাধাগ্রস্ত ছিল: পররাষ্ট্র উপদেষ্টা

মির্জা আব্বাস, নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী, মেঘনা আলম- ‘ভাইরাল’ ঢাকা ৮ আসনে কী চলছে?

০৭:৫৮:৪৯ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ৫ ফেব্রুয়ারী ২০২৬

অনলাইন গেম ‘পাটাব্বাস’ খেলছিলেন একজন, আর তার ওপর ঝুঁকে বেশ আগ্রহ নিয়ে খেলাটি দেখছিলেন আরো দুইজন। ঢাকার শান্তিনগর মোড়ের পাশে একটি গলিতে দেখা যায় এই দৃশ্য।

“বের হওয়ার পর থেকেই গেমটা খেলতেছি। খুব মজা পাইতেছি,” বিবিসি বাংলাকে বলছিলেন মোহাম্মদ কামরুল।

গত কিছুদিন ধরে ফেসবুকসহ সামাজিক বিভিন্ন যোগাযোগ মাধ্যমে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়া নতুন ওই অনলাইন গেমটি তৈরি হয়েছে ঢাকা-৮ আসনের দুই প্রতিন্দ্বন্দী প্রার্থী মির্জা আব্বাস এবং নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারীর মধ্যকার সাম্প্রতিক রেষারেষির সম্পর্কের পটভূমিতে।

‘পাটাব্বাস’ নামটিও রাখা হয়েছে তাদের দু’জনের নামের সংমিশ্রণে।

“গেমটাতে নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী হইলো মশা। আর মির্জা আব্বাস হইলো ঢাকা-৮ এর কিং। এখন যে গেমটা খেলবে, তার কাজ হলো নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারীর কামড় থেকে মির্জা আব্বাসকে রক্ষা করা। সেটা না করতে পারলে মির্জা আব্বাস রাগ হয়ে যায়, তখন গেমও ওভার হয়ে যায়,” বলেন মি. কামরুল।

বস্তুত, প্রার্থী হিসেবে নাম ঘোষণার পর থেকেই বিভিন্ন বিষয়ে একে অপরের বিরুদ্ধে পাল্টা-পাল্টি অভিযোগ করে আসছিলেন বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) ও জাতীয় নাগরিক পার্টি’র (এনসিপি) এই দুই প্রার্থী।

সম্প্রতি ঢাকায় একটি অনুষ্ঠানে মি. পাটওয়ারীকে লক্ষ্য করে ডিম নিক্ষেপের ঘটনাও ঘটেছে। এ ঘটনার পর দু’পক্ষের বৈরিতায় নতুন মাত্রা যুক্ত হয়েছে, যা নিয়ে ভোটারদের মধ্যে উদ্বেগ লক্ষ্য করা যাচ্ছে।

এদিকে, নিরাপত্তা শঙ্কায় বর্তমানে নির্বাচনী প্রচারণা থেকে দূরে রয়েছেন বলে বিবিসি বাংলাকে জানিয়েছেন একই আসনের গণঅধিকার পরিষদের প্রার্থী মেঘনা আলম। মাথায় মুকুট পরে ভোটের প্রচারণায় অংশ নিয়ে সম্প্রতি বেশ আলোচনার জন্ম দেন তিনি।

ঢাকার রাস্তায় অনলাইন গেম 'পাটাব্বাস' খেলছেন তরুণরা
মির্জা আব্বাস এবং নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারীর মধ্যকার সাম্প্রতিক রেষারেষির সম্পর্কের পটভূমিতে তৈরি হয়েছে অনলাইন গেম ‘পাটাব্বাস’

বাকযুদ্ধ ঘিরে উত্তাপ

শুরুতে বিভিন্ন ইস্যুতে মির্জা আব্বাস ও নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারীকে পাল্টাপাল্টি বক্তব্য দিতে দেখা গেলেও সেটি ক্রমেই বাকযুদ্ধে রূপ নিতে থাকে গত ২২শে জানুয়ারি ভোটের প্রচারণা শুরু হওয়ার পর থেকে।

এর মধ্যে গত ২৭শে জানুয়ারির একটি ঘটনায় পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হয়ে ওঠে।

