০৫:০৩ অপরাহ্ন, বুধবার, ১০ জুন ২০২৬
কেমোথেরাপির পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ায় মানসিক সক্ষমতা ধরে রাখতে ব্যায়াম হতে পারে কার্যকর: নতুন গবেষণা সরকারের অনুমোদন: মরক্কো থেকে ৬০ হাজার টন টিএসপি সার আমদানি, ডালও কিনছে সরকার ইসলামী ব্যাংকের অস্থিরতায় উদ্বিগ্ন ব্যাংকাররা, আস্থার সংকটের আশঙ্কা রাজশাহীতে সড়ক দুর্ঘটনায় ব্যাংক কর্মকর্তাসহ নিহত ২ হামে মৃত্যুর সংখ্যা বেড়ে ৬৩৯, ২৪ ঘণ্টায় আরও ৮ শিশুর মৃত্যু অর্থনীতি পুনরুদ্ধারে জোর দেওয়ার আহ্বান, আজ আসছে ৯.৩৮ লাখ কোটি টাকার বাজেট ইকোনমিস্টের প্রতিবেদনঃ ভারতের জনসংখ্যা দ্রুতগতিতে কমতে শুরু করবে  নতুন বিশ্বব্যবস্থায় চীনের অবস্থান: কূটনীতি, শক্তির ভারসাম্য ও বৈশ্বিক নেতৃত্বের প্রশ্ন নির্বাচিত প্রতিষ্ঠান যখন ক্ষমতার যুদ্ধে বন্দি যুক্তরাষ্ট্রে অভিবাসন নজরদারিতে ৭০ বিলিয়ন ডলারের তহবিল অনুমোদন, ট্রাম্পের স্বাক্ষরের অপেক্ষা

নতুন বিশ্বব্যবস্থায় চীনের অবস্থান: কূটনীতি, শক্তির ভারসাম্য ও বৈশ্বিক নেতৃত্বের প্রশ্ন

আন্তর্জাতিক রাজনীতির বর্তমান মুহূর্তটি অস্বাভাবিকভাবে পরিবর্তনশীল। ইউক্রেন যুদ্ধের দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব, যুক্তরাষ্ট্র-চীন প্রতিযোগিতা, বৈশ্বিক অর্থনীতির পুনর্গঠন এবং আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানের কার্যকারিতা নিয়ে বাড়তে থাকা বিতর্ক—সব মিলিয়ে বিশ্বব্যবস্থা এক নতুন সংজ্ঞা খুঁজছে। এই প্রেক্ষাপটে গত কয়েক মাসে বিশ্বের প্রধান শক্তিগুলোর নেতাদের চীন সফর নিছক কূটনৈতিক সৌজন্য নয়; বরং এটি আন্তর্জাতিক ক্ষমতার বিন্যাসে বেইজিংয়ের ক্রমবর্ধমান গুরুত্বের একটি প্রতীকী ইঙ্গিত।

এক সময় বৈশ্বিক কূটনীতির কেন্দ্র ছিল প্রধানত ওয়াশিংটন, ব্রাসেলস কিংবা বিভিন্ন পশ্চিমা রাজধানী। কিন্তু সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহ দেখাচ্ছে, গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক আলোচনার জন্য চীন এখন এমন এক মঞ্চে পরিণত হয়েছে যেখানে পারস্পরিক প্রতিদ্বন্দ্বিতায় জড়িত শক্তিগুলিও সংলাপের সুযোগ খুঁজে পায়। বিশ্বের বিভিন্ন শক্তিধর দেশের নেতাদের ধারাবাহিক সফর এই বাস্তবতাকেই তুলে ধরে যে আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে বেইজিংকে আর উপেক্ষা করা সম্ভব নয়।

চীনের কূটনৈতিক অবস্থানের মূল ভিত্তি হিসেবে যে বিষয়টি সামনে আনা হয়, তা হলো বহুপাক্ষিকতা এবং সংলাপনির্ভর সমস্যা সমাধান। বেইজিং দীর্ঘদিন ধরে দাবি করে আসছে যে আন্তর্জাতিক বিরোধের সমাধান সামরিক চাপ বা জোটভিত্তিক মুখোমুখি অবস্থানের মাধ্যমে নয়, বরং আলোচনার মাধ্যমেই হওয়া উচিত। এই অবস্থান অনেক উন্নয়নশীল দেশের কাছে আকর্ষণীয়, কারণ তারা প্রায়ই বড় শক্তিগুলোর প্রতিদ্বন্দ্বিতার মধ্যে নিজেদের স্বার্থ রক্ষার পথ খুঁজে বেড়ায়।

