ভেনেজুয়েলার তেল বাণিজ্যে সাম্প্রতিক পরিবর্তন নতুন ভূরাজনৈতিক সমীকরণের ইঙ্গিত দিচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্রের জ্বালানি সচিব ক্রিস রাইট জানিয়েছেন, যুক্তরাষ্ট্র সরকারের নিয়ন্ত্রণে বিক্রি হওয়া ভেনেজুয়েলার কিছু অপরিশোধিত তেল ইতিমধ্যেই চীন কিনেছে। এতে দীর্ঘদিনের নিষেধাজ্ঞা ও উত্তেজনার পর তেল বাজারে এক নতুন বাস্তবতার সূচনা হয়েছে।
কারাকাসে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে রাইট বলেন, যুক্তরাষ্ট্র সরকারের মাধ্যমে বিক্রি হওয়া অপরিশোধিত তেলের একটি অংশ চীন কিনেছে। যদিও তিনি বিস্তারিত কিছু জানাননি, তবে তিনি স্পষ্ট করেন যে বৈধ ব্যবসায়িক শর্তে চীনা কোম্পানিগুলোর সঙ্গে চুক্তি হলে তা গ্রহণযোগ্য হবে। সম্ভাব্য যৌথ বিনিয়োগ প্রসঙ্গে প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেন, বৈধ পরিবেশে বৈধ ব্যবসায়িক চুক্তি হলে তাতে আপত্তির কিছু নেই।
এদিকে বেইজিংয়ে নিয়মিত ব্রিফিংয়ে চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র লিন জিয়ান জানান, রাইটের মন্তব্য সম্পর্কে তিনি অবগত নন।

যুক্তরাষ্ট্রের অভিযানে তেল খাতের নিয়ন্ত্রণ বদল
জানুয়ারিতে বিশ্ব তেলবাজারে বড় ধরনের আলোড়ন সৃষ্টি হয়, যখন যুক্তরাষ্ট্রের বাহিনী ভেনেজুয়েলায় অভিযান চালিয়ে সাবেক প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে আটক করে এবং ওয়াশিংটন দেশটির অপরিশোধিত তেল শিল্পের ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার ঘোষণা দেয়। ওপেক সদস্য দেশ ভেনেজুয়েলার তেল খাত বহু বছর ধরে অবহেলা, নিষেধাজ্ঞা ও বিনিয়োগ সংকটে জর্জরিত ছিল। এই পরিস্থিতিতে রপ্তানি প্রবাহ কীভাবে বদলাবে এবং উৎপাদন কীভাবে পুনরুজ্জীবিত হবে—তা নিয়ে বাজারে নানা জল্পনা শুরু হয়।
কারাকাসে প্রায় তিন দশকের মধ্যে সর্বোচ্চ পর্যায়ের মার্কিন জ্বালানি সফরে রাইট বলেন, ভেনেজুয়েলার তথাকথিত ‘তেল কোয়ারেন্টিন’ কার্যত শেষ হয়ে এসেছে। অভিযানের আগে যুক্তরাষ্ট্র বিশাল নৌবহর মোতায়েন করে দেশটির তেল রপ্তানিতে অবরোধ সৃষ্টি করেছিল এবং একাধিক জাহাজ জব্দ করেছিল।
চীনের জন্য আকর্ষণীয় ছিল ছাড়মূল্যের তেল
বিশ্বের সবচেয়ে বড় তেল আমদানিকারক দেশ চীন যুক্তরাষ্ট্রের পদক্ষেপের আগে ভেনেজুয়েলার অপরিশোধিত তেলের প্রধান ক্রেতা ছিল। বিশেষ করে বেসরকারি চীনা শোধনাগারগুলো বড় পরিমাণে তেল কিনত। নিষেধাজ্ঞার কারণে এসব তেল সাধারণত বড় ছাড়ে বিক্রি হতো, যা স্থানীয় শোধনাগারগুলোর জন্য অত্যন্ত লাভজনক ছিল।

মাদুরোকে আটক করার পর মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প জানান, ভেনেজুয়েলা ৩ থেকে ৫ কোটি ব্যারেল নিষেধাজ্ঞাপ্রাপ্ত তেল যুক্তরাষ্ট্রের কাছে হস্তান্তর করবে। একই সময়ে জানুয়ারিতে এক সাক্ষাৎকারে ক্রিস রাইট বলেন, ভেনেজুয়েলার অপরিশোধিত তেলে চীনের প্রবেশাধিকার পুরোপুরি বন্ধ করার পরিকল্পনা যুক্তরাষ্ট্রের নেই।
ভারত ও অন্যান্য বাজারে রপ্তানি
যুক্তরাষ্ট্রের পদক্ষেপের পর ভেনেজুয়েলার প্রধান মেরেই গ্রেডের অপরিশোধিত তেল কয়েকটি ভারতীয় শোধনাগার কিনেছে। ভারত সরকার রাষ্ট্রায়ত্ত শোধনাগারগুলোকে ভেনেজুয়েলা ও যুক্তরাষ্ট্র থেকে আরও তেল কেনার বিষয়টি বিবেচনার নির্দেশ দিয়েছে। পাশাপাশি ইসরায়েলসহ অন্যান্য বাজারেও ভেনেজুয়েলার তেল রপ্তানি পৌঁছেছে।
উৎপাদন বাড়ার সম্ভাবনা

বিভিন্ন ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান মনে করছে, মাঝারি মেয়াদে ভেনেজুয়েলার তেল উৎপাদন পুনরুজ্জীবিত হতে পারে। জেপিমরগ্যান চেজের পণ্য কৌশল বিভাগের প্রধান নাতাশা কানেভা এক অনুষ্ঠানে বলেন, আগামী দুই থেকে তিন বছরের মধ্যে দেশটির উৎপাদন দৈনিক ২০ লাখ ব্যারেলে পৌঁছাতে পারে।
ওপেকের তথ্য অনুযায়ী, গত ডিসেম্বর মাসে ভেনেজুয়েলার তেল সরবরাহ ছিল দৈনিক প্রায় ৮ লাখ ৯৬ হাজার ব্যারেল। দীর্ঘদিনের সংকট কাটিয়ে উৎপাদন বাড়াতে পারলে দেশটি আবারও বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে গুরুত্বপূর্ণ অবস্থান ফিরে পেতে পারে।
নিষেধাজ্ঞা, সামরিক হস্তক্ষেপ এবং কূটনৈতিক সমঝোতার জটিল সমীকরণের মধ্য দিয়ে ভেনেজুয়েলার তেল এখন নতুন এক অধ্যায়ে প্রবেশ করেছে। এই পরিবর্তনের প্রভাব শুধু লাতিন আমেরিকায় নয়, বরং বৈশ্বিক জ্বালানি রাজনীতিতেও দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব ফেলতে পারে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















