যুক্তরাষ্ট্রে জলবায়ু নিয়ন্ত্রণ নীতিতে বড় ধরনের পরিবর্তন আনল প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসন। গ্রিনহাউস গ্যাস মানুষের স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর—এমন বৈজ্ঞানিক ভিত্তিকে বাতিল করে দেওয়ার পাশাপাশি গাড়ি ও ট্রাকের জন্য প্রযোজ্য ফেডারেল টেলপাইপ নির্গমন মানদণ্ডও প্রত্যাহার করা হয়েছে।
এই সিদ্ধান্তকে ট্রাম্প প্রশাসনের এখন পর্যন্ত সবচেয়ে ব্যাপক জলবায়ু নীতি প্রত্যাহার হিসেবে দেখা হচ্ছে। এর আগে জীবাশ্ম জ্বালানির উন্নয়ন সহজ করা এবং পরিচ্ছন্ন জ্বালানির বিস্তার রোধে একাধিক নিয়ম শিথিল করা হয়েছিল।
হোয়াইট হাউসে বক্তব্যে ট্রাম্প বলেন, পরিবেশ সুরক্ষা সংস্থা সম্প্রতি যে প্রক্রিয়া সম্পন্ন করেছে, তার মাধ্যমে তথাকথিত ‘এনডেঞ্জারমেন্ট ফাইন্ডিং’ আনুষ্ঠানিকভাবে সমাপ্ত করা হয়েছে। তার ভাষায়, এটি ছিল ওবামা আমলের একটি নীতি, যা মার্কিন গাড়ি শিল্পের ক্ষতি করেছে এবং ভোক্তাদের জন্য দাম বাড়িয়েছে। তিনি একে যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় নিয়ন্ত্রণ শিথিলকরণ পদক্ষেপ বলে দাবি করেন।
এনডেঞ্জারমেন্ট ফাইন্ডিং কী এবং কেন গুরুত্বপূর্ণ
২০০৯ সালে প্রথম গৃহীত এই সিদ্ধান্তে বলা হয়েছিল, কার্বন ডাই–অক্সাইড, মিথেনসহ কয়েকটি গ্রিনহাউস গ্যাস জনস্বাস্থ্য ও পরিবেশের জন্য হুমকি। এর ভিত্তিতে ১৯৬৩ সালের ক্লিন এয়ার অ্যাক্ট অনুযায়ী পরিবেশ সুরক্ষা সংস্থা যানবাহন, বিদ্যুৎকেন্দ্র ও বিভিন্ন শিল্পখাতে নির্গমন নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা পায়।
এর আগে ২০০৭ সালে ম্যাসাচুসেটস বনাম পরিবেশ সুরক্ষা সংস্থা মামলায় সুপ্রিম কোর্ট রায় দেয় যে, ক্লিন এয়ার অ্যাক্টের আওতায় সংস্থাটির গ্রিনহাউস গ্যাস নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা রয়েছে।
বর্তমান প্রশাসন বলছে, ওই সিদ্ধান্তে ফেডারেল পরিচ্ছন্ন বায়ু আইনের ভুল ব্যাখ্যা করা হয়েছিল। তাদের যুক্তি, আইনটি মূলত স্থানীয় বা আঞ্চলিক দূষণ থেকে সুরক্ষার জন্য, বৈশ্বিক উষ্ণায়নের মতো বৈশ্বিক প্রভাব মোকাবিলার জন্য নয়। এই আইনি ব্যাখ্যার কারণে সংস্থাটি তার আইনগত ক্ষমতার সীমা অতিক্রম করেছিল বলে দাবি করা হয়েছে।
যানবাহন নির্গমন মানদণ্ড বাতিলের প্রভাব
এনডেঞ্জারমেন্ট ফাইন্ডিং বাতিল হওয়ায় গাড়ির ক্ষেত্রে গ্রিনহাউস গ্যাস নির্গমন পরিমাপ, প্রতিবেদন, সনদ ও মানদণ্ড মেনে চলার ফেডারেল বাধ্যবাধকতা উঠে যাবে। তবে প্রাথমিকভাবে এটি বিদ্যুৎকেন্দ্রের মতো স্থির উৎসে প্রযোজ্য নাও হতে পারে।
পরিবেশ সুরক্ষা সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রে মোট গ্রিনহাউস গ্যাস নিঃসরণের প্রায় এক-চতুর্থাংশ করে পরিবহন ও বিদ্যুৎ খাত থেকে আসে।
প্রশাসনের দাবি, এই পদক্ষেপে মার্কিন করদাতাদের প্রায় ১ দশমিক ৩ ট্রিলিয়ন ডলার সাশ্রয় হবে। তবে আগের প্রশাসন বলেছিল, কঠোর মানদণ্ডের ফলে জ্বালানি খরচ কমে ভোক্তারা দীর্ঘমেয়াদে উপকৃত হবেন।
