০৫:১৬ অপরাহ্ন, বুধবার, ১০ জুন ২০২৬
কেমোথেরাপির পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ায় মানসিক সক্ষমতা ধরে রাখতে ব্যায়াম হতে পারে কার্যকর: নতুন গবেষণা সরকারের অনুমোদন: মরক্কো থেকে ৬০ হাজার টন টিএসপি সার আমদানি, ডালও কিনছে সরকার ইসলামী ব্যাংকের অস্থিরতায় উদ্বিগ্ন ব্যাংকাররা, আস্থার সংকটের আশঙ্কা রাজশাহীতে সড়ক দুর্ঘটনায় ব্যাংক কর্মকর্তাসহ নিহত ২ হামে মৃত্যুর সংখ্যা বেড়ে ৬৩৯, ২৪ ঘণ্টায় আরও ৮ শিশুর মৃত্যু অর্থনীতি পুনরুদ্ধারে জোর দেওয়ার আহ্বান, আজ আসছে ৯.৩৮ লাখ কোটি টাকার বাজেট ইকোনমিস্টের প্রতিবেদনঃ ভারতের জনসংখ্যা দ্রুতগতিতে কমতে শুরু করবে  নতুন বিশ্বব্যবস্থায় চীনের অবস্থান: কূটনীতি, শক্তির ভারসাম্য ও বৈশ্বিক নেতৃত্বের প্রশ্ন নির্বাচিত প্রতিষ্ঠান যখন ক্ষমতার যুদ্ধে বন্দি যুক্তরাষ্ট্রে অভিবাসন নজরদারিতে ৭০ বিলিয়ন ডলারের তহবিল অনুমোদন, ট্রাম্পের স্বাক্ষরের অপেক্ষা

ইকোনমিস্টের প্রতিবেদনঃ ভারতের জনসংখ্যা দ্রুতগতিতে কমতে শুরু করবে 

১৯৭০-এর দশকে দিল্লির যে বিশাল বস্তিতে পারুল গায়েন বাস করতেন, সেখানে শিশুদের ভিড় ছিল চোখে পড়ার মতো। তখন তার মায়ের ছয় ভাইবোন বা দাদার ১১ সন্তানের পরিবার অস্বাভাবিক কিছু ছিল না। স্বপন, যাকে তিনি প্রায়ই সাইকেলে কাজে যেতে দেখতেন এবং পরে মাত্র ১৬ বছর বয়সে বিয়ে করেন, তারও ছিল ছয় ভাইবোন—সপ্তম সন্তানটি শৈশবেই মারা যায়।

কিন্তু সময় বদলেছে। বর্তমানে ৫৮ বছর বয়সী পারুল গায়েন স্বপনের সঙ্গে কাছাকাছি একটি এক কক্ষের ফ্ল্যাটে থাকেন। তাদের তিন সন্তানের মধ্যে মাত্র দুজন সন্তান নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে, আর দুজনই থেমেছে এক সন্তানেই।

পারুল বলেন, “একটা সন্তান একটু একাকী লাগে।”

১৯৫০ সালে ভারতের জনসংখ্যা ছিল ৩৬ কোটি। তখন গড়ে একজন ভারতীয় নারীর ছয়টি সন্তান হতো—যা এক শতাব্দী আগে একজন আমেরিকান নারীর সন্তান সংখ্যার কাছাকাছি ছিল। আজ ভারতের জনসংখ্যা ১৪৫ কোটিতে পৌঁছেছে, যা বিশ্বের মোট জনসংখ্যার প্রায় এক-ষষ্ঠাংশ। ২০২৩ সালে ভারত চীনকে ছাড়িয়ে বিশ্বের সবচেয়ে জনবহুল দেশে পরিণত হয় এবং এরপরও জনসংখ্যা বাড়তে থাকে।

তবে এখন ভারতের মোট প্রজনন হার (টিএফআর)—অর্থাৎ একজন নারী জীবদ্দশায় গড়ে যত সন্তান জন্ম দেন—নেমে এসেছে ১.৯-এ। দীর্ঘমেয়াদে জনসংখ্যা স্থিতিশীল রাখতে যে হার প্রয়োজন, তার নিচে অবস্থান করছে এই সংখ্যা। ফলে বর্তমান শিশু প্রজন্ম বড় হয়ে সন্তান ধারণ শুরু করা পর্যন্ত জনসংখ্যা কিছুদিন বাড়লেও, ভবিষ্যতে জনসংখ্যা হ্রাস প্রায় অবশ্যম্ভাবী, যদি না প্রজনন হার আবার ২.১৫-এর ওপরে উঠে আসে।

বাস্তবে প্রজনন হার আরও কমার সম্ভাবনাই বেশি, যা জনসংখ্যা সংকোচনের গতি বাড়াবে। উদাহরণ হিসেবে দিল্লিতে বর্তমানে টিএফআর মাত্র ১.২।

India's Fertility Rate Falls Below Replacement Level for First Time,  Signals Major Demographic Shift - Pragativadi I Latest Odisha News in  English I Breaking News

কমে যাচ্ছে জন্মহার

উন্নত দেশ এবং বহু মধ্যম আয়ের দেশ ইতোমধ্যেই জন্মহার হ্রাস, কর্মক্ষম জনগোষ্ঠীর সংকোচন এবং জনসংখ্যা কমে যাওয়ার আশঙ্কায় উদ্বিগ্ন। অনেক সরকার মানুষকে বেশি সন্তান নিতে উৎসাহিত করতে নানা প্রণোদনা বা ভর্তুকি দিলেও তেমন সাফল্য পায়নি।

একসময় দ্রুত জনসংখ্যা বৃদ্ধির জন্য উদ্বেগের কেন্দ্র ছিল ভারত। এখন সেই ভারতও একই বাস্তবতার মুখোমুখি। এ গ্রীষ্মে প্রকাশিত হতে যাওয়া নতুন স্কুল পাঠ্যবইয়ে অতিরিক্ত জনসংখ্যার বদলে খুব কম সন্তান জন্মের ঝুঁকি নিয়ে সতর্ক করা হবে।

মে মাসে দক্ষিণ ভারতের অন্ধ্রপ্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী চন্দ্রবাবু নাইডু ঘোষণা দেন, যেসব দম্পতি তৃতীয় সন্তান নেবেন, তাদের ৩০ হাজার রুপি আর্থিক সহায়তা দেওয়া হবে।

২০১৯ সালেও প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি “জনসংখ্যা বিস্ফোরণ” নিয়ে সতর্ক করেছিলেন। কিন্তু এখন সরকারি দৃষ্টিভঙ্গি বদলে গেছে। মোদির উপদেষ্টা সঞ্জীব সান্যালের ভাষায়, কর্মকর্তারা এখন আশঙ্কা করছেন ভারত চীনের পথেই হাঁটছে। চীনের জনসংখ্যা ২০২১ সাল থেকে কমতে শুরু করেছে।

অ্যাক্সিস ব্যাংকের প্রধান অর্থনীতিবিদ নীলকণ্ঠ মিশ্র বলেন, ভারতে জন্মহার প্রত্যাশার তুলনায় অনেক দ্রুত ও অনেক বেশি হারে কমেছে।

তামিলনাড়ু ও পশ্চিমবঙ্গে বর্তমানে টিএফআর ১.৩, যা ফিনল্যান্ডের সমান। শহুরে ভারতের গড় টিএফআর ১.৫।

ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূসকে  শুভকামনা জানালেন | দৈনিক আমার বাংলাদেশ

দীর্ঘদিন জনসংখ্যাবিদদের ধারণা ছিল, দরিদ্র উত্তরাঞ্চলীয় রাজ্যগুলো ভারতের জনমিতিক রূপান্তরকে ধীর করবে। কিন্তু এখন দেখা যাচ্ছে, সেগুলোও ধনী ও তুলনামূলক কম জনবহুল অঞ্চলের সঙ্গে দ্রুত সমতায় পৌঁছে যাচ্ছে।

