বাংলাদেশের শক্তি খাতে বিরাট অগ্রগতি হিসেবে শূন্য করা বিদ্যুৎ ও গ্যাস বিলের বকেয়া অর্থ চুকিয়ে ফেলা কোন জোটের কাছে কম নয়, এমনটাই দাবি করেছেন বিদ্যুৎ, শক্তি ও খনিজসম্পদ উপদেষ্টা মুহাম্মদ ফৌজুল কাবির খান। তাঁর আজ মঙ্গলবার ছিল দায়িত্বের শেষ কর্মদিবস এবং তিনি বিদ্যুত ভবনে একটি সংবাদ সম্মেলনে খাতে সরকারের কর্মকান্ডের পর্যালোচনা করেন। সারাক্ষণ রিপোর্ট।
শক্তি বিলে বিশাল দায় কমানোর পথে
ফৌজুল কাবির বলেন, সরকার দায়িত্ব নেওয়ার সময় শক্তি খাতে বিরাট অগ্রিম দেনা ছিল। নতুন দায়িত্ব গ্রহণের পর মাত্র কিছু দিনের মধ্যে তাঁকে জানানো হয় বকেয়া বিল না মিটালে এলএনজি আমদানি করা যাবে না এবং বিলের দেরিতে পরিশোধ শুল্ক পুরো খাতকে বিপর্যস্ত করে তুলছিল। তাই প্রথম অগ্রাধিকার হিসেবে বকেয়া বিল পরিশোধই রাখা হয়।
সরকারি খাতের তথ্য মতে, আওয়ামী লীগ সরকার পদত্যাগের পর ৫ আগস্ট ২০২৪ সালে পেট্রোবাংলার বিভিন্ন আন্তর্জাতিক তেলের কোম্পানির কাছে মোট বাকি ছিল ৯১,০৬ কোটি টাকা। এরপর থেকে এপ্রিল ২০২৫ পর্যন্ত পেট্রোবাংলা ৩৫,৭০০ কোটি টাকার বিল পরিশোধ করে সমস্ত বকেয়া অর্থ একেবারে শূন্যে নামিয়ে এনেছে।

ব্যয়-উপশম ও খরচ কমানোর উদ্যোগ
ফৌজুল কাবির বলেন, বকেয়া পরিশোধের পাশাপাশি ব্যয়-উপশম ও খরচ কমানো ও ছিল সরকারের লক্ষ্য। স্পট এবং দীর্ঘমেয়াদী এলএনজি ক্রয়ে কম প্রিমিয়াম ব্যবহারের কারণে প্রথম ছয় মাসে প্রায় ১,৫০০ কোটি টাকা সাশ্রয় সম্ভব হয়েছে। ২৪টি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে নতুন মাস্টার সেলস অ্যান্ড পারচেজ এগ্রিমেন্ট (এমএসপিএ) স্বাক্ষরিত হয়েছে, যার ফলে এলএনজি আমদানি কম প্রিমিয়ামে হচ্ছে। এর আগে জুলাই ২০২৩ থেকে আগস্ট ২০২৪ পর্যন্ত গড় প্রিমিয়াম ছিল প্রতি ইউনিট ১.২৮ ডলার, যা এখন হ্রাস পেয়ে ৩৮ সেন্টে নেমেছে।
গ্যাস অনুসন্ধান ও খনি খরচে স্বচ্ছতা
সরকার গ্যাস অনুসন্ধান ও খনন খরচেও স্বচ্ছতা এনেছে। গ্যাস অনুসন্ধান খনন এলাকায় দ্রুত সেবা আইন বাতিল করে সরকারি ক্রয় বিধি ও নিয়ম (পিপিআর) অনুসারে খনন সম্পন্ন হয়েছে, ফলে খরচ কমে এসেছে। ভোলায় বাপেক্সের অধীনে পাঁচটি গ্যাস অনুসন্ধান কূপ খননে পূর্বানুমানিত ১,৫৫৫ কোটি টাকার কাজটা করা হয়েছে ৯০৭ কোটি টাকায়।
তবে গ্যাসের প্রত্যাশিত পরিমাণ এখনও চিন্তার বিষয়। ফৌজুল কাবির বলেন, খনন কার্যক্রম সময়সাপেক্ষ এবং অনেক ক্ষেত্রে ছয় মাসের বেশি সময় লাগে, ফলে অনেক উদ্যোগ শেষ করতে পারেননি অন্তর্বর্তী সরকার।

বিনিয়োগ সঙ্কট ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা
তিনি বলেন, সরকারের মেয়াদ অস্থিরতা নিয়ে সম্ভাব্য বিনিয়োগকারীরা বারবার প্রশ্ন করেছিলেন, যার ফলে বড় ধরনের বিনিয়োগ চুক্তি সম্পন্ন করা যায়নি। কয়লা-ভিত্তিক শক্তি প্রকল্পে কোন সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়নি এবং তা নির্বাচিত সরকারের কাজ থাকবে। পূর্ববর্তী সরকারের সময় শুরু হওয়া অফশোর বিল্ডিং এর জটিল কাগজপত্রের সমস্যা সমাধান করা হয়েছে।
ফৌজুল কাবির পরামর্শ দিয়েছেন, পরবর্তী সরকারকে অফশোর তেল ও গ্যাস অনুসন্ধান বিডিং চালু রাখার পাশাপাশি স্থল ভিত্তিক এলএনজি টার্মিনাল স্থাপন ও চতুর্থ ফ্লোটিং স্টোরেজ এবং গ্যাসিফিকেশন ইউনিট (এফএসআরইউ) গড়ে তেলার উদ্যোগ নিতে। ২০২৮ সালের মধ্যে ১০০টি গ্যাস কূপ খননের মাধ্যমে দিনে ৯০০ মিলিয়ন ঘনফুট অতিরিক্ত গ্যাস সরবরাহের পরামর্শ দিয়েছে শক্তি বিভাগ।
শেষ কর্মদিবসে উপদেষ্টা
নিজের শেষ কর্মদিবসে ফৌজুল কাবির বলেন তিনি পরবর্তী মন্ত্রীর জন্য লিখিত নির্দেশিকা রেখে যাচ্ছেন। তিনি বলেন, দায়িত্ব নেওয়ার সময় তাঁর কাছে কোন রোডম্যাপ ছিল না, তাই পরবর্তী কেউ জানবে কোথা থেকে শুরু করতে হবে এবং কোনদিকে এগোতে হবে।
সংবাদ সম্মেলনে বিদ্যুৎ ও শক্তি সম্পর্কিত শীর্ষ কর্মকর্তারা, মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা এবং বিভিন্ন সরকারি ও বেসরকারি অংশীদার উপস্থিত ছিলেন।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















