বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে স্বাক্ষরিত নতুন বাণিজ্য চুক্তির ফলে মার্কিন বাজারে বাংলাদেশের পণ্যের ওপর শুল্ক কমে ১৯ শতাংশে নেমে এসেছে। একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রে উৎপাদিত তুলা ও কৃত্রিম তন্তু ব্যবহার করে তৈরি কিছু টেক্সটাইল ও পোশাক পণ্যে পারস্পরিক শূন্য শুল্ক সুবিধা দেওয়ার জন্য একটি বিশেষ ব্যবস্থা গঠনে ওয়াশিংটন সম্মত হয়েছে।
অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূস জানিয়েছেন, দীর্ঘ আলোচনার পর যুক্তরাষ্ট্র এমন একটি প্রক্রিয়া তৈরিতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ হয়েছে, যার মাধ্যমে মার্কিন উপকরণ ব্যবহার করে তৈরি নির্দিষ্ট বাংলাদেশি পোশাকপণ্য যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে শূন্য শুল্কে প্রবেশ করতে পারবে।

মার্কিন পণ্যে বাড়তি বাজারসুবিধা
হোয়াইট হাউস জানিয়েছে, বাংলাদেশ যুক্তরাষ্ট্রের শিল্প ও কৃষিপণ্যের জন্য উল্লেখযোগ্য অগ্রাধিকারমূলক বাজারসুবিধা দিতে রাজি হয়েছে। এর মধ্যে রাসায়নিক, চিকিৎসা সরঞ্জাম, যন্ত্রপাতি, মোটরযান ও যন্ত্রাংশ, সয়াবিনজাত পণ্য, দুগ্ধজাত খাদ্য, গরু ও মুরগির মাংস, বাদাম এবং ফল অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।
এ ছাড়া বাংলাদেশ অশুল্ক বাধা কমাতে যুক্তরাষ্ট্রের যানবাহন নিরাপত্তা ও নির্গমন মান গ্রহণ, মার্কিন খাদ্য ও ওষুধ প্রশাসনের সনদ স্বীকৃতি এবং পুনর্নির্মিত পণ্যের আমদানি নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়ার পদক্ষেপ নেবে।
যুক্তরাষ্ট্র থেকে বড় অঙ্কের ক্রয় পরিকল্পনা
চুক্তির অংশ হিসেবে সাম্প্রতিক ও সম্ভাব্য বিভিন্ন বাণিজ্যিক সমঝোতার কথাও উল্লেখ করা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে বিমান কেনা, প্রায় ৩ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলারের মার্কিন কৃষিপণ্য আমদানি এবং আগামী ১৫ বছরে প্রায় ১৫ বিলিয়ন ডলারের জ্বালানি পণ্য ক্রয়।

৩২ পৃষ্ঠার চুক্তিপত্র অনুযায়ী, বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনস অন্তত ১৪টি বোয়িং উড়োজাহাজ কেনার পরিকল্পনা করেছে এবং অতিরিক্ত কেনার সুযোগও রাখা হয়েছে। আলোচনা চলাকালে গত জুলাইয়ে এ পরিকল্পনার ঘোষণা দেওয়া হয়েছিল।
এ ছাড়া বাংলাদেশ নির্দিষ্ট কিছু দেশ থেকে কেনাকাটা সীমিত রেখে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক সরঞ্জামও অনির্দিষ্ট পরিমাণে ক্রয় করবে। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত শ্রম অধিকার বজায় রাখা এবং পরিবেশ সুরক্ষা জোরদারের অঙ্গীকার করেছে দেশটি।
দীর্ঘ আলোচনার পর চুক্তি
গত বছরের এপ্রিলে শুরু হওয়া প্রায় নয় মাসের আলোচনার ফলেই এই চুক্তি সম্পন্ন হয়েছে বলে জানিয়েছেন মুহাম্মদ ইউনূস। এর আগে আগস্টে যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের পণ্যের ওপর প্রস্তাবিত ৩৭ শতাংশ শুল্ক কমিয়ে ২০ শতাংশে নামাতে সম্মত হয়েছিল, যা তৈরি পোশাক রপ্তানিকারকদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ স্বস্তি এনে দেয়।

ভারতের সঙ্গে আলোচনা চলমান
বাংলাদেশের নির্ধারিত শুল্কহার ভারতের জন্য নির্ধারিত ১৮ শতাংশের তুলনায় সামান্য বেশি। তবে ভারতের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের চুক্তিটি এখনো চূড়ান্ত হয়নি এবং অতিরিক্ত আলোচনার প্রয়োজন রয়েছে।
মার্কিন বাণিজ্য প্রতিনিধি জেমিসন গ্রিয়ার বলেছেন, দক্ষিণ এশিয়ায় যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে পারস্পরিক বাণিজ্য চুক্তি সম্পন্ন করা প্রথম দেশ বাংলাদেশ। এই চুক্তি বাজার উন্মুক্ত করা, বাণিজ্য বাধা দূর করা এবং মার্কিন রপ্তানিকারকদের জন্য নতুন সুযোগ তৈরির ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি নির্দেশ করে।
বাংলাদেশের অর্থনীতিতে তৈরি পোশাক খাতের অবদান
বাংলাদেশের মোট রপ্তানি আয়ের ৮০ শতাংশের বেশি আসে তৈরি পোশাক খাত থেকে। প্রায় ৪০ লাখ শ্রমিক এই শিল্পে কর্মরত এবং দেশের মোট দেশজ উৎপাদনে এর অবদান প্রায় ১০ শতাংশ।

রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট
২০২৪ সালের আগস্টে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ভারতে চলে যাওয়ার পর থেকে অন্তর্বর্তী সরকারের অধীনে পরিচালিত হচ্ছে বাংলাদেশ। নতুন নেতৃত্ব নির্বাচনের জন্য বৃহস্পতিবার জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে।
শুল্ক কমানোর সময়সূচি
চুক্তি কার্যকর হলে মুরগি, শূকর, সামুদ্রিক খাদ্য, চাল, ভুট্টা ও শস্যসহ বহু কৃষিপণ্যের ওপর উচ্চ শুল্ক ধাপে ধাপে শূন্যে নামানো হবে। কিছু ক্ষেত্রে শুরুতেই শুল্ক অর্ধেকে নামবে এবং পাঁচ থেকে দশ বছরের মধ্যে সম্পূর্ণ প্রত্যাহার করা হবে। উদাহরণ হিসেবে, বাদামের ওপর বর্তমান ৫৩ দশমিক ৬ শতাংশ শুল্ক শূন্যে নামতে সময় লাগবে এক দশক, আর চার-স্ট্রোক অটোরিকশার ইঞ্জিনের একই হারের শুল্ক পাঁচ বছরে পুরোপুরি উঠে যাবে।
অন্যদিকে অধিকাংশ মার্কিন শুল্ক ১৯ শতাংশে নির্ধারিত থাকলেও বাংলাদেশে তৈরি ওষুধশিল্পের উপাদান এবং উড়োজাহাজের যন্ত্রাংশ শুল্কমুক্ত প্রবেশাধিকার পাবে, যা যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে শুল্ক হ্রাস চুক্তি করা অন্যান্য দেশের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