কেউ কেউ জনসংখ্যা কমে যাওয়াকে আশীর্বাদ হিসেবেও দেখতে পারেন। কারণ ভারতের অবকাঠামো বহু ক্ষেত্রেই চাপের মুখে। মুম্বাইয়ের লোকাল ট্রেনে যাত্রীদের ঠাসাঠাসি তার একটি পরিচিত উদাহরণ।

তবে কম শিশুসমৃদ্ধ ভারতের ভবিষ্যৎ পুরোপুরি স্বস্তিদায়ক নয়। দেশটি ধনী হওয়ার আগেই বৃদ্ধ হয়ে যাবে। ফলে একটি কঠিন জনমিতিক রূপান্তরের মুখোমুখি হতে হবে, যার প্রভাব সমাজ, অর্থনীতি এবং রাজনীতির প্রতিটি স্তরে পড়বে।

জনসংখ্যা বৃদ্ধির দেশ থেকে জনসংখ্যা হ্রাসের পথে

ভারতের জনসংখ্যা এত বড় হওয়ার পেছনে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ রয়েছে। বিশ্বের মোট ভূমির মাত্র ২.৪ শতাংশ ভারতের দখলে থাকলেও এখানে বাস করে বিশ্বের প্রায় ১৮ শতাংশ মানুষ। উর্বর জমি, তুলনামূলক নির্ভরযোগ্য মৌসুমি বৃষ্টি এবং চিকিৎসাবিজ্ঞানের অগ্রগতি এ ক্ষেত্রে বড় ভূমিকা রেখেছে।

১৯৫০ সালে ভারতে প্রতি চারজন শিশুর একজন পাঁচ বছর বয়সের আগেই মারা যেত। ২০০০ সালে সেই হার নেমে আসে প্রতি দশজনে একজনেরও কমে। অর্থাৎ মৃত্যুহার দ্রুত কমলেও জন্মহার দীর্ঘ সময় উচ্চ অবস্থায় ছিল, ফলে জনসংখ্যা দ্রুত বেড়ে যায়।

1.4 billion and counting: How did India's population 'explode' and get so  big? | Today News

এই বাস্তবতাই একসময় ভারতকে জনসংখ্যা নিয়ে আতঙ্কের প্রতীক বানিয়েছিল। ১৯৬০-এর দশকে দিল্লির একটি বস্তি পরিদর্শনের পর মার্কিন জীববিজ্ঞানী পল এরলিখ ‘দ্য পপুলেশন বম্ব’ বই লেখেন। তিনি দাবি করেছিলেন, মানবজাতিকে খাদ্য জোগানোর লড়াই হারিয়ে গেছে এবং ভারত অনাহারে ডুবে যাবে।

তার সেই পূর্বাভাস সম্পূর্ণ ভুল প্রমাণিত হলেও ব্যাপক প্রভাব ফেলেছিল। এরই প্রভাবে ১৯৭০-এর দশকে জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণের নামে ইন্দিরা গান্ধীর সরকার প্রায় এক কোটি পুরুষকে জোরপূর্বক বন্ধ্যাকরণ করেছিল।

পরবর্তী সরকারগুলো—কংগ্রেস হোক বা বিজেপি—মূলত পরিবার পরিকল্পনা ও প্রজনন স্বাধীনতাকে সমর্থন করেছে। একই সঙ্গে ১৯৯০-এর দশক থেকে মেয়েদের শিক্ষার প্রসার এবং অর্থনৈতিক উন্নয়নের কারণে জন্মহার দ্রুত কমতে শুরু করে। দক্ষিণের কেরালা রাজ্যে, যেখানে টিএফআর ১.৩, বহু বছর ধরেই স্কুল বন্ধ হচ্ছে এবং শ্রমিক আমদানি করতে হচ্ছে। এখন দেশের অন্যান্য অংশও একই পথে এগোচ্ছে।

জাতিসংঘের পূর্বাভাস কি খুব আশাবাদী?

জাতিসংঘের ধারণা, ভারতের জনসংখ্যা ২০৬০-এর দশক পর্যন্ত বাড়বে, এরপর ধীরে ধীরে কমবে। কিন্তু এই পূর্বাভাস একটি বড় অনুমানের ওপর দাঁড়িয়ে আছে—জন্মহার শিগগিরই স্থিতিশীল হবে।

অনেক জনসংখ্যাবিদ এ ধারণার সঙ্গে একমত নন।

তাদের যুক্তি, বিশ্বের খুব কম দেশেই জন্মহার কমার পর আবার উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। তাই ভারতের ক্ষেত্রেও জন্মহার আরও নিচে নামার সম্ভাবনা বেশি।

বাংলাদেশে নির্বিচারে আটক করা নিয়ে যা বললো জাতিসংঘ | Barta Bazar

ওয়াশিংটন বিশ্ববিদ্যালয়ের ইনস্টিটিউট ফর হেলথ মেট্রিকস অ্যান্ড ইভ্যালুয়েশনের (আইএইচএমই) পূর্বাভাস অনুযায়ী, প্রায় ২১ বছরের মধ্যে ভারতের জনসংখ্যা সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছাবে। এরপর দ্রুত কমতে শুরু করবে। শতাব্দীর শেষে ভারতের জনসংখ্যা একশ কোটির কিছু বেশি থাকবে, অর্থাৎ বর্তমানের তুলনায় প্রায় ৫০ কোটি কম।

কেন এত দ্রুত কমছে জন্মহার?

বিশেষজ্ঞদের মতে, এর পেছনে সবচেয়ে বড় কারণ মেয়েদের শিক্ষা।

লন্ডন স্কুল অব ইকোনমিকসের ল্যান্ট প্রিটচেটের মতে, জন্মহার নির্ধারণে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো মেয়েদের স্কুলে যাওয়া। শিক্ষিত নারীরা সাধারণত বেশি স্বাধীন সিদ্ধান্ত নিতে পারেন এবং সময়ের সঙ্গে কম সন্তান নেওয়ার প্রবণতা গড়ে ওঠে।

ভারতের অভিজ্ঞতা আরও একটি প্রচলিত ধারণাকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে। পশ্চিমা দেশগুলোতে অনেকেই মনে করেন নারীদের কর্মজীবনে প্রবেশ বা বিয়ে দেরিতে হওয়ার কারণে জন্মহার কমে।

কিন্তু ভারতে ৯০ শতাংশের বেশি নারী বিয়ে করেন এবং মাত্র ৩৩ শতাংশ নারী কর্মজীবনে যুক্ত। তারপরও জন্মহার দ্রুত কমছে।

ভারতে একজন নারী গড়ে ১৯ বছর বয়সে বিয়ে করেন এবং ২১ বছর বয়সে প্রথম সন্তানের জন্ম দেন। অর্থাৎ দেরিতে বিয়ে বা কর্মজীবন এখানে মূল কারণ নয়।

বরং জরিপে দেখা যায়, অনেক ভারতীয় নারী বর্তমানের চেয়েও কম সন্তান চান। অনেক রাজ্যে কাঙ্ক্ষিত সন্তান সংখ্যা গড়ে ১.৫। সন্তান নেওয়া শেষ হলে অধিকাংশ নারী স্থায়ী জন্মনিয়ন্ত্রণ পদ্ধতি বেছে নেন। এটিও ইঙ্গিত দেয় যে তারা আরও সন্তান চান না।

Chennai - The Complete Travel Guide — Adventures of Jellie

‘কম কিন্তু ভালো’ সন্তানের ধারণা

ভারতীয় সমাজে এখন একটি নতুন মানসিকতা শক্তিশালী হয়েছে—কম সন্তান, কিন্তু তাদের পেছনে বেশি বিনিয়োগ।

