ঢাকা, ১৩ ফেব্রুয়ারি — প্রায় দুই দশক পর বিপুল ব্যবধানে জাতীয় নির্বাচনে জয় পেয়ে আবারও ক্ষমতায় ফিরেছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)। এই জয়ের মধ্য দিয়ে দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পথ প্রায় নিশ্চিত হয়েছে। দীর্ঘ কয়েক মাসের অস্থিরতা ও অর্থনৈতিক বিপর্যয়ের পর দেশের রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ফেরানোর দায়িত্ব এখন তার কাঁধে।
সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার পুত্র এবং নিহত রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের সন্তান তারেক রহমানের সামনে রয়েছে বড় চ্যালেঞ্জ। ২০২৪ সালে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সরকারের পতনের পর যে রাজনৈতিক অস্থিরতা ও শিল্প খাতে বিপর্যয় সৃষ্টি হয়, তা কাটিয়ে ওঠাই হবে তার প্রধান লক্ষ্য। বিশেষ করে দেশের প্রধান রপ্তানি খাত তৈরি পোশাক শিল্প পুনরুজ্জীবিত করা জরুরি হয়ে উঠেছে।

টেলিভিশন চ্যানেলগুলোর সর্বশেষ তথ্যে দেখা গেছে, ২৯৯টি আসনের মধ্যে বিএনপি ও তাদের মিত্ররা অন্তত ২১২টি আসনে জয় পেয়েছে। জামায়াতে ইসলামী ও তাদের জোট পেয়েছে ৭০টি আসন। নির্বাচন কমিশনের প্রাথমিক হিসেবে বিএনপি পেয়েছে ১৮১টি, জামায়াতে ইসলামী ৬১টি এবং অন্যান্যরা ৭টি আসন। পূর্ণাঙ্গ ফলাফল প্রকাশ এখনো বাকি।
সংবিধান অনুযায়ী গেজেট প্রকাশ না হলে নতুন সরকার শপথ নিতে পারবে না। কমিশন জানিয়েছে, কয়েকটি আসনের ফল প্রক্রিয়াধীন থাকায় চূড়ান্ত ফল প্রকাশে আরও কিছু সময় লাগবে।
দলীয় জয়ের প্রবণতা স্পষ্ট হওয়ার পরও তারেক রহমান এখনো আনুষ্ঠানিক মন্তব্য করেননি। বিএনপি সমর্থকদের বড় ধরনের উদ্যাপন থেকে বিরত থাকার আহ্বান জানিয়ে বিশেষ দোয়া করার অনুরোধ জানিয়েছে। বিবৃতিতে বলা হয়, বিপুল ব্যবধানে জয় সত্ত্বেও কোনো আনন্দ মিছিল বা সমাবেশ করা হবে না।

যুব নেতৃত্বাধীন ন্যাশনাল সিটিজেন পার্টি, যারা শেখ হাসিনার পতনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল, তারা প্রতিদ্বন্দ্বিতা করা ৩০টি আসনের মধ্যে মাত্র পাঁচটিতে জয় পেয়েছে। দলটি জামায়াত নেতৃত্বাধীন জোটের অংশ ছিল।
১৭ কোটি ৫০ লাখ মানুষের এই মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশে দীর্ঘদিনের সহিংস অস্থিরতার পর একটি স্পষ্ট নির্বাচনী ফলাফলকে স্থিতিশীলতার জন্য গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছিল। বাংলাদেশ বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম পোশাক রপ্তানিকারক দেশ।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক সেলিম রায়হান বলেন, শক্তিশালী সংখ্যাগরিষ্ঠতা বিএনপিকে দ্রুত সংস্কার পাস করার সক্ষমতা দেবে এবং আইন প্রণয়নে অচলাবস্থা এড়াতে সহায়তা করবে। এতে স্বল্পমেয়াদে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা আসতে পারে।
দলীয় ইশতেহারে বিএনপি কর্মসংস্থান সৃষ্টি, নিম্নআয়ের মানুষের সুরক্ষা এবং কৃষকদের ন্যায্য মূল্য নিশ্চিত করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে।
ঢাকার এক পোশাক শ্রমিক জোসনা বেগম বলেন, কারখানা নিয়মিত চলুক এবং সময়মতো মজুরি পেলেই আমাদের জন্য সেটাই গুরুত্বপূর্ণ। নতুন সরকার যেন স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনে এবং বিদেশি ক্রয়াদেশ বাড়ে, সেটাই আমাদের চাওয়া।
দলের জয়ে তারেক রহমানকে অভিনন্দন জানিয়েছেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি, পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শেহবাজ শরিফ এবং বাংলাদেশে যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূত ব্রেন্ট টি. ক্রিস্টেনসেন।

