একটি শহরকে আমরা কেন ভালোবাসি—তার স্থাপত্য, ইতিহাস, মানুষ, নাকি নিজের স্মৃতির জন্য? এই প্রশ্নগুলোর গভীর অনুসন্ধানে উঠে এসেছে অনন্যা বাজপেয়ীর নতুন বইয়ে, যেখানে পঁচিশ বছরের অভিজ্ঞতায় গড়ে উঠেছে বিশ্বের তেরোটি শহরকে ঘিরে ব্যক্তিগত ও বৌদ্ধিক স্মৃতির বয়ান। ভ্রমণ কাহিনী, আত্মস্মৃতি ও চিন্তার ইতিহাস মিলিয়ে বইটি তৈরি করেছে শহরকে দেখার এক ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি।
শহর মানে শুধু ভৌগোলিক স্থান নয়
লেখকের কাছে শহর কেবল চলমান জীবনের দৃশ্য নয়, বরং স্মৃতি, জ্ঞান, ক্ষমতা ও ইতিহাসের জীবন্ত ভাণ্ডার। দীর্ঘদিন বিভিন্ন শহরে বসবাসের অভিজ্ঞতা থেকে তিনি দেখিয়েছেন কীভাবে অতীত ও বর্তমান একে অপরের সঙ্গে মিশে নতুন অর্থ তৈরি করে। দিল্লি, ইস্তাম্বুল ও নিউইয়র্ক তাঁর কাছে পরিচিত আশ্রয়, আবার ভেনিস, চেন্নাই, বেঙ্গালুরু, বারাণসী, শান্তিনিকেতন ও পুনের মতো শহরও গড়ে তুলেছে তাঁর সম্পর্ক, ভালোবাসা ও ক্ষতির অভিজ্ঞতা।
নিউ ইয়র্কের স্বপ্ন ও ভাঙন
শিক্ষাজীবনের সময় নিউইয়র্কে লেখক হওয়ার স্বপ্ন দেখেছিলেন তিনি। কিন্তু নাইন ইলেভেনের সন্ত্রাসী হামলার পর বদলে যায় শহরের মানসিকতা। সেই ধাক্কায় তিনি অনুভব করেন হারিয়ে যাওয়া সময় আর অনিশ্চিত ভবিষ্যতের ভার, যা ব্যক্তিগত স্মৃতিকে নতুনভাবে প্রশ্নের মুখে দাঁড় করায়।
দিল্লির সৌন্দর্য ও বিষণ্নতা
আমির খুসরোর কবিতার শহর দিল্লিতে তিনি খুঁজে পান একসঙ্গে সৌন্দর্য ও হতাশার উপস্থিতি। ধোঁয়াশা, দূষণ ও রাজনৈতিক বাস্তবতার মধ্যেও এই শহর তাঁর পারিবারিক স্মৃতি ও শোকের সঙ্গে জড়িয়ে আছে। বাবা–মায়ের মৃত্যুর পরও দিল্লি তাঁকে শিখিয়েছে নতুনভাবে বেঁচে থাকার পথ।

ইস্তাম্বুলে পরিচিতির ভেতর অপরিচিতি
ওরহান পামুকের লেখার পথ ধরে ইস্তাম্বুলকে আবিষ্কার করেন তিনি। বসফরাসের ধারে হাঁটা, ক্যাফের নীরবতা, পথের বিক্রেতার সুর—সব মিলিয়ে শহরটি তাঁর কাছে একসঙ্গে ঘর ও বিদেশ, পরিচিত ও অচেনা।
শান্তিনিকেতন ও বারাণসীর গভীর ব্যক্তিগত স্মৃতি
শান্তিনিকেতনে বাবার সঙ্গে শেষ কথোপকথনের স্মৃতি, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সৃজনশীলতার দীর্ঘ ছায়া এবং সেই শহরের বিস্ময় তাঁকে নাড়া দেয় গভীরভাবে। আর বারাণসীতে মায়ের দেহাবশেষ বিসর্জনের মুহূর্তে তিনি ফিরে দেখেন বাবা–মায়ের ভালোবাসার গল্প। এসব স্মৃতিই বইটির আবেগঘন শক্তি।
বইটির শক্তি ও সীমাবদ্ধতা
চিন্তা ও পর্যবেক্ষণে সমৃদ্ধ হলেও বইটি কখনও কখনও নাম ও প্রসঙ্গের ভিড়ে জটিল মনে হতে পারে। ব্যক্তিগত ও রাজনৈতিক অভিজ্ঞতার সংযোগের মধ্যে একটি কাল্পনিক অধ্যায় কিংবা গাজা প্রসঙ্গের সংযোজন কিছুটা বিচ্ছিন্ন অনুভূতি তৈরি করে। তবু গভীর সহানুভূতি, সৌন্দর্যময় ভাষা ও বহুমাত্রিক চিন্তার জন্য বইটি পাঠকের মনে দীর্ঘস্থায়ী ছাপ ফেলে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