চেন্নাইয়ের বাসিন্দা সঞ্জিনি রমণ বলেন, তিনি ও তার স্বামী সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন সব সম্পদ একটি সন্তানের পেছনেই ব্যয় করবেন। কারণ দুই সন্তান হলে সেই সম্পদ ভাগ হয়ে যাবে।

তার মেয়ের বেসরকারি স্কুল ও অতিরিক্ত কোচিংয়ের জন্য বছরে প্রায় সাড়ে তিন লাখ রুপি খরচ হয়।

জনসংখ্যাবিদরা একে বলেন “সংখ্যা বনাম মান” সমঝোতা। অর্থাৎ বেশি সন্তান নয়, বরং কম সন্তানকে ভালো শিক্ষা ও সুযোগ দেওয়ার প্রবণতা।

২০১৫ সালে ভারতের ৩১.৭ শতাংশ শিশু বেসরকারি স্কুলে পড়ত। ২০২৫ সালে সেই হার বেড়ে ৩৮.৮ শতাংশে পৌঁছেছে।

শুধু ধনী রাজ্যে নয়, বিহার ও উত্তরপ্রদেশের মতো অপেক্ষাকৃত দরিদ্র এলাকাতেও দেখা যাচ্ছে

ভারতে জন্মহার কমার পেছনে দ্বিতীয় গুরুত্বপূর্ণ কারণ হলো যৌথ পরিবার ব্যবস্থার দুর্বল হয়ে পড়া।

২০০১ সালেও ভারতের প্রায় অর্ধেক পরিবারে একসঙ্গে একাধিক প্রজন্ম বাস করত—দাদা-দাদি, বাবা-মা, সন্তান, চাচা-ফুফু, চাচাতো-মামাতো ভাইবোন সবাই একই ছাদের নিচে থাকত। কিন্তু নগরায়ণ ও শ্রমবাজারের পরিবর্তনের কারণে এখন প্রায় ৭০ শতাংশ পরিবার একক বা নিউক্লিয়ার পরিবারে পরিণত হয়েছে।

Meri Beti Nahi Beta Hai': Glorification Of Sons Over Daughters | Feminism in  India

এর ফলে শিশু লালন-পালনের দায়ভার অনেক বেশি সরাসরি বাবা-মায়ের ওপর এসে পড়েছে। স্বাভাবিকভাবেই পরিবার ছোট রাখার প্রবণতা বেড়েছে।

তবে গৃহস্থালির কাজের ভার এখনও মূলত নারীদের ওপরই রয়ে গেছে। তামিলনাড়ুর কৃষক ও দুই সন্তানের মা কবিতা কান্নান মজা করে বলেন, “আমার স্বামী কখনো কখনো নিজের প্লেট নিজেই ধুয়ে রাখেন।”

পুত্রসন্তানের প্রতি আগ্রহ কমছে

অতীতে ভারতীয় সমাজে পুত্রসন্তানের প্রতি প্রবল ঝোঁক ছিল। অনেক দম্পতি ছেলে সন্তান না হওয়া পর্যন্ত সন্তান নিতে থাকতেন। ফলে জন্মহারও তুলনামূলক বেশি থাকত।

কিন্তু এখন সেই প্রবণতা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে। তথ্য বলছে, অনেক ভারতীয় পরিবার কন্যাসন্তান নিয়েও সন্তুষ্ট। ছেলে সন্তানের জন্য বারবার সন্তান নেওয়ার প্রবণতা আগের তুলনায় অনেক দুর্বল হয়েছে।

প্রযুক্তি ও সংস্কৃতির প্রভাব

শুধু শিক্ষা বা পারিবারিক কাঠামোর পরিবর্তন নয়, সংস্কৃতিগত পরিবর্তনও জন্মহার কমাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।

কম সন্তান নেওয়া এখন অনেকের কাছে কাঙ্ক্ষিত জীবনধারা। তথ্যপ্রযুক্তি ও গণমাধ্যম এই মানসিকতাকে আরও শক্তিশালী করছে।

একটি গবেষণায় দেখা গেছে, ২০০০-এর দশকে গ্রামাঞ্চলে কেবল টেলিভিশনের বিস্তার গর্ভধারণের হার কমিয়ে দেয়। গবেষকদের মতে, টেলিভিশনের ধারাবাহিকগুলোতে ছোট পরিবারে বসবাসকারী শহুরে মধ্যবিত্ত নারীদের জীবনচিত্র মানুষকে প্রভাবিত করেছিল।

Best Tools to Keep Your Smartphone Functional

এখন স্মার্টফোনও একই ধরনের ভূমিকা পালন করতে পারে। যদিও এ বিষয়ে এখনো পর্যাপ্ত গবেষণা নেই, তবুও ধারণা করা হয় স্মার্টফোন সামাজিক ধারণা ও সাংস্কৃতিক প্রবণতা দ্রুত ছড়িয়ে দিচ্ছে।

উত্তরপ্রদেশের নাগেপুর গ্রামের নারীরা জানান, তারা নিয়মিত এমন ভিডিও দেখেন যেখানে ছোট পরিবারের সুবিধা এবং তরুণদের চাকরি খুঁজে পাওয়ার কঠিন বাস্তবতা তুলে ধরা হয়।

জনসংখ্যাবিদ এস. ইরুদায়া রাজনের মতে, কম জন্মহার অনেকটা সংক্রামক প্রবণতার মতো। তার ভাষায়, “কেরালায় যা ঘটে, শেষ পর্যন্ত তা বিহারেও পৌঁছে যায়।”

ভারত কি দক্ষিণ কোরিয়ার পথে?

কিছু জনসংখ্যাবিদ মনে করেন, ভারতে বিয়ে ও সন্তান নেওয়ার সামাজিক চাপ এখনও যথেষ্ট শক্তিশালী। তাই দক্ষিণ কোরিয়ার মতো চরম জন্মহার সংকট সম্ভবত দেখা যাবে না।

অন্যদিকে কেউ কেউ উল্টো যুক্তি দেন। তাদের মতে, এত শক্তিশালী সামাজিক রীতিনীতি থাকার পরও জন্মহার এত নিচে নেমে আসা বিস্ময়কর। আগামী দশকগুলোতে আরও বেশি ভারতীয় নারী বিয়ে ও মাতৃত্ব থেকে সরে আসতে পারেন।

যে পথই হোক না কেন, একটি বিষয় স্পষ্ট—ভারতের জনমিতিক রূপান্তর দ্রুত গতিতে এগোচ্ছে এবং এর প্রভাব হবে সুদূরপ্রসারী।

বৃদ্ধ হয়ে যাওয়ার আগেই ধনী হতে না পারার ঝুঁকি

ভারতের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো দেশটি ধনী হওয়ার আগেই দ্রুত বৃদ্ধ সমাজে পরিণত হতে পারে।

International grad student is focused on saving: 'Being rich is not a goal  in my life whatsoever' - The Globe and Mail

কেরালায় ইতোমধ্যে প্রায় পাঁচজনের একজনের বয়স ৬০ বছরের বেশি। পরিস্থিতি সামাল দিতে রাজ্য সরকার বার্ধক্য বিষয়ক একটি পৃথক বিভাগও চালু করেছে।

ভারতে সামাজিক নিরাপত্তা ব্যবস্থা এখনও সীমিত। কেরালার মতো উন্নত রাজ্যেও কর্মজীবী মানুষের মাত্র ১৯.৪ শতাংশ কোনো না কোনো পেনশন কর্মসূচির আওতায় রয়েছে। জাতীয় গড় মাত্র ১২ শতাংশ।

ফলে ভবিষ্যতে বিপুল সংখ্যক বয়স্ক নাগরিকের আর্থিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াতে পারে।