ওইদিন ঢাকার হাবিবুল্লাহ বাহার কলেজে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে গিয়ে দফায় দফায় ডিম হামলার শিকার হন ঢাকা-৮ আসনে জামায়াত জোট সমর্থিত এনসিপি’র প্রার্থী নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী।

ওই ঘটনার পেছনে বিএনপি প্রার্থী মির্জা আব্বাসের হাত রয়েছে বলে অভিযোগ করেছেন তিনি।

“ছাত্রদলের কিছু ছেলে, যারা মির্জা আব্বাসের লোক, তারা উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে এই ঘটনা ঘটিয়েছে। তা না হলে ক্যাম্পাসে ডিম কোত্থেকে আসবে? ক্যাম্পাস তো আর হোটেল-রেস্তোরাঁ না যে অনেক ডিম রাখা থাকবে,” বিবিসি বাংলাকে বলছিলেন মি. পাটওয়ারী।

যদিও অভিযোগ অস্বীকার করে মি. আব্বাস উল্টো দাবি করেছেন, মানুষের সহানুভূতি পাওয়ার উদ্দেশ্য এনসিপি’র প্রার্থী তার বিরুদ্ধে ‘মিথ্যা অভিযোগ’ তুলছেন।

“মানুষের সিম্প্যাথি (সহানুভূতি) পাওয়ার জন্য উনি এসব মিথ্যা অভিযোগ তুলছেন। আমার ব্যাপারে ওই একজন প্রার্থী বাদে আর কেউ কোনো বাজে কথা বলছে না, অভিযোগও করছে না। উনি এগুলো বলছেন, কারণে তার নিজের সম্পর্কে বলার মতো কিছু নাই,” বিবিসি বাংলাকে বলেন মি. আব্বাস।

ভোটের প্রচারণায় ব্যস্ত মির্জা আব্বাস
ভোটের প্রচারণায় ব্যস্ত মির্জা আব্বাস

সুষ্ঠু ভোট নিয়ে শঙ্কা

শুরুর দিকে সুষ্ঠু ভোটের ব্যাপারে আশাবাদী জানালেও নির্বাচনের দিন যতই এগিয়ে আসছে, ততই সংশয় বাড়তে দেখা যাচ্ছে প্রার্থীদের মধ্যে।

বিশেষ করে, বিএনপি ও এনসিপি’র প্রার্থীরা একে অন্যের বিরুদ্ধে কেন্দ্র দখল ও ভোট কারচুপির ষড়যন্ত্র করার অভিযোগ তুলছেন।

“আমরা জানতে পেরেছি যে, এই আসনে ভোট কেনা, কেন্দ্র দখল বা ইলেকশন রিগিং করার একটা পরিকল্পনা চলছে। বিভিন্ন জায়গা সরকারি যে অফিসগুলো রয়েছে, সেগুলোতে বিএনপি’র লোকরা সরাসরি গিয়ে ভয়ভীতি দেখাচ্ছে যেন ভোটে তারা বিজয়ী হয়,” বলছিলেন এনসিপি’র প্রার্থী মি. পাটওয়ারী।

যদিও অভিযোগ অস্বীকার করেছেন বিএনপি’র প্রার্থী মির্জা আব্বাস।

“এসব অভিযোগের কোনো ভিত্তি নেই। বরং কিছু কিছু প্রার্থীর কথা শুনে আমার মনে হচ্ছে, ওরা জিতেই আছে। এতেই আমার সন্দেহ ঘনীভূত হচ্ছে যে, নির্বাচনে একটা কারচুপি করার কিংবা ইলেকশন ইঞ্জিনিয়ারিং করার একটা চিন্তা তারা করতেছে,” বলেন মি. আব্বাস।

এনসিপি’র প্রার্থীর দিকে ইঙ্গিত করে তিনি আরও বলেন, “ওদের যদি ইলেকশন ইঞ্জিনিয়ারিং করার পরিকল্পনা না-ই থাকে, তাহলে তারা এতটা শিওর (নিশ্চিত) হয় কী করে? আমি এতবছর ধরে রাজনীতি করার পরও ভোটে জেতার ব্যাপারে শিওর হতে পারি না, ওরা এতটা শিওর হয় কী করে? এটা সম্ভব তখনই, যদি কারচুপি করার মতো একটা প্রক্রিয়া তাদের হাতে থাকে।”