ভারত, চীন ও যুক্তরাষ্ট্র — এই তিন শক্তিধর দেশ বাংলাদেশে প্রভাব বিস্তারে সক্রিয়। চলতি সপ্তাহে যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূত উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন, দেশে চীনের প্রভাব বাড়ছে। শেখ হাসিনার দেশত্যাগের পর নয়াদিল্লি-ঢাকা সম্পর্কের অবনতি হয়েছে, যার প্রভাব পড়েছে ভিসা সেবা ও ক্রিকেট সম্পর্কেও।
আন্তর্জাতিক সংকট বিষয়ক বিশ্লেষক থমাস কিন বলেন, বাংলাদেশকে ঘিরে বড় শক্তিগুলোর প্রতিযোগিতা যেমন সুযোগ, তেমনি চ্যালেঞ্জও। এই সম্পর্কগুলো কীভাবে সামলানো হবে, সেটাই বড় প্রশ্ন।
জামায়াতে ইসলামী বৃহস্পতিবার রাতে ফলাফলের প্রবণতা স্পষ্ট হওয়ার পর পরাজয় স্বীকার করলেও নির্বাচনী প্রক্রিয়া নিয়ে অসন্তোষ জানিয়েছে। ২০১৩ সালে নিষিদ্ধ হওয়ার পর এবারই প্রথম তারা নির্বাচনে অংশ নেয় এবং ইতিহাসের সর্বোচ্চ ৭০টি আসন পায়। শেখ হাসিনার পতনের পর দলটির ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করা হয়।
২০০টির বেশি আসনে জয় বিএনপির অন্যতম বড় সাফল্য, যা ২০০১ সালের ১৯৩ আসনের জয়কেও ছাড়িয়ে গেছে। তবে ২০০৮ সালে আওয়ামী লীগ ২৩০টি আসনে জয় পেয়েছিল। অতীতের বেশ কয়েকটি নির্বাচন প্রধান দলগুলোর বয়কট বা বিতর্কের কারণে প্রশ্নবিদ্ধ ছিল।

এবারের নির্বাচনে ভোটার উপস্থিতি ছিল প্রায় ৬০ শতাংশ, যা ২০২৪ সালের ৪২ শতাংশের তুলনায় বেশি। দুই হাজারের বেশি প্রার্থী, যার মধ্যে অনেক স্বতন্ত্রও ছিলেন, নির্বাচনে অংশ নেন। একটি আসনে প্রার্থীর মৃত্যুর কারণে ভোট স্থগিত করা হয়।
নির্বাচনের পাশাপাশি অনুষ্ঠিত সাংবিধানিক সংস্কার বিষয়ে গণভোটে দুই মিলিয়নের বেশি ভোটার ‘হ্যাঁ’ এবং প্রায় আট লাখ পঞ্চাশ হাজার ‘না’ ভোট দিয়েছেন বলে একটি টেলিভিশন চ্যানেল জানিয়েছে। তবে এ বিষয়ে এখনো আনুষ্ঠানিক ঘোষণা আসেনি।
প্রস্তাবিত পরিবর্তনের মধ্যে রয়েছে প্রধানমন্ত্রীর জন্য দুই মেয়াদের সীমা, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা জোরদার, নারীর প্রতিনিধিত্ব বৃদ্ধি, নির্বাচনী সময়ে নিরপেক্ষ অন্তর্বর্তীকালীন সরকার এবং ৩০০ আসনের সংসদের পাশাপাশি দ্বিতীয় কক্ষ গঠন।
রুমা পল, কৃষ্ণ এন. দাস ও তোরা আগারওয়ালা 



