বৃদ্ধদের যত্ন ও পারিবারিক সম্পর্কের নতুন সংকট

ভারতে দীর্ঘদিন ধরে একটি প্রচলিত ধারণা ছিল—সন্তানরাই বার্ধক্যে বাবা-মায়ের দেখাশোনা করবে। কিন্তু যৌথ পরিবারের ভাঙন সেই ধারণাকে দুর্বল করে দিচ্ছে।

দক্ষিণ ভারতে এখন উন্নত দেশের আদলে বেসরকারি বৃদ্ধ নিবাস দ্রুত বাড়ছে। গ্রামীণ এলাকাতেও বয়স্কদের জন্য বিভিন্ন ধরনের কমিউনিটি-ভিত্তিক সেবা গড়ে উঠছে, যেখানে যোগব্যায়াম, আড্ডা এবং সামাজিক কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে তাদের সময় কাটানোর ব্যবস্থা করা হচ্ছে।

তবে গুরুতর অসুস্থতা, বিশেষ করে ডিমেনশিয়ার মতো রোগে আক্রান্ত বৃদ্ধদের জন্য পর্যাপ্ত সেবা এখনও দুর্লভ ও ব্যয়বহুল। ফলে অনেক পরিবার আবার বাধ্য হয়ে একসঙ্গে বসবাসের পথ বেছে নিতে পারে।

একই সঙ্গে আরেকটি উদ্বেগজনক প্রবণতাও দেখা যাচ্ছে। ভারতের বড় ধর্মীয় সমাবেশগুলোতে পরিত্যক্ত বৃদ্ধ মানুষের সংখ্যা বাড়ছে। বিশেষ করে কুম্ভমেলার মতো বিশাল ধর্মীয় অনুষ্ঠানে আত্মীয়স্বজনের দ্বারা ফেলে যাওয়া প্রবীণদের ঘটনা ক্রমশ বেশি নজরে আসছে।

অভ্যন্তরীণ অভিবাসনের প্রভাব

পারিবারিক সম্পর্কের ওপর চাপ বাড়াচ্ছে আরেকটি বড় পরিবর্তন—দেশের ভেতরে দ্রুত বাড়তে থাকা শ্রম অভিবাসন।

Southward Ho! Demographic Change, the North-South Divide and Internal  Migration in India | The India Forum

দক্ষিণ ভারতের রাজ্যগুলো বহু বছর ধরেই উত্তর ও পূর্ব ভারত থেকে আসা শ্রমিকদের ওপর নির্ভরশীল। আগে এদের বড় অংশ কাজ করত হোটেল-রেস্তোরাঁ খাতে। এখন কারখানা, সেবাখাত এবং বৃদ্ধসেবা কেন্দ্রেও তাদের চাহিদা বাড়ছে।

তামিলনাড়ুর রাজধানী চেন্নাইয়ের একটি বৃদ্ধসেবা প্রতিষ্ঠানে কর্মরত অধিকাংশ কর্মীই ওডিশা থেকে আসা তরুণী।

এই অভিবাসনের ফলে অনেক তরুণ কর্মসংস্থানের জন্য নিজ গ্রাম ছেড়ে চলে যাচ্ছে, আর গ্রামের বৃদ্ধ বাবা-মায়েরা একা পড়ে থাকছেন। এমনকি অনেক অভিভাবক এখন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নিজেদের সন্তানদের প্রকাশ্যে সমালোচনা করছেন, কারণ তারা বাবা-মায়ের খোঁজখবর রাখছেন না।

কর্মক্ষম জনগোষ্ঠীর শীর্ষে পৌঁছাবে দ্রুত

জনমিতিক পরিবর্তনের আরেকটি বড় ফল হতে পারে কর্মক্ষম জনগোষ্ঠীর দ্রুত স্থিতিশীল হয়ে যাওয়া।

বিশ্লেষকদের মতে, ভারতের কর্মক্ষম বয়সী মানুষের অনুপাত ২০৩০ সালেই সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছাতে পারে।

যদিও জনসংখ্যা বৃদ্ধ হতে থাকবে, তবু কর্মশক্তি কিছু সময় পর্যন্ত বাড়তে পারে। কারণ বর্তমানে বিপুলসংখ্যক কর্মক্ষম মানুষ আংশিক কর্মসংস্থানে আছেন বা তাদের দক্ষতার পূর্ণ ব্যবহার হচ্ছে না।

দীর্ঘমেয়াদে ভারতের অর্থনীতিকে আরও বেশি নারীকে শ্রমবাজারে যুক্ত করতে হবে। বিশেষজ্ঞদের মতে, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ধরে রাখতে এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।

Indian Politics — An Overview. Indian Politics has grown in popularity… |  by Sangeeth S | MUNner's Daily | Medium

রাজনীতিতেও বাড়ছে জনসংখ্যা নিয়ে উদ্বেগ

ভারতের রাজনীতিতে জনসংখ্যা নিয়ে বিতর্ক ইতোমধ্যেই প্রবেশ করেছে।

বিজেপি প্রায়ই হিন্দু ও মুসলিম জনসংখ্যার পার্থক্য নিয়ে আলোচনা করে। যদিও মুসলিমদের জন্মহার তুলনামূলক বেশি, সেটিও দ্রুত কমছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এই পার্থক্যের মূল কারণ ধর্ম নয়, বরং আয় ও সামাজিক অবস্থার পার্থক্য।

তারপরও চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে আরএসএস প্রধান দেশপ্রেমিক ভারতীয়দের তিন সন্তান নেওয়ার আহ্বান জানান, যাতে “জনসংখ্যার ভারসাম্য” বজায় থাকে।

উত্তর-দক্ষিণ বিভাজন কি আরও বাড়বে?

দক্ষিণ ভারতের রাজ্যগুলোর আরেকটি উদ্বেগ রয়েছে।

তাদের আশঙ্কা, জন্মহার কমে যাওয়ার কারণে ভবিষ্যতে সংসদে তাদের আসন সংখ্যা কমিয়ে দেওয়া হতে পারে। অনেক দক্ষিণ ভারতীয় রাজনীতিক মনে করেন, এতে তারা রাজনৈতিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবেন।

Andhra Pradesh CM N Chandrababu Naidu focuses on personal reforms | Andhra  Pradesh CM N Chandrababu Naidu focuses on personal reforms

অন্যদিকে অভিবাসন বৃদ্ধির কারণে স্থানীয় জনগণ ও বাইরের শ্রমিকদের মধ্যেও উত্তেজনা সৃষ্টি হতে পারে। যদিও অধিকাংশ দক্ষিণ ভারতীয় নেতা স্বীকার করেন যে অভিবাসীরা অর্থনীতিকে শক্তিশালী করছে, তবুও স্থানীয় ভাষা না জানা নতুন মানুষের আগমন নিয়ে অসন্তোষও বাড়ছে।

ফলে ভবিষ্যতে ভারতের উত্তর-দক্ষিণ বিভাজন আরও তীব্র হতে পারে বলে আশঙ্কা রয়েছে।

জনসংখ্যা বাড়াতে সরকারের চেষ্টা কতটা কার্যকর হবে?

