তেহরানে সাবেক মার্কিন দূতাবাসের দেয়ালে আঁকা একটি মার্কিন ড্রোনের মুরালের পাশ দিয়ে হেঁটে যাচ্ছেন এক নারী। ইরান নিয়ে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের পরস্পরবিরোধী বার্তা ও অবস্থান নিয়ে প্রশ্ন উঠছে—ওয়াশিংটনের কি আদৌ কোনো সুস্পষ্ট কৌশল আছে, কিংবা সামরিক পদক্ষেপের পরিণতি সামাল দেওয়ার মতো পর্যাপ্ত বোঝাপড়া আছে কি না।
যদি ট্রাম্পের মনে কোনো নির্দিষ্ট ফলাফল থেকে থাকে, তবে তাঁকে ভাবতেই হবে কীভাবে একটি বোমা হামলা অভিযানের মাধ্যমে শাসনব্যবস্থা ও তার নিরাপত্তা বাহিনীর মধ্যে বিভাজন তৈরি করা যায়।
ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরান সম্পর্কে কতটা জানেন—যে দেশটিতে তিনি এক বছরের মধ্যে দ্বিতীয়বার হামলার হুমকি দিচ্ছেন?
এই প্রশ্ন তোলা তাঁর ব্যক্তিগত সমালোচনা করার জন্য নয়; বরং মধ্যপ্রাচ্যের জটিল সমাজগুলো সম্পর্কে মৌলিক বোঝাপড়ার ঘাটতি যে দীর্ঘদিন ধরে মার্কিন নীতিনির্ধারকদের বিপাকে ফেলেছে, ১৯৭৯ সালে শাহ পতনের সময় থেকেই তা স্পষ্ট।
হোয়াইট হাউস আসলে কী জানে—এই প্রশ্নও স্বাভাবিক। কারণ ট্রাম্পের বিভিন্ন মন্তব্য ছিল ছড়ানো-ছিটানো: উপসাগরে বিমানবাহী রণতরী পাঠানোর কারণ, আবার সেই শক্তি ব্যবহার না করার দাবি—সব মিলিয়ে বিভ্রান্তিকর। তাঁর শর্তগুলোর মধ্যে ছিল বিক্ষোভকারীদের হত্যা বন্ধ করা, পারমাণবিক কর্মসূচি সমর্পণ, ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি সীমিত করা এবং অঞ্চলজুড়ে তেহরানের মিত্র নেটওয়ার্কের সমর্থন বন্ধ করা।
ইরানি শাসনব্যবস্থাও স্পষ্টত বিভ্রান্ত, যেমন আমরা অনেকেই। সর্বোচ্চ নেতা আয়াতোল্লাহ আলী খামেনি ও তাঁর কর্মকর্তাদের প্রতিক্রিয়া কখনো আলোচনার আহ্বান, কখনো ক্ষেপণাস্ত্র ও মিত্র ইস্যুতে অস্বীকৃতি, আবার কখনো সরাসরি যুদ্ধের হুমকি। দুই পক্ষের আলোচকরা শুক্রবার ইস্তাম্বুলে বৈঠকে বসার কথা।
এই বিভ্রান্তি তখনই যুক্তরাষ্ট্রের সাফল্যের ইঙ্গিত হতে পারে, যদি ট্রাম্প কৌশলগতভাবে অপ্রত্যাশিত আচরণ করে প্রতিপক্ষকে ভুল পথে চালিত করতে চান—এবং একই সঙ্গে কাঙ্ক্ষিত চূড়ান্ত লক্ষ্য, যেমন তেহরানে শাসন পরিবর্তন, অর্জনের সুপরিকল্পিত রূপরেখা তাঁর থাকে। মনোযোগ ভিন্নদিকে সরানো তাঁর দক্ষতা। তিনি হিসাব করে ভাবতে পারেন—তাঁর রাজনৈতিক সমর্থকরা বিদেশি যুদ্ধ অপছন্দ করলেও, উপসাগরীয় ও তুর্কি মিত্ররা প্রতিক্রিয়ার ভয় পেলেও—সংক্ষিপ্ত ও জয়ময় যুদ্ধ হলে কেউ অভিযোগ করবে না।