China, the United States, and the future of a rules-based international  order | Brookings

তবে চীনের এই ভূমিকাকে কেবল আদর্শিক অবস্থান হিসেবে দেখা যাবে না। এর সঙ্গে জড়িত রয়েছে বাস্তব কৌশলগত স্বার্থও। আন্তর্জাতিক ব্যবস্থায় স্থিতিশীলতা চীনের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির জন্য অপরিহার্য। বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ উৎপাদন ও বাণিজ্যকেন্দ্র হিসেবে বৈশ্বিক বাজারের অস্থিরতা কিংবা দীর্ঘমেয়াদি সংঘাত বেইজিংয়ের জন্যও ক্ষতিকর। ফলে শান্তি, স্থিতিশীলতা এবং সহযোগিতার পক্ষে চীনের অবস্থান একই সঙ্গে নীতিগত এবং স্বার্থনির্ভর।

বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্রে এই বাস্তবতা আরও স্পষ্ট। দুই দেশের মধ্যে প্রতিযোগিতা অব্যাহত থাকলেও উভয় পক্ষই বুঝতে পারছে যে সরাসরি সংঘাতের মূল্য অত্যন্ত বেশি। তাই প্রতিদ্বন্দ্বিতা ও সহযোগিতার মধ্যবর্তী একটি কার্যকর ভারসাম্য খুঁজে বের করার প্রয়োজনীয়তা ক্রমেই বাড়ছে। প্রযুক্তি, বাণিজ্য, নিরাপত্তা এবং ভূরাজনৈতিক প্রভাবের প্রশ্নে মতপার্থক্য থাকলেও, বিশ্বের দুই বৃহত্তম অর্থনীতির মধ্যে সম্পর্ক সম্পূর্ণ ভেঙে পড়া আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার জন্য ঝুঁকিপূর্ণ হবে।

এই প্রেক্ষাপটে তাই “কৌশলগত স্থিতিশীলতা” ধারণাটি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। এর অর্থ হলো প্রতিযোগিতা থাকবে, কিন্তু তা এমন সীমার মধ্যে থাকবে যাতে সংঘাত অনিবার্য হয়ে না ওঠে। বিরোধ থাকবে, কিন্তু সেগুলো পরিচালনাযোগ্য থাকবে। আর সহযোগিতা থাকবে সেইসব ক্ষেত্রে যেখানে উভয় পক্ষের অভিন্ন স্বার্থ রয়েছে।

অন্যদিকে রাশিয়ার সঙ্গে চীনের সম্পর্ক আন্তর্জাতিক শক্তির ভারসাম্যে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। গত কয়েক দশকে দুই দেশের মধ্যে সহযোগিতা ক্রমাগত গভীর হয়েছে। যদিও এই সম্পর্ককে আনুষ্ঠানিক সামরিক জোট হিসেবে সংজ্ঞায়িত করা হয় না, তবু পারস্পরিক আস্থা এবং কৌশলগত সমন্বয় আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে এর গুরুত্ব বাড়িয়েছে। পশ্চিমা বিশ্বের সঙ্গে উত্তেজনার সময়ে এই সম্পর্ক উভয় দেশের জন্যই একটি গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক ভিত্তি হিসেবে কাজ করছে।

Foreign policy scholars examine the China-Russia relationship | MIT News |  Massachusetts Institute of Technology

আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার ভবিষ্যৎ নিয়ে আলোচনায় জাতিসংঘের প্রশ্নও নতুন করে সামনে এসেছে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তী বিশ্বব্যবস্থার কেন্দ্রীয় প্রতিষ্ঠান হিসেবে জাতিসংঘ এখনও বৈধতা ও প্রতিনিধিত্বের একটি গুরুত্বপূর্ণ উৎস। কিন্তু সমসাময়িক সংকটগুলো দেখিয়েছে যে কেবল প্রতিষ্ঠান থাকা যথেষ্ট নয়; সেগুলোর কার্যকারিতাও নিশ্চিত করতে হবে। নিরাপত্তা পরিষদের স্থায়ী সদস্যদের ওপর তাই বিশেষ দায়িত্ব বর্তায়, কারণ তাদের সিদ্ধান্তই প্রায়শই বৈশ্বিক শান্তি ও নিরাপত্তাকে প্রভাবিত করে।