অন্ধ্রপ্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী চন্দ্রবাবু নাইডুর মতো আরও অনেক রাজনীতিক আগামী বছরগুলোতে বেশি সন্তান নেওয়ার জন্য নানা প্রণোদনা দিতে পারেন।

কিন্তু বিশ্বের অভিজ্ঞতা বলছে, সরকারি উৎসাহ, আর্থিক অনুদান বা রাজনৈতিক আহ্বান সাধারণত জন্মহার বাড়াতে খুব বেশি কার্যকর হয় না।

জন্মহার এমন কিছু গভীর সামাজিক, অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক শক্তির দ্বারা পরিচালিত হয়, যা সরকার বা ধর্মীয় নেতাদের পক্ষে সহজে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয়।

জনসংখ্যাবিদ এস. ইরুদায়া রাজন মনে করিয়ে দেন, ভারতের জন্মহার টানা ৭০ বছর ধরে কমছে। তাই হঠাৎ করে এই প্রবণতা উল্টে যাওয়ার সম্ভাবনা খুবই কম।

অর্থাৎ ভারতের সামনে এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন আর জনসংখ্যা বিস্ফোরণ নয়। বরং প্রশ্ন হলো—দেশটি কত দ্রুত জনসংখ্যা হ্রাস, বার্ধক্য এবং তার অর্থনৈতিক-সামাজিক প্রভাবের মুখোমুখি হবে।

জনপ্রিয় সংবাদ

কেমোথেরাপির পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ায় মানসিক সক্ষমতা ধরে রাখতে ব্যায়াম হতে পারে কার্যকর: নতুন গবেষণা

ইকোনমিস্টের প্রতিবেদনঃ ভারতের জনসংখ্যা দ্রুতগতিতে কমতে শুরু করবে 

০৪:০০:৩৮ অপরাহ্ন, বুধবার, ১০ জুন ২০২৬

১৯৭০-এর দশকে দিল্লির যে বিশাল বস্তিতে পারুল গায়েন বাস করতেন, সেখানে শিশুদের ভিড় ছিল চোখে পড়ার মতো। তখন তার মায়ের ছয় ভাইবোন বা দাদার ১১ সন্তানের পরিবার অস্বাভাবিক কিছু ছিল না। স্বপন, যাকে তিনি প্রায়ই সাইকেলে কাজে যেতে দেখতেন এবং পরে মাত্র ১৬ বছর বয়সে বিয়ে করেন, তারও ছিল ছয় ভাইবোন—সপ্তম সন্তানটি শৈশবেই মারা যায়।

কিন্তু সময় বদলেছে। বর্তমানে ৫৮ বছর বয়সী পারুল গায়েন স্বপনের সঙ্গে কাছাকাছি একটি এক কক্ষের ফ্ল্যাটে থাকেন। তাদের তিন সন্তানের মধ্যে মাত্র দুজন সন্তান নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে, আর দুজনই থেমেছে এক সন্তানেই।

পারুল বলেন, “একটা সন্তান একটু একাকী লাগে।”

১৯৫০ সালে ভারতের জনসংখ্যা ছিল ৩৬ কোটি। তখন গড়ে একজন ভারতীয় নারীর ছয়টি সন্তান হতো—যা এক শতাব্দী আগে একজন আমেরিকান নারীর সন্তান সংখ্যার কাছাকাছি ছিল। আজ ভারতের জনসংখ্যা ১৪৫ কোটিতে পৌঁছেছে, যা বিশ্বের মোট জনসংখ্যার প্রায় এক-ষষ্ঠাংশ। ২০২৩ সালে ভারত চীনকে ছাড়িয়ে বিশ্বের সবচেয়ে জনবহুল দেশে পরিণত হয় এবং এরপরও জনসংখ্যা বাড়তে থাকে।

তবে এখন ভারতের মোট প্রজনন হার (টিএফআর)—অর্থাৎ একজন নারী জীবদ্দশায় গড়ে যত সন্তান জন্ম দেন—নেমে এসেছে ১.৯-এ। দীর্ঘমেয়াদে জনসংখ্যা স্থিতিশীল রাখতে যে হার প্রয়োজন, তার নিচে অবস্থান করছে এই সংখ্যা। ফলে বর্তমান শিশু প্রজন্ম বড় হয়ে সন্তান ধারণ শুরু করা পর্যন্ত জনসংখ্যা কিছুদিন বাড়লেও, ভবিষ্যতে জনসংখ্যা হ্রাস প্রায় অবশ্যম্ভাবী, যদি না প্রজনন হার আবার ২.১৫-এর ওপরে উঠে আসে।

বাস্তবে প্রজনন হার আরও কমার সম্ভাবনাই বেশি, যা জনসংখ্যা সংকোচনের গতি বাড়াবে। উদাহরণ হিসেবে দিল্লিতে বর্তমানে টিএফআর মাত্র ১.২।

India's Fertility Rate Falls Below Replacement Level for First Time,  Signals Major Demographic Shift - Pragativadi I Latest Odisha News in  English I Breaking News

কমে যাচ্ছে জন্মহার

উন্নত দেশ এবং বহু মধ্যম আয়ের দেশ ইতোমধ্যেই জন্মহার হ্রাস, কর্মক্ষম জনগোষ্ঠীর সংকোচন এবং জনসংখ্যা কমে যাওয়ার আশঙ্কায় উদ্বিগ্ন। অনেক সরকার মানুষকে বেশি সন্তান নিতে উৎসাহিত করতে নানা প্রণোদনা বা ভর্তুকি দিলেও তেমন সাফল্য পায়নি।

একসময় দ্রুত জনসংখ্যা বৃদ্ধির জন্য উদ্বেগের কেন্দ্র ছিল ভারত। এখন সেই ভারতও একই বাস্তবতার মুখোমুখি। এ গ্রীষ্মে প্রকাশিত হতে যাওয়া নতুন স্কুল পাঠ্যবইয়ে অতিরিক্ত জনসংখ্যার বদলে খুব কম সন্তান জন্মের ঝুঁকি নিয়ে সতর্ক করা হবে।

মে মাসে দক্ষিণ ভারতের অন্ধ্রপ্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী চন্দ্রবাবু নাইডু ঘোষণা দেন, যেসব দম্পতি তৃতীয় সন্তান নেবেন, তাদের ৩০ হাজার রুপি আর্থিক সহায়তা দেওয়া হবে।

২০১৯ সালেও প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি “জনসংখ্যা বিস্ফোরণ” নিয়ে সতর্ক করেছিলেন। কিন্তু এখন সরকারি দৃষ্টিভঙ্গি বদলে গেছে। মোদির উপদেষ্টা সঞ্জীব সান্যালের ভাষায়, কর্মকর্তারা এখন আশঙ্কা করছেন ভারত চীনের পথেই হাঁটছে। চীনের জনসংখ্যা ২০২১ সাল থেকে কমতে শুরু করেছে।

অ্যাক্সিস ব্যাংকের প্রধান অর্থনীতিবিদ নীলকণ্ঠ মিশ্র বলেন, ভারতে জন্মহার প্রত্যাশার তুলনায় অনেক দ্রুত ও অনেক বেশি হারে কমেছে।

তামিলনাড়ু ও পশ্চিমবঙ্গে বর্তমানে টিএফআর ১.৩, যা ফিনল্যান্ডের সমান। শহুরে ভারতের গড় টিএফআর ১.৫।

ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূসকে  শুভকামনা জানালেন | দৈনিক আমার বাংলাদেশ

দীর্ঘদিন জনসংখ্যাবিদদের ধারণা ছিল, দরিদ্র উত্তরাঞ্চলীয় রাজ্যগুলো ভারতের জনমিতিক রূপান্তরকে ধীর করবে। কিন্তু এখন দেখা যাচ্ছে, সেগুলোও ধনী ও তুলনামূলক কম জনবহুল অঞ্চলের সঙ্গে দ্রুত সমতায় পৌঁছে যাচ্ছে।

কেউ কেউ জনসংখ্যা কমে যাওয়াকে আশীর্বাদ হিসেবেও দেখতে পারেন। কারণ ভারতের অবকাঠামো বহু ক্ষেত্রেই চাপের মুখে। মুম্বাইয়ের লোকাল ট্রেনে যাত্রীদের ঠাসাঠাসি তার একটি পরিচিত উদাহরণ।