বাইডেন আমলের পরিকল্পনা ছিল ২০৩২ সালের মধ্যে যাত্রীবাহী গাড়ির বহরভিত্তিক টেলপাইপ নির্গমন ২০২৭ সালের সম্ভাব্য মাত্রার তুলনায় প্রায় ৫০ শতাংশ কমানো। এছাড়া ২০৩০ থেকে ২০৩২ সালের মধ্যে বিক্রি হওয়া নতুন গাড়ির ৩৫ থেকে ৫৬ শতাংশ বৈদ্যুতিক হওয়ার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছিল। সে সময় হিসাব করা হয়েছিল, নিয়মগুলো কার্যকর থাকলে ২০৫৫ সাল পর্যন্ত প্রতিবছর নেট ৯৯ বিলিয়ন ডলার সুবিধা মিলবে। নতুন গাড়ির পুরো ব্যবহারের সময়ে একজন ভোক্তার গড়ে প্রায় ৬ হাজার ডলার সাশ্রয়ের সম্ভাবনাও দেখানো হয়েছিল।
সমর্থন ও বিরোধিতা
বড় গাড়ি নির্মাতাদের প্রতিনিধিত্বকারী একটি জোট জানায়, আগের প্রশাসনের নির্ধারিত নির্গমন বিধি বর্তমান বাজারে বৈদ্যুতিক গাড়ির চাহিদার প্রেক্ষাপটে বাস্তবায়ন করা অত্যন্ত কঠিন। তবে তারা সরাসরি এই সিদ্ধান্তকে সমর্থন করেনি।
অন্যদিকে পরিবেশবাদী সংগঠনগুলো কঠোর সমালোচনা করেছে। তাদের মতে, এই সিদ্ধান্তের ফলে দূষণ বাড়বে, ঝড় ও বন্যার ঝুঁকি তীব্র হবে এবং বীমা ব্যয়সহ সামগ্রিক খরচ বাড়বে। তারা সতর্ক করেছে, স্বল্পমেয়াদে খরচ কমানোর দাবি করা হলেও দীর্ঘমেয়াদে সাধারণ পরিবারগুলোই বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
কয়লা শিল্প এই ঘোষণাকে স্বাগত জানিয়েছে। তাদের মতে, বহু পুরোনো কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র বন্ধের যে পরিকল্পনা ছিল, তা পুনর্বিবেচনা করা গেলে নতুন ও ব্যয়বহুল বিদ্যুৎ উৎস নির্মাণের প্রয়োজন কমবে এবং জ্বালানি নিরাপত্তা বজায় থাকবে।
আইনি অনিশ্চয়তা ও ভবিষ্যৎ লড়াই
আইন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই নীতি প্রত্যাহার নতুন করে আইনি জটিলতা তৈরি করতে পারে। অতীতে সুপ্রিম কোর্টের রায়ে গ্রিনহাউস গ্যাস নিয়ন্ত্রণের বিষয়টি আদালতের পরিবর্তে পরিবেশ সুরক্ষা সংস্থার হাতে ন্যস্ত করা হয়েছিল। এখন সিদ্ধান্ত বদলে গেলে ‘পাবলিক নিউসেন্স’ বা জনস্বার্থ ক্ষতির অভিযোগে নতুন মামলা বাড়তে পারে।
বেশ কয়েকটি পরিবেশবাদী সংগঠন ইতোমধ্যে জানিয়েছে, তারা আদালতে এই সিদ্ধান্ত চ্যালেঞ্জ করবে। ফলে বিষয়টি শেষ পর্যন্ত আবারও সুপ্রিম কোর্ট পর্যন্ত গড়াতে পারে। বিশ্লেষকদের মতে, ভবিষ্যতে কোনো প্রশাসন আবার গ্রিনহাউস গ্যাস নিয়ন্ত্রণ করতে চাইলে এনডেঞ্জারমেন্ট ফাইন্ডিং পুনর্বহাল করা রাজনৈতিক ও আইনি দিক থেকে জটিল হতে পারে।
এই সিদ্ধান্তের মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রের জলবায়ু নীতিতে বড় এক মোড় পরিবর্তন হলো। সমর্থকরা একে অর্থনৈতিক মুক্তি হিসেবে দেখছেন, আর সমালোচকরা বলছেন, এটি জলবায়ু সুরক্ষার ক্ষেত্রে এক বড় পশ্চাৎপদতা।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