অর্থনৈতিক ক্ষেত্রেও চীন নিজেকে একটি অপরিহার্য অংশীদার হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে চাইছে। বৈশ্বিক সরবরাহ শৃঙ্খল, শিল্প উৎপাদন এবং বিনিয়োগ প্রবাহের সঙ্গে চীনের গভীর সংযোগ এমন এক বাস্তবতা তৈরি করেছে যেখানে বিচ্ছিন্নতার পরিবর্তে পারস্পরিক নির্ভরতা অধিক কার্যকর বলে মনে হয়। আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক শাসনব্যবস্থাকে আরও অন্তর্ভুক্তিমূলক ও ভারসাম্যপূর্ণ করার পক্ষে বেইজিংয়ের বক্তব্যও এই বৃহত্তর কৌশলের অংশ।

তবে চীনের উত্থান নিয়ে উদ্বেগও একেবারে অমূলক নয়। অনেক দেশই প্রশ্ন তোলে, ক্রমবর্ধমান অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক প্রভাব ভবিষ্যতে কী ধরনের ভূরাজনৈতিক আচরণে রূপ নেবে। আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ইতিহাস দেখায় যে উদীয়মান শক্তি এবং প্রতিষ্ঠিত শক্তির মধ্যে প্রতিযোগিতা প্রায়শই উত্তেজনার জন্ম দেয়। ফলে চীনের ঘোষিত উদ্দেশ্য এবং বাস্তব নীতির মধ্যে সামঞ্জস্য বজায় রাখা বেইজিংয়ের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ।

China Wants to Rule the World by Controlling the Rules - The Atlantic

ভারতের মতো বৃহৎ ও স্বতন্ত্র কৌশলগত অবস্থানের দেশগুলোর জন্যও এই পরিবর্তনশীল বাস্তবতা গুরুত্বপূর্ণ। চীন ও ভারতের মধ্যে প্রতিযোগিতা যেমন রয়েছে, তেমনি সহযোগিতার ক্ষেত্রও কম নয়। দুই দেশই উন্নয়ন, অর্থনৈতিক রূপান্তর এবং আন্তর্জাতিক প্রভাব বৃদ্ধির লক্ষ্যে এগোচ্ছে। তাই পারস্পরিক মতপার্থক্যকে নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি সহযোগিতার ক্ষেত্র সম্প্রসারণ ভবিষ্যৎ আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার জন্য গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে।

সব মিলিয়ে আজকের আন্তর্জাতিক ব্যবস্থায় চীনের ভূমিকা আর কেবল একটি উদীয়মান শক্তির নয়। দেশটি নিজেকে এমন এক কেন্দ্রীয় অংশগ্রহণকারী হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে চাইছে, যে একই সঙ্গে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির চালিকাশক্তি, কূটনৈতিক সংলাপের মধ্যস্থতাকারী এবং বহুপাক্ষিক ব্যবস্থার সমর্থক। এই আকাঙ্ক্ষা কতটা সফল হবে, তা নির্ভর করবে কেবল চীনের ক্ষমতার ওপর নয়, বরং সে ক্ষমতা ব্যবহারের ধরন এবং আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের আস্থাও অর্জন করতে পারে কি না তার ওপর। বিশ্বের ভবিষ্যৎ শক্তির ভারসাম্য নির্ধারণে সেই প্রশ্নই সম্ভবত সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।

জনপ্রিয় সংবাদ

কেমোথেরাপির পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ায় মানসিক সক্ষমতা ধরে রাখতে ব্যায়াম হতে পারে কার্যকর: নতুন গবেষণা

নতুন বিশ্বব্যবস্থায় চীনের অবস্থান: কূটনীতি, শক্তির ভারসাম্য ও বৈশ্বিক নেতৃত্বের প্রশ্ন

০৩:৪১:০০ অপরাহ্ন, বুধবার, ১০ জুন ২০২৬

আন্তর্জাতিক রাজনীতির বর্তমান মুহূর্তটি অস্বাভাবিকভাবে পরিবর্তনশীল। ইউক্রেন যুদ্ধের দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব, যুক্তরাষ্ট্র-চীন প্রতিযোগিতা, বৈশ্বিক অর্থনীতির পুনর্গঠন এবং আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানের কার্যকারিতা নিয়ে বাড়তে থাকা বিতর্ক—সব মিলিয়ে বিশ্বব্যবস্থা এক নতুন সংজ্ঞা খুঁজছে। এই প্রেক্ষাপটে গত কয়েক মাসে বিশ্বের প্রধান শক্তিগুলোর নেতাদের চীন সফর নিছক কূটনৈতিক সৌজন্য নয়; বরং এটি আন্তর্জাতিক ক্ষমতার বিন্যাসে বেইজিংয়ের ক্রমবর্ধমান গুরুত্বের একটি প্রতীকী ইঙ্গিত।