তবে কম শিশুসমৃদ্ধ ভারতের ভবিষ্যৎ পুরোপুরি স্বস্তিদায়ক নয়। দেশটি ধনী হওয়ার আগেই বৃদ্ধ হয়ে যাবে। ফলে একটি কঠিন জনমিতিক রূপান্তরের মুখোমুখি হতে হবে, যার প্রভাব সমাজ, অর্থনীতি এবং রাজনীতির প্রতিটি স্তরে পড়বে।

জনসংখ্যা বৃদ্ধির দেশ থেকে জনসংখ্যা হ্রাসের পথে

ভারতের জনসংখ্যা এত বড় হওয়ার পেছনে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ রয়েছে। বিশ্বের মোট ভূমির মাত্র ২.৪ শতাংশ ভারতের দখলে থাকলেও এখানে বাস করে বিশ্বের প্রায় ১৮ শতাংশ মানুষ। উর্বর জমি, তুলনামূলক নির্ভরযোগ্য মৌসুমি বৃষ্টি এবং চিকিৎসাবিজ্ঞানের অগ্রগতি এ ক্ষেত্রে বড় ভূমিকা রেখেছে।

১৯৫০ সালে ভারতে প্রতি চারজন শিশুর একজন পাঁচ বছর বয়সের আগেই মারা যেত। ২০০০ সালে সেই হার নেমে আসে প্রতি দশজনে একজনেরও কমে। অর্থাৎ মৃত্যুহার দ্রুত কমলেও জন্মহার দীর্ঘ সময় উচ্চ অবস্থায় ছিল, ফলে জনসংখ্যা দ্রুত বেড়ে যায়।

1.4 billion and counting: How did India's population 'explode' and get so  big? | Today News

এই বাস্তবতাই একসময় ভারতকে জনসংখ্যা নিয়ে আতঙ্কের প্রতীক বানিয়েছিল। ১৯৬০-এর দশকে দিল্লির একটি বস্তি পরিদর্শনের পর মার্কিন জীববিজ্ঞানী পল এরলিখ ‘দ্য পপুলেশন বম্ব’ বই লেখেন। তিনি দাবি করেছিলেন, মানবজাতিকে খাদ্য জোগানোর লড়াই হারিয়ে গেছে এবং ভারত অনাহারে ডুবে যাবে।

তার সেই পূর্বাভাস সম্পূর্ণ ভুল প্রমাণিত হলেও ব্যাপক প্রভাব ফেলেছিল। এরই প্রভাবে ১৯৭০-এর দশকে জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণের নামে ইন্দিরা গান্ধীর সরকার প্রায় এক কোটি পুরুষকে জোরপূর্বক বন্ধ্যাকরণ করেছিল।

পরবর্তী সরকারগুলো—কংগ্রেস হোক বা বিজেপি—মূলত পরিবার পরিকল্পনা ও প্রজনন স্বাধীনতাকে সমর্থন করেছে। একই সঙ্গে ১৯৯০-এর দশক থেকে মেয়েদের শিক্ষার প্রসার এবং অর্থনৈতিক উন্নয়নের কারণে জন্মহার দ্রুত কমতে শুরু করে। দক্ষিণের কেরালা রাজ্যে, যেখানে টিএফআর ১.৩, বহু বছর ধরেই স্কুল বন্ধ হচ্ছে এবং শ্রমিক আমদানি করতে হচ্ছে। এখন দেশের অন্যান্য অংশও একই পথে এগোচ্ছে।

জাতিসংঘের পূর্বাভাস কি খুব আশাবাদী?

জাতিসংঘের ধারণা, ভারতের জনসংখ্যা ২০৬০-এর দশক পর্যন্ত বাড়বে, এরপর ধীরে ধীরে কমবে। কিন্তু এই পূর্বাভাস একটি বড় অনুমানের ওপর দাঁড়িয়ে আছে—জন্মহার শিগগিরই স্থিতিশীল হবে।

অনেক জনসংখ্যাবিদ এ ধারণার সঙ্গে একমত নন।

তাদের যুক্তি, বিশ্বের খুব কম দেশেই জন্মহার কমার পর আবার উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। তাই ভারতের ক্ষেত্রেও জন্মহার আরও নিচে নামার সম্ভাবনা বেশি।

বাংলাদেশে নির্বিচারে আটক করা নিয়ে যা বললো জাতিসংঘ | Barta Bazar

ওয়াশিংটন বিশ্ববিদ্যালয়ের ইনস্টিটিউট ফর হেলথ মেট্রিকস অ্যান্ড ইভ্যালুয়েশনের (আইএইচএমই) পূর্বাভাস অনুযায়ী, প্রায় ২১ বছরের মধ্যে ভারতের জনসংখ্যা সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছাবে। এরপর দ্রুত কমতে শুরু করবে। শতাব্দীর শেষে ভারতের জনসংখ্যা একশ কোটির কিছু বেশি থাকবে, অর্থাৎ বর্তমানের তুলনায় প্রায় ৫০ কোটি কম।

কেন এত দ্রুত কমছে জন্মহার?

বিশেষজ্ঞদের মতে, এর পেছনে সবচেয়ে বড় কারণ মেয়েদের শিক্ষা।

লন্ডন স্কুল অব ইকোনমিকসের ল্যান্ট প্রিটচেটের মতে, জন্মহার নির্ধারণে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো মেয়েদের স্কুলে যাওয়া। শিক্ষিত নারীরা সাধারণত বেশি স্বাধীন সিদ্ধান্ত নিতে পারেন এবং সময়ের সঙ্গে কম সন্তান নেওয়ার প্রবণতা গড়ে ওঠে।

ভারতের অভিজ্ঞতা আরও একটি প্রচলিত ধারণাকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে। পশ্চিমা দেশগুলোতে অনেকেই মনে করেন নারীদের কর্মজীবনে প্রবেশ বা বিয়ে দেরিতে হওয়ার কারণে জন্মহার কমে।

কিন্তু ভারতে ৯০ শতাংশের বেশি নারী বিয়ে করেন এবং মাত্র ৩৩ শতাংশ নারী কর্মজীবনে যুক্ত। তারপরও জন্মহার দ্রুত কমছে।

ভারতে একজন নারী গড়ে ১৯ বছর বয়সে বিয়ে করেন এবং ২১ বছর বয়সে প্রথম সন্তানের জন্ম দেন। অর্থাৎ দেরিতে বিয়ে বা কর্মজীবন এখানে মূল কারণ নয়।

বরং জরিপে দেখা যায়, অনেক ভারতীয় নারী বর্তমানের চেয়েও কম সন্তান চান। অনেক রাজ্যে কাঙ্ক্ষিত সন্তান সংখ্যা গড়ে ১.৫। সন্তান নেওয়া শেষ হলে অধিকাংশ নারী স্থায়ী জন্মনিয়ন্ত্রণ পদ্ধতি বেছে নেন। এটিও ইঙ্গিত দেয় যে তারা আরও সন্তান চান না।

Chennai - The Complete Travel Guide — Adventures of Jellie

‘কম কিন্তু ভালো’ সন্তানের ধারণা

ভারতীয় সমাজে এখন একটি নতুন মানসিকতা শক্তিশালী হয়েছে—কম সন্তান, কিন্তু তাদের পেছনে বেশি বিনিয়োগ।

চেন্নাইয়ের বাসিন্দা সঞ্জিনি রমণ বলেন, তিনি ও তার স্বামী সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন সব সম্পদ একটি সন্তানের পেছনেই ব্যয় করবেন। কারণ দুই সন্তান হলে সেই সম্পদ ভাগ হয়ে যাবে।

তার মেয়ের বেসরকারি স্কুল ও অতিরিক্ত কোচিংয়ের জন্য বছরে প্রায় সাড়ে তিন লাখ রুপি খরচ হয়।