সমস্যা হলো, এমন বিজয় বিরল। আর যদি অর্জিতও হয়, পরবর্তী অস্থিরতা সামাল দিতে বিপুল জ্ঞান দরকার। এটি শুধু গোয়েন্দা তথ্যের বিষয় নয়। ইসরায়েল ইরানের নিরাপত্তা কাঠামোর গভীরে অনুপ্রবেশ করেছে—এই সীমা প্রায় নিশ্চিতভাবেই অতিক্রম হয়েছে। কিন্তু ইসরায়েলের স্বার্থ সবসময় যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থ নয়, আর কোনো শাসনব্যবস্থা পতন ঘটানো, যতই ভয়াবহ হোক, অত্যন্ত বিশৃঙ্খল প্রক্রিয়া।
ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু উপসাগরে মার্কিন সামরিক উপস্থিতি নিয়ে অস্বাভাবিক নীরব। গত মাসের বিক্ষোভের চূড়ায় ট্রাম্প যখন প্রতীকী হামলার হুমকি দেন, তখন তিনি নীরবে এর বিরোধিতা করেছিলেন বলেই মনে হয়। সম্ভবত ইসরায়েল চেয়েছিল বড় ধরনের আঘাত ছাড়া শহরগুলোতে কঠোর প্রতিশোধমূলক হামলার ঝুঁকি নিতে না। নেতানিয়াহু অপেক্ষায় ছিলেন এমন আঘাতের, যা ইসলামী প্রজাতন্ত্রকে ধ্বংস করে দীর্ঘমেয়াদি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারে—যার বিনিময়ে তেল আবিবে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা, আঞ্চলিক যুদ্ধ কিংবা ইরানে বিশৃঙ্খলার ঝুঁকিও তিনি নিতে প্রস্তুত।
ইসরায়েলের কাছে তেহরানের হুমকি অস্তিত্বের প্রশ্ন হলেও যুক্তরাষ্ট্র সেই অবস্থানে নেই। তুরস্ক শরণার্থীর ঢল নিয়ে উদ্বিগ্ন, উপসাগরীয় দেশগুলো তেল অবকাঠামোতে হামলার আশঙ্কায় চিন্তিত। এ দেশগুলোর প্রয়োজন পুরো অঞ্চলের স্থিতিশীল পরিণতি। আর তা অর্জনে দরকার ইসলামি বিপ্লবী গার্ড, ইরানের রাজনৈতিক নেতৃত্ব ও জনগণ অতিরিক্ত বিমান হামলায় কীভাবে প্রতিক্রিয়া জানাবে—সে বিষয়ে গভীর বোঝাপড়া। ইতিহাস বলছে, এই ক্ষেত্রগুলোতে যুক্তরাষ্ট্রের জ্ঞানের ঘাটতি ছিল।
১৯৭৭ সালের নববর্ষের প্রাক্কালে জিমি কার্টার ইরানের শাহকে আতিথ্য দিয়েছিলেন—বিক্ষোভ শুরু হওয়ার কয়েক দিন আগে, যা শেষ পর্যন্ত তাঁকে উৎখাত করে। তখনকার মার্কিন প্রেসিডেন্ট তাঁকে অস্থির অঞ্চলে “স্থিতিশীলতার দ্বীপ” হিসেবে প্রশংসা করেন। কারণ তাঁকে জানানো হচ্ছিল শাহ নিরাপদ, আয়াতোল্লাহ রুহোল্লাহ খোমেনি বা ধর্মের ভূমিকা ততটা গুরুত্বপূর্ণ নয়। এমনকি বিশাল মার্কিন উপস্থিতি থাকা সত্ত্বেও কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থা জানত না শাহ ক্যান্সারে আক্রান্ত।
