যুক্তরাষ্ট্রের নিউ মেক্সিকো অঙ্গরাজ্যে বহু বছর ধরে আলোচিত জোরো র্যাঞ্চকে ঘিরে অবশেষে পূর্ণাঙ্গ তদন্তের পথ খুলে দিল আইনসভা। কুখ্যাত যৌন অপরাধী জেফ্রি এপস্টেইনের কর্মকাণ্ড নিয়ে এই প্রথম রাজ্য পর্যায়ে বিস্তৃত অনুসন্ধান শুরু হতে যাচ্ছে। আইনপ্রণেতাদের ভাষায়, এতদিন যা অন্ধকারে ঢাকা ছিল, এবার তা প্রকাশ্যে আনার সময় এসেছে।
দ্বিদলীয় কমিটির গঠন
নিউ মেক্সিকোর প্রতিনিধি পরিষদ সর্বসম্মত ভোটে একটি আইন পাস করেছে, যার মাধ্যমে চার সদস্যের একটি দ্বিদলীয় ‘সত্য কমিশন’ গঠন করা হয়েছে। এই কমিটি জোরো র্যাঞ্চে কী ঘটেছিল, কারা সেখানে যাতায়াত করতেন, এবং রাজ্যের কোনো কর্মকর্তা বিষয়টি জানতেন কি না—এসব খতিয়ে দেখবে।
সান্তা ফে শহর থেকে প্রায় ৩০ মাইল দূরে অবস্থিত ৭,৬০০ একর জায়গাজুড়ে বিস্তৃত এই র্যাঞ্চে এপস্টেইন কিশোরী ও নারীদের পাচার ও যৌন নির্যাতন করেছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। কমিটি ভুক্তভোগীদের সাক্ষ্য গ্রহণ করবে এবং স্থানীয় বাসিন্দাদেরও সামনে এসে তথ্য দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে।
কেন এখন এই তদন্ত
২০১৯ সালে নিউইয়র্কের কারাগারে আত্মহত্যা করেন এপস্টেইন। সে সময় তিনি ফেডারেল যৌন পাচার মামলার মুখোমুখি ছিলেন। সাম্প্রতিক সময়ে প্রকাশিত বিপুল নথিতে নিউ মেক্সিকোর র্যাঞ্চ-সংক্রান্ত নতুন তথ্য সামনে আসে। এতে রাজ্যের সাবেক দুই গভর্নর ও এক অ্যাটর্নি জেনারেলের সঙ্গে এপস্টেইনের যোগাযোগের ইঙ্গিত মিলেছে।
এই প্রেক্ষাপটে রাজ্যে রাজনৈতিক চাপ বাড়তে থাকে। ডেমোক্র্যাট নেতৃত্বাধীন এই তদন্ত রাজ্যের রাজনীতিবিদদের পাশাপাশি বিজ্ঞানী, বিনিয়োগকারী ও অন্যান্য প্রভাবশালী ব্যক্তিদের জন্যও অস্বস্তিকর পরিস্থিতি তৈরি করতে পারে, যারা কখনও না কখনও র্যাঞ্চে গিয়েছিলেন।
২ দশকের কার্যক্রম, কিন্তু অভিযোগহীন
একাধিক দেওয়ানি মামলায় জোরো র্যাঞ্চে কিশোরীদের যৌন নির্যাতনের অভিযোগ উঠলেও এপস্টেইনের বিরুদ্ধে নিউ মেক্সিকোতে কখনও আনুষ্ঠানিক অভিযোগ গঠন হয়নি। স্থানীয়ভাবে র্যাঞ্চটি ‘প্লেবয় র্যাঞ্চ’ নামে পরিচিত ছিল।
ডেমোক্র্যাট আইনপ্রণেতা আন্দ্রেয়া রোমেরো বলেন, জবাবদিহি ছাড়াই এপস্টেইন রাজ্যে যা খুশি করেছেন। তদন্তে উঠে আসা সাক্ষ্য ভবিষ্যতে ফৌজদারি মামলায় ব্যবহার হতে পারে বলেও তিনি জানান।
আগের তদন্ত কেন থেমে যায়
২০১৯ সালে নিউ মেক্সিকোর তৎকালীন অ্যাটর্নি জেনারেল হেক্টর বালদেরাস তদন্ত শুরু করলেও ফেডারেল প্রসিকিউটরদের অনুরোধে তা স্থগিত করা হয়, যাতে সমান্তরাল তদন্তে জটিলতা না তৈরি হয়। বর্তমান অ্যাটর্নি জেনারেল রাউল তোরেজ ইতিমধ্যে একজন বিশেষ এজেন্ট নিয়োগ দিয়েছেন, যিনি কমিশনের মাধ্যমে আসা অভিযোগগুলো খতিয়ে দেখবেন।