জনসংখ্যাবিদরা একে বলেন “সংখ্যা বনাম মান” সমঝোতা। অর্থাৎ বেশি সন্তান নয়, বরং কম সন্তানকে ভালো শিক্ষা ও সুযোগ দেওয়ার প্রবণতা।

২০১৫ সালে ভারতের ৩১.৭ শতাংশ শিশু বেসরকারি স্কুলে পড়ত। ২০২৫ সালে সেই হার বেড়ে ৩৮.৮ শতাংশে পৌঁছেছে।

শুধু ধনী রাজ্যে নয়, বিহার ও উত্তরপ্রদেশের মতো অপেক্ষাকৃত দরিদ্র এলাকাতেও দেখা যাচ্ছে

ভারতে জন্মহার কমার পেছনে দ্বিতীয় গুরুত্বপূর্ণ কারণ হলো যৌথ পরিবার ব্যবস্থার দুর্বল হয়ে পড়া।

২০০১ সালেও ভারতের প্রায় অর্ধেক পরিবারে একসঙ্গে একাধিক প্রজন্ম বাস করত—দাদা-দাদি, বাবা-মা, সন্তান, চাচা-ফুফু, চাচাতো-মামাতো ভাইবোন সবাই একই ছাদের নিচে থাকত। কিন্তু নগরায়ণ ও শ্রমবাজারের পরিবর্তনের কারণে এখন প্রায় ৭০ শতাংশ পরিবার একক বা নিউক্লিয়ার পরিবারে পরিণত হয়েছে।

Meri Beti Nahi Beta Hai': Glorification Of Sons Over Daughters | Feminism in  India

এর ফলে শিশু লালন-পালনের দায়ভার অনেক বেশি সরাসরি বাবা-মায়ের ওপর এসে পড়েছে। স্বাভাবিকভাবেই পরিবার ছোট রাখার প্রবণতা বেড়েছে।

তবে গৃহস্থালির কাজের ভার এখনও মূলত নারীদের ওপরই রয়ে গেছে। তামিলনাড়ুর কৃষক ও দুই সন্তানের মা কবিতা কান্নান মজা করে বলেন, “আমার স্বামী কখনো কখনো নিজের প্লেট নিজেই ধুয়ে রাখেন।”

পুত্রসন্তানের প্রতি আগ্রহ কমছে

অতীতে ভারতীয় সমাজে পুত্রসন্তানের প্রতি প্রবল ঝোঁক ছিল। অনেক দম্পতি ছেলে সন্তান না হওয়া পর্যন্ত সন্তান নিতে থাকতেন। ফলে জন্মহারও তুলনামূলক বেশি থাকত।

কিন্তু এখন সেই প্রবণতা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে। তথ্য বলছে, অনেক ভারতীয় পরিবার কন্যাসন্তান নিয়েও সন্তুষ্ট। ছেলে সন্তানের জন্য বারবার সন্তান নেওয়ার প্রবণতা আগের তুলনায় অনেক দুর্বল হয়েছে।

প্রযুক্তি ও সংস্কৃতির প্রভাব

শুধু শিক্ষা বা পারিবারিক কাঠামোর পরিবর্তন নয়, সংস্কৃতিগত পরিবর্তনও জন্মহার কমাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।

কম সন্তান নেওয়া এখন অনেকের কাছে কাঙ্ক্ষিত জীবনধারা। তথ্যপ্রযুক্তি ও গণমাধ্যম এই মানসিকতাকে আরও শক্তিশালী করছে।

একটি গবেষণায় দেখা গেছে, ২০০০-এর দশকে গ্রামাঞ্চলে কেবল টেলিভিশনের বিস্তার গর্ভধারণের হার কমিয়ে দেয়। গবেষকদের মতে, টেলিভিশনের ধারাবাহিকগুলোতে ছোট পরিবারে বসবাসকারী শহুরে মধ্যবিত্ত নারীদের জীবনচিত্র মানুষকে প্রভাবিত করেছিল।

Best Tools to Keep Your Smartphone Functional

এখন স্মার্টফোনও একই ধরনের ভূমিকা পালন করতে পারে। যদিও এ বিষয়ে এখনো পর্যাপ্ত গবেষণা নেই, তবুও ধারণা করা হয় স্মার্টফোন সামাজিক ধারণা ও সাংস্কৃতিক প্রবণতা দ্রুত ছড়িয়ে দিচ্ছে।

উত্তরপ্রদেশের নাগেপুর গ্রামের নারীরা জানান, তারা নিয়মিত এমন ভিডিও দেখেন যেখানে ছোট পরিবারের সুবিধা এবং তরুণদের চাকরি খুঁজে পাওয়ার কঠিন বাস্তবতা তুলে ধরা হয়।

জনসংখ্যাবিদ এস. ইরুদায়া রাজনের মতে, কম জন্মহার অনেকটা সংক্রামক প্রবণতার মতো। তার ভাষায়, “কেরালায় যা ঘটে, শেষ পর্যন্ত তা বিহারেও পৌঁছে যায়।”

ভারত কি দক্ষিণ কোরিয়ার পথে?

কিছু জনসংখ্যাবিদ মনে করেন, ভারতে বিয়ে ও সন্তান নেওয়ার সামাজিক চাপ এখনও যথেষ্ট শক্তিশালী। তাই দক্ষিণ কোরিয়ার মতো চরম জন্মহার সংকট সম্ভবত দেখা যাবে না।

অন্যদিকে কেউ কেউ উল্টো যুক্তি দেন। তাদের মতে, এত শক্তিশালী সামাজিক রীতিনীতি থাকার পরও জন্মহার এত নিচে নেমে আসা বিস্ময়কর। আগামী দশকগুলোতে আরও বেশি ভারতীয় নারী বিয়ে ও মাতৃত্ব থেকে সরে আসতে পারেন।

যে পথই হোক না কেন, একটি বিষয় স্পষ্ট—ভারতের জনমিতিক রূপান্তর দ্রুত গতিতে এগোচ্ছে এবং এর প্রভাব হবে সুদূরপ্রসারী।

বৃদ্ধ হয়ে যাওয়ার আগেই ধনী হতে না পারার ঝুঁকি

ভারতের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো দেশটি ধনী হওয়ার আগেই দ্রুত বৃদ্ধ সমাজে পরিণত হতে পারে।

International grad student is focused on saving: 'Being rich is not a goal  in my life whatsoever' - The Globe and Mail

কেরালায় ইতোমধ্যে প্রায় পাঁচজনের একজনের বয়স ৬০ বছরের বেশি। পরিস্থিতি সামাল দিতে রাজ্য সরকার বার্ধক্য বিষয়ক একটি পৃথক বিভাগও চালু করেছে।

ভারতে সামাজিক নিরাপত্তা ব্যবস্থা এখনও সীমিত। কেরালার মতো উন্নত রাজ্যেও কর্মজীবী মানুষের মাত্র ১৯.৪ শতাংশ কোনো না কোনো পেনশন কর্মসূচির আওতায় রয়েছে। জাতীয় গড় মাত্র ১২ শতাংশ।

ফলে ভবিষ্যতে বিপুল সংখ্যক বয়স্ক নাগরিকের আর্থিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াতে পারে।

বৃদ্ধদের যত্ন ও পারিবারিক সম্পর্কের নতুন সংকট

ভারতে দীর্ঘদিন ধরে একটি প্রচলিত ধারণা ছিল—সন্তানরাই বার্ধক্যে বাবা-মায়ের দেখাশোনা করবে। কিন্তু যৌথ পরিবারের ভাঙন সেই ধারণাকে দুর্বল করে দিচ্ছে।

দক্ষিণ ভারতে এখন উন্নত দেশের আদলে বেসরকারি বৃদ্ধ নিবাস দ্রুত বাড়ছে। গ্রামীণ এলাকাতেও বয়স্কদের জন্য বিভিন্ন ধরনের কমিউনিটি-ভিত্তিক সেবা গড়ে উঠছে, যেখানে যোগব্যায়াম, আড্ডা এবং সামাজিক কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে তাদের সময় কাটানোর ব্যবস্থা করা হচ্ছে।

