চীনে নারীদের ফ্লার্ট শেখানোর কোর্স চালু করে দীর্ঘদিন ধরে নীরবে ব্যবসা করছিলেন ঝৌ ইউয়ান নামের এক নারী। নিজেকে তিনি বলতেন ‘যৌন বুদ্ধিমত্তার গডমাদার’। ২০১৮ সাল থেকে চালানো এই কার্যক্রম থেকে তিনি আয় করেন ২ কোটি ৪০ লাখ ইউয়ানেরও বেশি। কিন্তু জানুয়ারিতে শরীরকে এক্স আকৃতিতে বাঁকিয়ে ফ্লার্ট শেখানোর একটি ভিডিও ভাইরাল হয়ে গেলে হঠাৎই তিনি সবার নজরে আসেন এবং শুরু হয় তীব্র বিতর্ক।
ভাইরাল ভিডিও থেকে জনরোষ
ভিডিওটিতে দেখা যায়, এক নারী শরীরের ভঙ্গি বদলে আকর্ষণীয় কণ্ঠে প্রশ্ন করছেন—“কি চাও?” এই দৃশ্য দ্রুত সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। চীনের বিভিন্ন প্ল্যাটফর্মে এটি নিয়ে ব্যঙ্গ-বিদ্রূপ হয়, এমনকি সিঙ্গাপুরের কৌতুক অভিনেতারাও বিষয়টি নিয়ে রসিকতা করেন। ভাইরাল হওয়ার পর ঝৌ ইউয়ানের বহু মিলিয়ন ইউয়ানের ব্যবসা আলোচনায় আসে এবং জনরোষের মুখে তা দ্রুত ভেঙে পড়ে।

পটভূমি ও ব্যবসার বিস্তার
হুনান প্রদেশের চাংশা শহরের সাবেক ব্যাংকার ঝৌ ইউয়ান, বয়স প্রায় পঞ্চাশের কাছাকাছি হলেও সাজসজ্জার কারণে নিজেকে অনেক তরুণ দেখাতে সক্ষম হন। কখনও ক্লিওপেট্রার পোশাকেও তাকে দেখা গেছে ভিডিওতে।
তার প্রতিষ্ঠিত ‘ব্ল্যাক-অ্যান্ড-হোয়াইট ডিসরাপটিভ সেক্সুয়াল ইন্টেলিজেন্স একাডেমি’ নারীদের জন্য অনলাইন-অফলাইন নানা সেবা দিত। খুব কম দামের অনলাইন কোর্স দিয়ে শুরু করে ধাপে ধাপে ব্যয়বহুল প্রলুব্ধকরণ প্রশিক্ষণ ও যৌন ট্রমা-সংক্রান্ত থেরাপি পর্যন্ত ছিল এর পরিধি। ২২ জানুয়ারি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তার অ্যাকাউন্টগুলো বন্ধ করে দেওয়া হয়। ৩০ জানুয়ারি কর্তৃপক্ষ তার ব্যবসা স্থগিত করে তদন্ত শুরু করার ঘোষণা দেয়।
সমর্থন ও সমালোচনার দ্বন্দ্ব
সমালোচকদের অভিযোগ, এই কোর্স নারীদেরকে পুরুষকে সন্তুষ্ট করার বস্তু হিসেবে উপস্থাপন করে এবং আত্মনির্ভর হওয়ার বদলে সম্পর্কনির্ভর মানসিকতা তৈরি করে। তাদের মতে, নারীদের উচিত নিজের সক্ষমতা বাড়ানো ও স্বাধীনভাবে সম্মান অর্জন করা।
অন্যদিকে সমর্থকদের দাবি, এসব প্রশিক্ষণ অনেক নারীর আত্মবিশ্বাস বাড়িয়েছে এবং ভেঙে পড়া সম্পর্ক মেরামতেও সহায়তা করেছে। মূল প্রশ্নটি তাই রয়ে গেছে—এ ধরনের কোর্স কি নারীদের ক্ষমতায়ন করে, নাকি তাদের ক্ষমতা কমিয়ে দেয়?

অর্থনৈতিক বাস্তবতা ও সামাজিক চাপ
চীনে অর্থনৈতিক সম্পদের বড় অংশ এখনো পুরুষদের হাতে কেন্দ্রীভূত। ফলে কিছু নারীর কাছে ভালোভাবে বিয়ে করাই উন্নত জীবনের সম্ভাব্য পথ হিসেবে দেখা দেয়। ধীরগতির অর্থনীতি, অনিশ্চিত চাকরি ও দুর্বল সামাজিক সুরক্ষা ব্যবস্থার মধ্যে উচ্চ আয়ের সঙ্গী খোঁজা অনেকের কাছে শর্টকাট মনে হতে পারে। এই বাস্তবতা উপেক্ষা করে নারীদের সহজে বিচার করা কঠিন।
নিজের শরীর নিয়ে আত্মবিশ্বাসী হওয়া বা আকর্ষণীয় বোধ করতে চাওয়ায় স্বভাবতই দোষ নেই। ব্যক্তিগত আনন্দের জন্য মানুষ যেভাবে বিলাসী পণ্য বা অবকাশযাপনে অর্থ ব্যয় করে, তেমনি এসব কোর্সেও ব্যয় অস্বাভাবিক নয়। তবে প্রশ্ন থাকে—এতে সত্যিকারের ক্ষমতায়ন ঘটছে কি না।
প্রতারণার অভিযোগ ও ঝুঁকিপূর্ণ সেবা
সাবেক কর্মীদের দাবি, এই একাডেমি বয়স, শরীর ও ভেঙে যাওয়া সম্পর্ক নিয়ে উদ্বেগ বাড়িয়ে গ্রাহকদের আরও ব্যয়বহুল সেবার দিকে ঠেলে দিত। চিকিৎসা-সংক্রান্ত প্রক্রিয়া ও পরামর্শ সেবাতেও ছিল সন্দেহজনক যোগ্যতার থেরাপিস্ট।

বিপণনের অন্তর্নিহিত বার্তাও সমালোচিত—পুরুষ সরে গেলে দায় নারীর আকর্ষণ কমে যাওয়ার ওপর চাপানো হয়, যদিও সম্পর্ক ভাঙার কারণ সাধারণত অনেক জটিল।
ভাইরাল খ্যাতির দ্বিমুখী বাস্তবতা
জ্ঞানভিত্তিক অর্থপ্রদানের এই শিল্পে সাধারণত কম দামের প্রাথমিক পণ্য, ধাপে ধাপে বেশি দামের সেবা এবং দ্রুত পরিবর্তনের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়। বাইরে থেকে এটি ক্ষমতায়নের মতো দেখালেও ভেতরে তা অনিরাপত্তাকে পুঁজি করে পুনরাবৃত্ত ক্রয়ের এক কাঠামো তৈরি করতে পারে, যা অযোগ্য সেবাদাতার কারণে ক্ষতিকরও হতে পারে।
ভাইরাল জনপ্রিয়তা ব্যবসার জন্য যেমন প্রয়োজন, অতিরিক্ত আলোচনাই আবার পতনের কারণ হতে পারে। ঝৌ ইউয়ান নিজেকে যৌন মুক্তির পথিকৃৎ বা নৈতিকতার ধ্বংসকারী কেউ নন; বরং সমালোচকদের মতে তিনি এমন এক ব্যবসায়ী, যিনি নারীদের দুর্বলতাকে পুঁজি করেছেন। পুরুষের দৃষ্টিকে ব্যবহার করতে গিয়ে শেষ পর্যন্ত সমাজের দৃষ্টির ফাঁদেই তিনি আটকা পড়েছেন।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