তবে শিশু যৌন নির্যাতনের মামলায় সময়সীমা বাড়ানোর প্রস্তাবটি রাজ্য আইনসভার একটি কমিটি নাকচ করেছে। এর ফলে এপস্টেইনের ভুক্তভোগীরা দেওয়ানি মামলা করার ক্ষেত্রে সীমাবদ্ধতার মুখে পড়তে পারেন।
রাজনৈতিক যোগসূত্র ও আর্থিক লেনদেন
১৯৯৩ সালে তৎকালীন গভর্নর ব্রুস কিংয়ের কাছ থেকে র্যাঞ্চটি কেনেন এপস্টেইন। পরে ২০২৩ সালে তার সম্পত্তি টেক্সাসের ব্যবসায়ী ও রাজনীতিক ডন হাফিন্সের কাছে বিক্রি করা হয়। হাফিন্স তদন্তে সহযোগিতা করতে প্রস্তুত বলে জানা গেছে।
নথিতে দেখা যায়, এপস্টেইন নিউ মেক্সিকোর কয়েকজন ডেমোক্র্যাট রাজনীতিকের নির্বাচনী প্রচারণায় অনুদান দিয়েছিলেন। সাবেক অ্যাটর্নি জেনারেল গ্যারি কিং ২০১৪ সালে গভর্নর পদে প্রার্থী থাকার সময় এপস্টেইনের ভাড়া করা বিমানে ভ্রমণ করেছিলেন। পরে অনুদানের বিষয়টি প্রকাশ্যে এলে অনেকে অর্থ ফেরত দেওয়া বা দাতব্য সংস্থায় দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেন।
ভুক্তভোগীদের দাবি
এপস্টেইনের সঙ্গী ঘিসলেন ম্যাক্সওয়েলের নির্দেশে সাবেক গভর্নর বিল রিচার্ডসনকে ‘ম্যাসাজ’ দেওয়ার কথা বলা হয়েছিল বলে আদালতে সাক্ষ্য দিয়েছিলেন ভুক্তভোগী ভার্জিনিয়া জিউফ্রে। তার ভাষ্যে, ‘ম্যাসাজ’ শব্দটি ছিল যৌন সম্পর্কের ইঙ্গিত। তবে রিচার্ডসনের প্রতিনিধি অভিযোগ সম্পূর্ণ মিথ্যা বলে দাবি করেন।
এক প্রামাণ্যচিত্রে সান্তা ফের এক ম্যাসাজ থেরাপিস্টও র্যাঞ্চে কাজ করার সময় নির্যাতনের অভিযোগ তুলেছেন। র্যাঞ্চ ম্যানেজারের আগের এক সাক্ষ্যে জানা যায়, স্থানীয় স্পা প্রতিষ্ঠান থেকেও কর্মী নেওয়া হতো। যদিও সংশ্লিষ্ট স্পা কর্তৃপক্ষ এই অভিযোগ অস্বীকার করেছে।
বিজ্ঞানী ও ব্যবসায়ীদের যাতায়াত
বিনিয়োগ পরামর্শক জোশুয়া রামো জানিয়েছেন, তিনি ২০১৪ সালে একবার র্যাঞ্চে গিয়েছিলেন, যেখানে ম্যাসাচুসেটস ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজি ও হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপকেরা উপস্থিত ছিলেন। তিনি দাবি করেন, সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের যাচাই-বাছাইয়ের ওপর ভরসা করেই তিনি সেখানে গিয়েছিলেন এবং এখন ভুক্তভোগীদের জন্য গভীর শোক প্রকাশ করছেন।
তদন্তের লক্ষ্য ও সময়সীমা
প্রায় ২৫ লাখ ডলারের এই তদন্ত কমিটির তলব করার ক্ষমতা রয়েছে। কমিটি মঙ্গলবার থেকে কাজ শুরু করবে। জুলাইয়ে অন্তর্বর্তী প্রতিবেদন এবং বছরের শেষে চূড়ান্ত প্রতিবেদন দেওয়ার কথা রয়েছে।
আইনপ্রণেতাদের আশা, এই তদন্ত নিউ মেক্সিকোর আইনি ফাঁকফোকর চিহ্নিত করবে এবং ভবিষ্যতে এমন অপরাধ রোধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে সহায়তা করবে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