তবে গুরুতর অসুস্থতা, বিশেষ করে ডিমেনশিয়ার মতো রোগে আক্রান্ত বৃদ্ধদের জন্য পর্যাপ্ত সেবা এখনও দুর্লভ ও ব্যয়বহুল। ফলে অনেক পরিবার আবার বাধ্য হয়ে একসঙ্গে বসবাসের পথ বেছে নিতে পারে।

একই সঙ্গে আরেকটি উদ্বেগজনক প্রবণতাও দেখা যাচ্ছে। ভারতের বড় ধর্মীয় সমাবেশগুলোতে পরিত্যক্ত বৃদ্ধ মানুষের সংখ্যা বাড়ছে। বিশেষ করে কুম্ভমেলার মতো বিশাল ধর্মীয় অনুষ্ঠানে আত্মীয়স্বজনের দ্বারা ফেলে যাওয়া প্রবীণদের ঘটনা ক্রমশ বেশি নজরে আসছে।

অভ্যন্তরীণ অভিবাসনের প্রভাব

পারিবারিক সম্পর্কের ওপর চাপ বাড়াচ্ছে আরেকটি বড় পরিবর্তন—দেশের ভেতরে দ্রুত বাড়তে থাকা শ্রম অভিবাসন।

Southward Ho! Demographic Change, the North-South Divide and Internal  Migration in India | The India Forum

দক্ষিণ ভারতের রাজ্যগুলো বহু বছর ধরেই উত্তর ও পূর্ব ভারত থেকে আসা শ্রমিকদের ওপর নির্ভরশীল। আগে এদের বড় অংশ কাজ করত হোটেল-রেস্তোরাঁ খাতে। এখন কারখানা, সেবাখাত এবং বৃদ্ধসেবা কেন্দ্রেও তাদের চাহিদা বাড়ছে।

তামিলনাড়ুর রাজধানী চেন্নাইয়ের একটি বৃদ্ধসেবা প্রতিষ্ঠানে কর্মরত অধিকাংশ কর্মীই ওডিশা থেকে আসা তরুণী।

এই অভিবাসনের ফলে অনেক তরুণ কর্মসংস্থানের জন্য নিজ গ্রাম ছেড়ে চলে যাচ্ছে, আর গ্রামের বৃদ্ধ বাবা-মায়েরা একা পড়ে থাকছেন। এমনকি অনেক অভিভাবক এখন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নিজেদের সন্তানদের প্রকাশ্যে সমালোচনা করছেন, কারণ তারা বাবা-মায়ের খোঁজখবর রাখছেন না।

কর্মক্ষম জনগোষ্ঠীর শীর্ষে পৌঁছাবে দ্রুত

জনমিতিক পরিবর্তনের আরেকটি বড় ফল হতে পারে কর্মক্ষম জনগোষ্ঠীর দ্রুত স্থিতিশীল হয়ে যাওয়া।

বিশ্লেষকদের মতে, ভারতের কর্মক্ষম বয়সী মানুষের অনুপাত ২০৩০ সালেই সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছাতে পারে।

যদিও জনসংখ্যা বৃদ্ধ হতে থাকবে, তবু কর্মশক্তি কিছু সময় পর্যন্ত বাড়তে পারে। কারণ বর্তমানে বিপুলসংখ্যক কর্মক্ষম মানুষ আংশিক কর্মসংস্থানে আছেন বা তাদের দক্ষতার পূর্ণ ব্যবহার হচ্ছে না।

দীর্ঘমেয়াদে ভারতের অর্থনীতিকে আরও বেশি নারীকে শ্রমবাজারে যুক্ত করতে হবে। বিশেষজ্ঞদের মতে, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ধরে রাখতে এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।

Indian Politics — An Overview. Indian Politics has grown in popularity… |  by Sangeeth S | MUNner's Daily | Medium

রাজনীতিতেও বাড়ছে জনসংখ্যা নিয়ে উদ্বেগ

ভারতের রাজনীতিতে জনসংখ্যা নিয়ে বিতর্ক ইতোমধ্যেই প্রবেশ করেছে।

বিজেপি প্রায়ই হিন্দু ও মুসলিম জনসংখ্যার পার্থক্য নিয়ে আলোচনা করে। যদিও মুসলিমদের জন্মহার তুলনামূলক বেশি, সেটিও দ্রুত কমছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এই পার্থক্যের মূল কারণ ধর্ম নয়, বরং আয় ও সামাজিক অবস্থার পার্থক্য।

তারপরও চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে আরএসএস প্রধান দেশপ্রেমিক ভারতীয়দের তিন সন্তান নেওয়ার আহ্বান জানান, যাতে “জনসংখ্যার ভারসাম্য” বজায় থাকে।

উত্তর-দক্ষিণ বিভাজন কি আরও বাড়বে?

দক্ষিণ ভারতের রাজ্যগুলোর আরেকটি উদ্বেগ রয়েছে।

তাদের আশঙ্কা, জন্মহার কমে যাওয়ার কারণে ভবিষ্যতে সংসদে তাদের আসন সংখ্যা কমিয়ে দেওয়া হতে পারে। অনেক দক্ষিণ ভারতীয় রাজনীতিক মনে করেন, এতে তারা রাজনৈতিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবেন।

Andhra Pradesh CM N Chandrababu Naidu focuses on personal reforms | Andhra  Pradesh CM N Chandrababu Naidu focuses on personal reforms

অন্যদিকে অভিবাসন বৃদ্ধির কারণে স্থানীয় জনগণ ও বাইরের শ্রমিকদের মধ্যেও উত্তেজনা সৃষ্টি হতে পারে। যদিও অধিকাংশ দক্ষিণ ভারতীয় নেতা স্বীকার করেন যে অভিবাসীরা অর্থনীতিকে শক্তিশালী করছে, তবুও স্থানীয় ভাষা না জানা নতুন মানুষের আগমন নিয়ে অসন্তোষও বাড়ছে।

ফলে ভবিষ্যতে ভারতের উত্তর-দক্ষিণ বিভাজন আরও তীব্র হতে পারে বলে আশঙ্কা রয়েছে।

জনসংখ্যা বাড়াতে সরকারের চেষ্টা কতটা কার্যকর হবে?

অন্ধ্রপ্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী চন্দ্রবাবু নাইডুর মতো আরও অনেক রাজনীতিক আগামী বছরগুলোতে বেশি সন্তান নেওয়ার জন্য নানা প্রণোদনা দিতে পারেন।

কিন্তু বিশ্বের অভিজ্ঞতা বলছে, সরকারি উৎসাহ, আর্থিক অনুদান বা রাজনৈতিক আহ্বান সাধারণত জন্মহার বাড়াতে খুব বেশি কার্যকর হয় না।

জন্মহার এমন কিছু গভীর সামাজিক, অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক শক্তির দ্বারা পরিচালিত হয়, যা সরকার বা ধর্মীয় নেতাদের পক্ষে সহজে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয়।

জনসংখ্যাবিদ এস. ইরুদায়া রাজন মনে করিয়ে দেন, ভারতের জন্মহার টানা ৭০ বছর ধরে কমছে। তাই হঠাৎ করে এই প্রবণতা উল্টে যাওয়ার সম্ভাবনা খুবই কম।

অর্থাৎ ভারতের সামনে এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন আর জনসংখ্যা বিস্ফোরণ নয়। বরং প্রশ্ন হলো—দেশটি কত দ্রুত জনসংখ্যা হ্রাস, বার্ধক্য এবং তার অর্থনৈতিক-সামাজিক প্রভাবের মুখোমুখি হবে।