২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার জাতীয় বাজেট সংসদে উপস্থাপনের আগে দেশের অর্থনীতিবিদ ও আর্থিক খাতের বিশেষজ্ঞরা সরকারের প্রতি অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ও পুনরুদ্ধারকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। তাদের মতে, উচ্চাভিলাষী প্রবৃদ্ধি লক্ষ্যমাত্রার আগে অর্থনীতিকে স্থিতিশীল ভিত্তির ওপর দাঁড় করানো জরুরি।
বর্তমানে বাংলাদেশ অর্থনীতি উচ্চ মূল্যস্ফীতি, চাপে থাকা ব্যাংকিং খাত, দুর্বল বেসরকারি বিনিয়োগ এবং দীর্ঘদিনের আর্থিক অনিয়মের প্রভাব মোকাবিলা করছে। অন্তর্বর্তী প্রশাসনের সময় প্রায় ৫০০ কারখানা বন্ধ হয়ে গেছে এবং প্রত্যাশিত মাত্রায় বিদেশি বিনিয়োগও আসেনি। এই পরিস্থিতিতে বিশেষজ্ঞদের বড় অংশ মনে করছেন, আগামী বাজেটের মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার।
কাঠামোগত সংস্কারের ওপর গুরুত্ব
অর্থনীতিবিদদের মতে, প্রবৃদ্ধির সংখ্যা বাড়ানোর চেয়ে অর্থনীতির মৌলিক দুর্বলতাগুলো দূর করা এখন বেশি প্রয়োজন। ব্যাংকিং খাতের সংস্কার, বিনিয়োগ অবকাঠামোর উন্নয়ন এবং বন্দর ব্যবস্থাপনায় দক্ষতা বাড়ানোর মতো বিষয়গুলো বাজেটে স্পষ্টভাবে প্রতিফলিত হওয়া উচিত।
এছাড়া স্বল্পোন্নত দেশের তালিকা থেকে বাংলাদেশের উত্তরণের পরবর্তী সময়ের জন্য একটি সুস্পষ্ট রোডম্যাপও বাজেটে থাকা প্রয়োজন বলে মত দিয়েছেন তারা।
আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর সতর্কতা
বিশ্বব্যাংক ও আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল বাংলাদেশের অর্থনীতি নিয়ে সাম্প্রতিক মূল্যায়নে উচ্চ মূল্যস্ফীতি, রাজস্ব আহরণে দুর্বলতা, সংকটাপন্ন ব্যাংকিং খাত এবং অস্থির বেসরকারি বিনিয়োগকে প্রধান ঝুঁকি হিসেবে চিহ্নিত করেছে। একই সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি কাঠামোগত সংস্কার পরিকল্পনা গ্রহণের পরামর্শ দিয়েছে সংস্থাগুলো।
সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচির চ্যালেঞ্জ
অর্থনীতিবিদরা মনে করেন, সরকারের প্রস্তাবিত পরিবার কার্ড ও কৃষক কার্ডের মতো সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি বাস্তবায়নের জন্য শক্তিশালী আর্থিক ভিত্তি প্রয়োজন। অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ও সুশাসন নিশ্চিত না হলে এসব উদ্যোগের প্রকৃত সুবিধাভোগীরা প্রত্যাশিত সুফল পাবেন না।
ঋণনির্ভর বাজেট নিয়ে উদ্বেগ
প্রস্তাবিত বাজেট ঘাটতি মেটাতে সরকার প্রায় আড়াই লাখ কোটি টাকা ঋণ নেওয়ার পরিকল্পনা করেছে। এর মধ্যে প্রায় ১ লাখ ৩৫ হাজার কোটি টাকা আসবে দেশের ব্যাংক খাত থেকে। বিশেষজ্ঞদের মতে, ব্যাংকঋণের ওপর এত বেশি নির্ভরতা আর্থিক খাতের ওপর নতুন চাপ তৈরি করতে পারে।
তারা বিকল্প অর্থায়ন ব্যবস্থার উন্নয়নের ওপর জোর দিয়েছেন। বিশেষ করে পুঁজিবাজার ও বন্ড বাজারকে শক্তিশালী করার পাশাপাশি সম্পদ সিকিউরিটাইজেশনের মতো পদ্ধতি ব্যবহারের পরামর্শ দিয়েছেন। একই সঙ্গে বড় বড় কোম্পানি কেন বাংলাদেশে ব্যবসা সম্প্রসারণে অনাগ্রহী বা সমস্যার মুখে পড়ছে, সেটিও গুরুত্ব দিয়ে বিশ্লেষণের আহ্বান জানানো হয়েছে।
এক ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতির পথে
সরকার ২০৩৪ সালের মধ্যে বাংলাদেশকে এক ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতিতে রূপান্তরের লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে। তবে অর্থনীতিবিদদের মতে, এই লক্ষ্য অর্জনের জন্য ধারাবাহিকভাবে অন্তত ৭ শতাংশ জিডিপি প্রবৃদ্ধি প্রয়োজন।
তাদের মতে, বর্তমানে প্রায় ১৫ শতাংশ ঋণসুদের পরিবেশে নতুন বিনিয়োগ আকৃষ্ট করা কঠিন। সুদের হার কমানো এবং বেসরকারি খাতকে সক্রিয় না করতে পারলে উচ্চাভিলাষী লক্ষ্য অর্জন সম্ভব হবে না।
ব্যাংকিং খাতে আস্থা সংকট
বিশেষজ্ঞরা আরও মনে করেন, দেশের আর্থিক ব্যবস্থার অন্যতম বড় সমস্যা এখন জনআস্থার সংকট। ব্যাংক থেকে অর্থ আত্মসাৎ ও আমানতকারীদের অর্থ উত্তোলনে জটিলতা মানুষের মধ্যে অনিশ্চয়তা তৈরি করেছে। এই আস্থা পুনর্গঠন ছাড়া অর্থনীতির স্থায়ী পুনরুদ্ধার সম্ভব নয়।
অর্থনীতিবিদদের অভিন্ন মত হলো, ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে অতিরিক্ত আশাবাদী লক্ষ্য নির্ধারণের পরিবর্তে অর্থনীতিকে স্থিতিশীল ও পুনরুদ্ধারের পথে ফিরিয়ে আনার বাস্তবভিত্তিক পরিকল্পনা থাকা উচিত। তাদের বিশ্বাস, পুনরুদ্ধারমুখী একটি বাজেট আগামী বছরগুলোতে টেকসই প্রবৃদ্ধির ভিত্তি তৈরি করতে পারে।
#বাজেট২০২৬_২৭ #বাংলাদেশঅর্থনীতি #জাতীয়বাজেট #অর্থনীতি #মূল্যস্ফীতি #ব্যাংকখাত #বিনিয়োগ #রাজস্বনীতি #বাংলাদেশ #সারাক্ষণ
সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















