চীনের তামা গলনকারখানাগুলোর আয়ের মূল ভরসা এখন আর তামা নয়, বরং সালফিউরিক অ্যাসিড। গত আড়াই বছরে এই অ্যাসিডের দাম প্রায় ৫০০ শতাংশ বেড়েছে, যা গলনকারখানাগুলোর মুনাফায় বড় উল্লম্ফন এনে দিয়েছে। তবে বিশ্লেষকদের সতর্কবার্তা—এই অস্বাভাবিক লাভ কতদিন স্থায়ী হবে, তা নিয়ে অনিশ্চয়তা বাড়ছে।
রাশিয়ায় হামলার পর দামের ঝাঁপ
গত সেপ্টেম্বর ইউক্রেনীয় ড্রোন হামলায় রাশিয়ার আস্ত্রাখান গ্যাস প্রক্রিয়াকরণ কেন্দ্র ক্ষতিগ্রস্ত হলে বৈশ্বিক সালফারের সরবরাহে বড় ধাক্কা লাগে। এই সালফার থেকেই তৈরি হয় সালফিউরিক অ্যাসিড, যা খনি, সার শিল্প এবং ক্রমবর্ধমানভাবে ব্যাটারি খাতে ব্যবহৃত হয়।
হামলার আগে নয় মাসে অ্যাসিডের দাম ৪১ শতাংশ বাড়লেও রাশিয়া সালফার রপ্তানি বন্ধ করার পর বছরের শেষে দাম প্রায় দ্বিগুণ হয়ে যায়। এতে চীনের তামা গলনকারখানাগুলো অপ্রত্যাশিত আর্থিক সুবিধা পায়।

মূল ব্যবসায় মন্দা, ভরসা উপপণ্য
সাধারণত গলনকারখানাগুলো তামার কনসেন্ট্রেটকে ধাতুতে রূপান্তর করে যে ফি পায়, সেটিই তাদের প্রধান আয়। এই ফিকে বলা হয় ট্রিটমেন্ট ও রিফাইনিং চার্জ। কিন্তু নতুন গলনকারখানা বেড়ে যাওয়া এবং খনিতে উৎপাদন ব্যাহত হওয়ায় কনসেন্ট্রেটের ঘাটতি তৈরি হয়েছে। ফলে এই ফি কমতে কমতে ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে শূন্যের নিচে নেমে যায় এবং জানুয়ারিতে তা রেকর্ড মাইনাস ৪৯ ডলারে পৌঁছায়।
অন্যদিকে সালফিউরিক অ্যাসিডের দাম উল্টো পথে হাঁটছে। ২০২৫ সালের জানুয়ারির শুরুতে চীনে প্রতি টন অ্যাসিডের দাম দাঁড়ায় প্রায় ১,০৪৫ ইউয়ান, যা এক বছর আগে ছিল ৪৬৪ ইউয়ান।
এই মূল্যবৃদ্ধির ফলে গত বছর চীনের তামা গলনকারখানাগুলো অতিরিক্ত প্রায় ১.৫ বিলিয়ন ডলার আয় করেছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
উপপণ্য থেকে প্রধান আয়
চীনের বড় গলনকারখানাগুলোর একটি, Yunnan Copper, তাদের অর্ধবার্ষিক প্রতিবেদনে জানায়—সালফিউরিক অ্যাসিড বিক্রি থেকে তারা ৭৯০ মিলিয়ন ইউয়ান আয় করেছে, যা মোট স্থূল মুনাফার প্রায় এক-চতুর্থাংশ। অথচ মোট আয়ের মাত্র প্রায় ১ শতাংশ এসেছে এই অ্যাসিড থেকে।
বিশ্লেষকদের মতে, একটি উপপণ্য থেকে এভাবে মূল মুনাফা আসা ঝুঁকিপূর্ণ। কারণ অ্যাসিডের বাজার তামা শিল্পের মূল ব্যবসার সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত নয় এবং এটি অস্থির।
চাহিদা বাড়ছে নতুন খাতে
সার শিল্প ছাড়াও এখন ব্যাটারি ও খনিশিল্পে অ্যাসিডের ব্যবহার দ্রুত বাড়ছে। বিশেষ করে ইন্দোনেশিয়ার নিকেল খনি খাতে এবং চীনের লিথিয়াম আয়রন ফসফেট ব্যাটারি শিল্পে সালফিউরিক অ্যাসিডের চাহিদা উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। যদিও মোট ব্যবহারের তুলনায় এই অংশ এখনো ছোট, তবে দ্রুত সম্প্রসারণ বাজারকে চাপে ফেলেছে।
এদিকে জাম্বিয়া খনি শিল্পের জন্য সরবরাহ নিশ্চিত করতে অ্যাসিড রপ্তানি নিষিদ্ধ করেছে। বৈশ্বিক সরবরাহ সংকট ও চীনের আমদানিনির্ভরতা—প্রায় ৪০ শতাংশ সালফার আমদানি করতে হয়—দেশীয় বাজারেও দাম বাড়িয়ে দিয়েছে।

মূল্যপতনের আশঙ্কা
যদিও বর্তমান পরিস্থিতিতে অ্যাসিড বড় আয়ের উৎস, তবুও বাজার ঘুরে যেতে পারে বলে আশঙ্কা রয়েছে। কিছু বিশ্লেষক আগামী মাসগুলোতে দামে ১০ থেকে ৩০ শতাংশ পর্যন্ত পতনের পূর্বাভাস দিয়েছেন। উচ্চ দামের কারণে চাহিদা কমে যাওয়া, নতুন প্রকল্প চালু হওয়া এবং বেইজিংয়ের রপ্তানি নিয়ন্ত্রণ—এসব কারণে বাজারে সরবরাহ বাড়তে পারে।
চিলির খনি কোম্পানি Antofagasta ডিসেম্বর মাসে কিছু চীনা গলনকারখানার সঙ্গে শূন্য ফিতে চুক্তি করেছে, যা শিল্পের চাপের ইঙ্গিত দেয়।
বিশ্লেষকদের মতে, যদি অ্যাসিডের দাম উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যায় এবং তামা প্রক্রিয়াকরণ ফি নেতিবাচকই থাকে, তাহলে গলনকারখানাগুলো উৎপাদন কমাতে বাধ্য হতে পারে। দীর্ঘমেয়াদি রক্ষণাবেক্ষণ বা উৎপাদন হ্রাসের মতো পদক্ষেপ নেওয়ার সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।
সামগ্রিকভাবে দেখা যাচ্ছে, তামার বদলে অ্যাসিড এখন চীনের গলনকারখানার মুনাফার মূল চালিকাশক্তি। তবে এই নির্ভরতা দীর্ঘস্থায়ী হবে কি না, তা নির্ধারণ করবে বৈশ্বিক সরবরাহ, নতুন চাহিদা এবং দামের ভবিষ্যৎ গতিপ্রকৃতি।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















