ক্লাসিক উপন্যাসকে পর্দায় রূপ দেওয়ার সেরা উপায় কী—মূল বইয়ের প্রতি অক্ষরে অক্ষরে অনুগত থাকা, নাকি সাহসী ব্যাখ্যায় নতুন কিছু তৈরি করা? এই প্রশ্নকে কেন্দ্র করেই আবার আলোচনায় এসেছে উনিশ শতকের বিখ্যাত উপন্যাস ‘ওয়াদারিং হাইটস’। ১৮৪৭ সালে এমিলি ব্রন্টে’র লেখা এই উপন্যাস অবলম্বনে নির্মিত নতুন চলচ্চিত্র ইতোমধ্যে দর্শক ও সমালোচকদের মধ্যে তুমুল বিতর্কের জন্ম দিয়েছে।
পরিচালকের সাহসী ঘোষণা
এই ছবির চিত্রনাট্য ও পরিচালনায় রয়েছেন ব্রিটিশ নির্মাতা এমেরাল্ড ফেনেল। শুরুতেই তিনি জানিয়ে দেন, এত ঘন, জটিল ও আবেগপূর্ণ একটি উপন্যাস হুবহু পর্দায় তোলা সম্ভব নয়। তাই তিনি মূল কাহিনিকে নিজের মতো করে ব্যাখ্যা করেছেন। তার ভাষায়, এটি উপন্যাসের সরাসরি রূপান্তর নয়, বরং নিজের ব্যক্তিগত স্মৃতি ও অনুভূতি থেকে নির্মিত এক নতুন পাঠ।
কাহিনির কাঠামো রাখা, আত্মা বদলে ফেলা
চলচ্চিত্রে হিথক্লিফের আর্নশ পরিবারে দত্তক গ্রহণ, ক্যাথির সঙ্গে তার গভীর সম্পর্ক, লিন্টন পরিবারের সঙ্গে বন্ধুত্ব এবং শেষ পর্যন্ত ক্যাথির এডগার লিন্টনকে বিয়ে—এসব মূল উপাদান রাখা হয়েছে। এমনকি ক্যাথির বিখ্যাত উক্তিও আছে, যেখানে সে বলে তাদের আত্মা যেন একই সত্তা থেকে গড়া।
তবে উপন্যাসের দ্বিতীয়ার্ধ, প্রজন্মান্তরের দ্বন্দ্ব ও হিথক্লিফের দীর্ঘ প্রতিশোধপর্ব পুরোপুরি বাদ দেওয়া হয়েছে। ছবির শেষেই ক্যাথির মৃত্যু দেখানো হয়। ফলে পরবর্তী সময়ের জটিল মানসিক ও সামাজিক নাটক আর নেই। উপন্যাসে যে ভূতুড়ে আবহ ও দীর্ঘস্থায়ী ট্র্যাজেডির ছায়া ছিল, সেটিও এখানে অনুপস্থিত।

প্রেমের ভাষা থেকে শরীরের ভাষায়
উপন্যাসে ক্যাথি ও হিথক্লিফের প্রেম ছিল তীব্র কিন্তু অনেকটাই অব্যক্ত। অথচ এই চলচ্চিত্রে সেই প্রেম উচ্চকণ্ঠ, স্পষ্ট এবং বহু ক্ষেত্রে শারীরিক ঘনিষ্ঠতার মাধ্যমে প্রকাশিত। ক্যাথির চরিত্রে অভিনয় করেছেন মার্গট রবি। ছবিতে তাকে এমন এক অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে যেতে দেখা যায়, যা তার ভেতরে এক নতুন আকাঙ্ক্ষার জাগরণ ঘটায়। পরে হিথক্লিফ ফিরে এলে তাদের সম্পর্ক দ্রুত শারীরিক ঘনিষ্ঠতায় রূপ নেয়।
বাগান, ঘোড়ার গাড়ি কিংবা ব্যক্তিগত কক্ষে তাদের আবেগের বিস্ফোরণ দেখানো হয়েছে খোলামেলাভাবে। নির্মাতা আগের কাজেও আকাঙ্ক্ষার অন্ধকার দিক তুলে ধরেছেন। ‘প্রমিজিং ইয়াং ওম্যান’ এবং ‘সল্টবার্ন’-এও সেই প্রবণতা ছিল স্পষ্ট। ফলে নতুন ছবিতেও তার সেই ঝুঁকিপূর্ণ ও সাহসী ভঙ্গি অব্যাহত রয়েছে।
সমালোচনা ও প্রতিক্রিয়া
অনেক দর্শক মনে করছেন, শ্রেণিবৈষম্য, আবেশ ও সহিংসতার যে গভীর বিশ্লেষণ ব্রন্টে’র উপন্যাসে ছিল, তা এখানে অনেকটাই সরলীকৃত হয়েছে। কারও মতে, এটি মূল কাহিনির বিকৃতি। আবার অন্যদের মতে, এটি এক নতুন প্রজন্মের দৃষ্টিভঙ্গি, যেখানে পুরোনো গল্পকে নতুন আলোয় দেখা হয়েছে।
তবে একটি বিষয় পরিষ্কার—মূল বই অক্ষতই আছে। যারা আদি কাহিনির প্রতি অনুগত থাকতে চান, তারা বইয়ের পাতায় ফিরলেই সেই আবহ খুঁজে পাবেন।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