এমন অভিযোগের বিষয়ে মন্তব্য জানতে চাইলে নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী দাবি করেন যে, তারা ভোটারদের কাছে যেভাবে সাড়া পেয়েছেন, সেটির প্রেক্ষিতেই জয়ের ব্যাপারে আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন।

“আমি সৎভাবে জনগণের জন্য কাজ করছি। আর যখন মানুষের জন্য কাজ করে থাকি, মানুষ তো অবশ্যই তাদের প্রতিনিধিকে নির্বাচন করবে। জনগণের তো মন মানসিকতা আগের চেয়ে পরিবর্তন হয়েছে। জনগণ যদি আমাকে চায়, উনি তো জোর করে সেটা থামাতে পারবের না,” বিবিসি বাংলাকে বলেন মি. পাটওয়ারী।

মাথায় মুকুট পরে প্রচারণায় অংশ নিচ্ছেন মেঘনা আলম, তার পাশে তিন চারজন লোক
মাথায় মুকুট পরে প্রচারণায় অংশ নিয়ে ইতোমধ্যেই সামাজিক মাধ্যমে আলোচিত হয়েছেন মেঘনা আলম

প্রচারণার মাঠে নেই মেঘনা আলম

বিএনপি ও এনসিপি’র প্রার্থীদের বাইরে ঢাকা-৮ আসনে গণঅধিকার পরিষদের প্রার্থী মেঘনা আলমকে ঘিরেও নানান আলোচনা হতে দেখা যাচ্ছে।

বাংলাদেশে একটি সুন্দরী প্রতিযোগিতায় প্রথম স্থান অর্জন করা মিজ আলম মাথায় মুকুট পরে প্রচারণায় অংশ নিয়ে ইতোমধ্যেই সামাজিক মাধ্যমে আলোচিত হয়েছেন।

“আমরা সবসময় সৌন্দর্য প্রতিযোগিতায় বলি যে, দেশ বদলে ফেলবো এবং সবাই মনে করে, এটা জাস্ট বলার জন্য বলছে। তারা মনে হয় কাজ করছে না,” বিবিসি বাংলাকে বলছিলেন মিজ আলম।

“কিন্তু এখন আমি মাথায় ক্রাউন পরে মানুষের কাছে যাচ্ছি এবং সাধারণ মানুষ যখন আমাকে দেখছে, তখন তাদের ভুল ধারণাটা ভেঙে যাচ্ছে,” যোগ করেন গণঅধিকার পরিষদের এই প্রার্থী।

তবে নিরাপত্তা শঙ্কায় গত কিছুদিন ধরে নির্বাচনী প্রচারণায় অংশ নিচ্ছেন না তিনি। যদিও তার দলের নেতাকর্মীরা প্রচারণার কাজ চালিয়ে যাচ্ছেন।

“প্রচারণায় নামার পর থেকেই আমি এবং আমার কর্মীরা নানান হুমকি-ধামকি পেয়ে আসছিলাম। কিছুদিন আগে আমাকে রেপ থ্রেটও (ধর্ষণের হুমকি) দেওয়া হয়েছে। সেজন্য নিরাপত্তা ঝুঁকি থাকায় আপাতত কিছুদিন মাঠের প্রচারণায় অংশ না নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছি,” বিবিসি বাংলাকে বলেন মিজ আলম।

নির্বাচন কমিশনে ঘোষণা অনুযায়ী, আগামী দশই ফেব্রুয়ারি সকাল সাড়ে সাতটা পর্যন্ত প্রচারণা চালাতে পারবেন প্রার্থীরা। কাজেই ভোট চাওয়ার জন্য সময়ও বেশি বাকি নেই।

“সেজন্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করে দ্রুত প্রচারণায় যোগ দিতে চাই। এরই মধ্যে অস্ত্রের লাইসেন্সের জন্য আবেদন করেছি এবং স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টাকে বিষয়টি জানানোও হয়েছে। কিন্তু তারপরও এখন পর্যন্ত আমাকে লাইসেন্স দেওয়া হয়নি,” বলেন মেঘনা আলম।