ধরা যাক, সেই শিক্ষা নেওয়া হয়েছে। জিম্মি সংকটের পর থেকে যুক্তরাষ্ট্রের ইরানে দূতাবাস নেই, ফলে তথ্য ও বিশ্লেষণে অন্যদের ওপর নির্ভরতার বিষয়টি তারা জানে। তাই ভার্চুয়াল দূতাবাস বা ইরান পর্যবেক্ষক নিয়োগের মতো নানা উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। কিন্তু আফগানিস্তান ও ইরাকে যুক্তরাষ্ট্রের অভিজ্ঞতা দেখায়—নিজেদের অজানা সীমাবদ্ধতা স্বীকার করার বিনয় এখনও পুরোপুরি তৈরি হয়নি।
যদি ট্রাম্প প্রশাসনের কোনো স্পষ্ট লক্ষ্য থাকে, তবে তাকে ভাবতে হবে দীর্ঘস্থায়ী বোমা হামলা কীভাবে শাসনব্যবস্থা ও নিরাপত্তা বাহিনীর মধ্যে বিচ্ছেদ ঘটিয়ে খামেনিকে ক্ষমতাচ্যুত করতে পারে। এরপর নিশ্চিত করতে হবে—পরবর্তী পরিস্থিতি যেন দেশটিকে আরও বড় হুমকিতে না ঠেলে দেয়। কারণ বিপ্লবী গার্ডের আরও দক্ষ কোনো নেতা ক্ষমতায় এলে উল্টো ফলও হতে পারে। একই সঙ্গে চীন ও রাশিয়ার নীরব সম্মতি দরকার, যাতে তারা যুক্তরাষ্ট্রকে বড় মূল্য দিতে বাধ্য না করে। আর ৯ কোটির বেশি মানুষের বহু জাতিগত বিভাজনপূর্ণ দেশে সিরিয়া বা লিবিয়ার মতো বিশৃঙ্খলা যেন না নেমে আসে।
দুর্ভাগ্যজনকভাবে ট্রাম্পের অস্থির মন্তব্যের একটি সম্ভাব্য ব্যাখ্যা হলো—তাঁর কাছে নির্দিষ্ট শেষ লক্ষ্য বা সুপরিকল্পিত পথনকশা নেই। গত বছরের যৌথ বিমান হামলা এবং ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে কারাকাস থেকে যুক্তরাষ্ট্রে নিয়ে আসার সফল অভিযানের পর তাঁর হাতে যে অভূতপূর্ব প্রভাবশালী অবস্থান তৈরি হয়েছে, তা স্থায়ী নয়। হয়তো তিনি সেটি থাকতেই যতটা সম্ভব অর্জন করতে চান।
সম্প্রতি এক টেলিভিশন সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প বলেন, ইরান নিয়ে তাঁর পরিকল্পনা প্রকাশ করা যাবে না, তবে “তারা আমাদের সঙ্গে কথা বলছে, দেখা যাক আমরা কিছু করতে পারি কি না।”
আরও সরলভাবে বললে, যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক শক্তি যেন তাঁর হাতে বজ্রদেবতার হাতুড়ির মতো—আর তিনি খুঁজছেন কোথায় আঘাত করা যায়। প্রশ্ন হলো, খামেনির দূতেরা যদি মুখরক্ষা সাপেক্ষে কোনো পারমাণবিক সমঝোতায় রাজি হন, তা ট্রাম্পকে সন্তুষ্ট করবে কি না; নাকি এত বিপুল শক্তি মোতায়েনের পর তিনি লক্ষ্য এত উঁচুতে তুলবেন যে শেষ পর্যন্ত গুলি চালাতেই হবে—পরিণতি নিয়ে না ভেবেই।
মার্ক চ্যাম্পিয়ন 


















