ইউএনবি
কুষ্টিয়ার জাগলবা গ্রামের এক সড়কের ধারে বৃষ্টি ও শীত থেকে সামান্য সুরক্ষা দেওয়া টিন ও পলিথিনের নড়বড়ে আশ্রয়ে বসবাস করেন এক বৃদ্ধ দম্পতি। সময়ের ব্যবধানে তারা নির্বাচন দেখতে পেলেও অংশ নেওয়া তাদের হয়ে ওঠে না।
বাবু শেখ ও তার স্ত্রী কাজল রেখার কাছে আসন্ন জাতীয় নির্বাচনও আগের অনেক নির্বাচনের মতোই কেটে যাবে, তাদের অংশগ্রহণ ছাড়াই।
তাদের এই বঞ্চনার কারণ আগ্রহের অভাব নয়। বরং ভোটার নিবন্ধন সম্পন্ন করতে বাড়ি কর হিসেবে ৬৫০ টাকা পরিশোধ করতে হবে—এমনটাই জানানো হয়েছে তাদের।
এই অর্থ জোগাড় করতে না পারায় তারা বলছেন, বাংলাদেশের ১৩তম জাতীয় নির্বাচনে আবারও ভোটাধিকার থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন তারা।
দশ বছরের বেশি সময় ধরে বসবাস করা অস্থায়ী কুঁড়েঘরের ভেতরে বসে কাজল রেখা বলেন, আমরা দিন এনে দিন খাই। এই টাকা জোগাড় করা আমাদের পক্ষে সম্ভব হয়নি।

রাজনীতির কারণে উচ্ছেদ হওয়া জীবন
১৫ থেকে ১৬ বছর আগে রাজনৈতিক নির্যাতনের অভিযোগ তুলে ঝিনাইদহ থেকে তাদের ফিরিয়ে আনা হয়।
তাদের বাড়ি ছিল শৈলকুপা উপজেলার ছোট মৌকুড়ি গ্রামে। সেখানে তাদের বসতভিটা ও গবাদিপশু ছিল।
একটি জাতীয় নির্বাচনে তারা ধানের শীষ প্রতীকে ভোট দেওয়ার পর তাদের জীবনে পরিবর্তন আসে। সে সময় আওয়ামী লীগের বিজয়ের পর তারা হয়রানি ও নির্যাতনের শিকার হন বলে অভিযোগ করেন, যার ফলে গ্রাম ছেড়ে পালাতে বাধ্য হন।
নিরাপত্তার খোঁজে তারা কুষ্টিয়ার খোকসা উপজেলার বেতবাড়িয়া ইউনিয়নের জাগলবা গ্রামে এসে বসবাস শুরু করেন এবং তখন থেকেই সেখানেই আছেন।
নথিপত্র ও নিরাপত্তাহীন জীবন
বর্তমানে বাবু শেখ ও কাজল রেখা তাদের সন্তানদের নিয়ে কাজল রেখার মামার দেওয়া অস্থায়ী জমিতে রাস্তার পাশে বসবাস করছেন।
এ এলাকায় তাদের নিজস্ব কোনো জমি নেই।
তাদের আশ্রয়ে নেই সঠিক বেড়া, দরজা বা জানালা। ছেঁড়া পাটের বস্তা, পলিথিন ও নদীভাঙন রোধে ব্যবহৃত বিশেষ কাপড় দিয়ে কোনোভাবে ঘরটি ঢেকে রাখা হয়েছে।

বেতবাড়িয়া ইউনিয়নের ২ নম্বর ওয়ার্ড সদস্য আবদুল মতিন বলেন, এটি অত্যন্ত অমানবিক অবস্থা। তারা ১৫ থেকে ১৬ বছর ধরে এভাবেই বসবাস করছেন।
মতিনের ভাষ্য অনুযায়ী, মৌলিক নথিপত্রের অভাবই ভোটার নিবন্ধনের বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
তিনি বলেন, ভোটার হতে বা ভোটার স্থানান্তর করতে বিদ্যুৎ বিল, করের রসিদ, জমির কাগজপত্র, এমনকি মোবাইল নম্বরও লাগে। তাদের কাছে এসবের কিছুই নেই।
যে প্রতিশ্রুতি কখনো পূরণ হয় না
মানসিক প্রতিবন্ধী কাজল রেখা জানান, প্রতি নির্বাচনের আগে মানুষ তাদের বাড়িতে এসে তাকে ও তার স্বামীকে ভোটার বানানোর আশ্বাস দেয়।
কিন্তু কিছুই হয় না, বলেন তিনি।
দ্বাদশ জাতীয় নির্বাচনের আগে তারা স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতা হেলাল উদ্দিনের কাছে গিয়েছিলেন, যেন তিনি নিবন্ধনে সহায়তা করেন।
পরে তাদের জানানো হয়, ইউনিয়ন পরিষদে বাড়ি কর হিসেবে ৬৫০ টাকা জমা দিতে হবে।

এই টাকা জোগাড় করতে না পারায় ভোটার হওয়ার স্বপ্ন অপূর্ণই রয়ে গেছে, বলেন কাজল রেখা।
হেলাল উদ্দিন স্বীকার করেন, কাজল রেখাকে তিনি চেনেন এবং রাজনৈতিক নির্যাতনের পর তিনি এলাকায় এসেছেন বলেও জানেন।
তিনি বলেন, আমি তার ভোটার স্থানান্তরের চেষ্টা করেছিলাম, কিন্তু তা সম্পন্ন করা যায়নি।
ভয় এখনো পিছু ছাড়েনি
অর্থনৈতিক সংকটের পাশাপাশি ভয়ও তাদের সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করছে।
ভোট দেওয়ার পর একবার বাড়ি ছাড়তে বাধ্য হওয়ার অভিজ্ঞতার কারণে কাজল রেখা আশঙ্কা করেন, আবার নির্বাচনে অংশ নিলে পরিবারটি নতুন ঝুঁকিতে পড়তে পারে।
তিনি বলেন, আমরা ভয় পাই। ভোট দিলে যদি আবার এই জায়গাও ছেড়ে যেতে হয়?
বাংলাদেশ আরেকটি জাতীয় নির্বাচনের প্রস্তুতি নিচ্ছে, আর বাবু শেখ ও কাজল রেখা রয়ে গেছেন প্রান্তিক অবস্থায়—নামমাত্র নাগরিক, কিন্তু গণতন্ত্রের সবচেয়ে মৌলিক অধিকার প্রয়োগে অক্ষম।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