“অথচ আমার পরে আবেদন করেও অনেকে লাইসেন্স পেয়ে গেছেন। কেউ কেউ পুলিশি নিরাপত্তাও পাচ্ছেন। এক্ষেত্রে সরকার ও নির্বাচন কমিশন পক্ষপাতমূলক আচরণ করছে বলে আমি মনে করি,” যোগ করেন গণঅধিকার পরিষদের এই প্রার্থী।

হাত নেড়ে ভোট চাচ্ছেন নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী
জামায়াত জোটের প্রার্থী হিসেবে লড়াই করছেন নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী

ভোটাররা কী বলছেন?

নির্বাচন ঘিরে প্রার্থীদের মধ্যে পাল্টা-পাল্টি অভিযোগ ও রেষারেষির যেসব ঘটনা ঘটছে, সেগুলো দেখে হতাশা প্রকাশ করেছেন ঢাকা-৮ আসনের ভোটাররা।

“প্রতিদ্বন্দিতা থাকতে পারে, দুই-চার কথা হইতে পারে। কিন্তু সার্বিকভাবে এটা ভালো লক্ষণ না। এভাবে রেষারেষি চলতে থাকলে পরবর্তীতে মারামারিতে রূপ নেবে,” বলছিলেন শাহজাহানপুর এলাকার ভোটার জসিম উদ্দিন, যিনি পেশায় একজন ব্যবসায়ী।

ঢাকা-৮ আসনটি মূলত রাজধানীর রমনা, শাহবাগ, মতিঝিল, কাকরাইল, মগবাজারের অংশবিশেষ নিয়ে গঠিত।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, সচিবালয় এ এলাকায় হওয়ায় আসনটিকে দেশের প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের কেন্দ্রস্থল বলা যায়। এ আসনে রয়েছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা মেডিকেল কলেজ, কমলাপুর রেলস্টেশনের মতো গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা।

বিএনপি, এনসিপি ও গণঅধিকার ছাড়াও আসনটিতে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের কেফায়েত উল্লা, জনতার দলের মো. গোলাম সারোয়ার, বাংলাদেশ জাসদের এ এফ এম ইসমাইল চৌধুরী, বাংলাদেশ ইসলামী ফ্রন্টের এস এম সরওয়ার, বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির ত্রিদ্বীপ কুমার সাহা, জাতীয় পার্টির জুবের আলম খান, মুক্তিজোটের মো. রাসেল কবির এবং বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দলের এ এইচ এম রাফিকুজ্জামান আকন্দ ভোট করছেন।

প্রার্থীদের সবার নজর এখন আসনের প্রায় দুই লাখ ৭৫ হাজার ৪৭১ জন ভোটারের দিকে, যাদের বড় অংশই বয়সে তরুণ।

জুলাই গণঅভ্যুত্থানে নেতৃত্ব দেওয়া ছাত্র নেতাদের বড় একটি অংশ এখন এনসিপি’র সঙ্গে রয়েছেন। এবারের নির্বাচনে তরুণ ভোটারদের সমর্থন পাওয়ার জন্য তারা সর্বাত্মক চেষ্টা চালাচ্ছেন।

“গণঅভ্যুত্থানে নেতৃত্ব দেওয়া ছাত্র নেতারা এনসিপি গড়ে তোলার পর আমরাও ভেবেছিলাম, রাজনীতিতে হয়তো একটা ইতিবাচক পরিবর্তন তারা আনতে পারবে,” বিবিসি বাংলাকে বলছিলেন বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া শিক্ষার্থী নুসাইবা সাইফ ইশতু।

“কিন্তু কিছু ঘটনা দেখার পর এখন মনে হয় যে, এনসিপিও নো বেটার দ্যান আদার পলিটিক্যাল টিমস (অন্য রাজনৈতিক দলগুলোর তুলনায় ভালো কোনো দল নয়),” বলেন মিজ ইশতু।

বিবিসি নিউজ বাংলা, ঢাকা