এক সময় বৈশ্বিক কূটনীতির কেন্দ্র ছিল প্রধানত ওয়াশিংটন, ব্রাসেলস কিংবা বিভিন্ন পশ্চিমা রাজধানী। কিন্তু সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহ দেখাচ্ছে, গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক আলোচনার জন্য চীন এখন এমন এক মঞ্চে পরিণত হয়েছে যেখানে পারস্পরিক প্রতিদ্বন্দ্বিতায় জড়িত শক্তিগুলিও সংলাপের সুযোগ খুঁজে পায়। বিশ্বের বিভিন্ন শক্তিধর দেশের নেতাদের ধারাবাহিক সফর এই বাস্তবতাকেই তুলে ধরে যে আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে বেইজিংকে আর উপেক্ষা করা সম্ভব নয়।

চীনের কূটনৈতিক অবস্থানের মূল ভিত্তি হিসেবে যে বিষয়টি সামনে আনা হয়, তা হলো বহুপাক্ষিকতা এবং সংলাপনির্ভর সমস্যা সমাধান। বেইজিং দীর্ঘদিন ধরে দাবি করে আসছে যে আন্তর্জাতিক বিরোধের সমাধান সামরিক চাপ বা জোটভিত্তিক মুখোমুখি অবস্থানের মাধ্যমে নয়, বরং আলোচনার মাধ্যমেই হওয়া উচিত। এই অবস্থান অনেক উন্নয়নশীল দেশের কাছে আকর্ষণীয়, কারণ তারা প্রায়ই বড় শক্তিগুলোর প্রতিদ্বন্দ্বিতার মধ্যে নিজেদের স্বার্থ রক্ষার পথ খুঁজে বেড়ায়।

China, the United States, and the future of a rules-based international  order | Brookings

তবে চীনের এই ভূমিকাকে কেবল আদর্শিক অবস্থান হিসেবে দেখা যাবে না। এর সঙ্গে জড়িত রয়েছে বাস্তব কৌশলগত স্বার্থও। আন্তর্জাতিক ব্যবস্থায় স্থিতিশীলতা চীনের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির জন্য অপরিহার্য। বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ উৎপাদন ও বাণিজ্যকেন্দ্র হিসেবে বৈশ্বিক বাজারের অস্থিরতা কিংবা দীর্ঘমেয়াদি সংঘাত বেইজিংয়ের জন্যও ক্ষতিকর। ফলে শান্তি, স্থিতিশীলতা এবং সহযোগিতার পক্ষে চীনের অবস্থান একই সঙ্গে নীতিগত এবং স্বার্থনির্ভর।

বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্রে এই বাস্তবতা আরও স্পষ্ট। দুই দেশের মধ্যে প্রতিযোগিতা অব্যাহত থাকলেও উভয় পক্ষই বুঝতে পারছে যে সরাসরি সংঘাতের মূল্য অত্যন্ত বেশি। তাই প্রতিদ্বন্দ্বিতা ও সহযোগিতার মধ্যবর্তী একটি কার্যকর ভারসাম্য খুঁজে বের করার প্রয়োজনীয়তা ক্রমেই বাড়ছে। প্রযুক্তি, বাণিজ্য, নিরাপত্তা এবং ভূরাজনৈতিক প্রভাবের প্রশ্নে মতপার্থক্য থাকলেও, বিশ্বের দুই বৃহত্তম অর্থনীতির মধ্যে সম্পর্ক সম্পূর্ণ ভেঙে পড়া আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার জন্য ঝুঁকিপূর্ণ হবে।

এই প্রেক্ষাপটে তাই “কৌশলগত স্থিতিশীলতা” ধারণাটি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। এর অর্থ হলো প্রতিযোগিতা থাকবে, কিন্তু তা এমন সীমার মধ্যে থাকবে যাতে সংঘাত অনিবার্য হয়ে না ওঠে। বিরোধ থাকবে, কিন্তু সেগুলো পরিচালনাযোগ্য থাকবে। আর সহযোগিতা থাকবে সেইসব ক্ষেত্রে যেখানে উভয় পক্ষের অভিন্ন স্বার্থ রয়েছে।

অন্যদিকে রাশিয়ার সঙ্গে চীনের সম্পর্ক আন্তর্জাতিক শক্তির ভারসাম্যে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। গত কয়েক দশকে দুই দেশের মধ্যে সহযোগিতা ক্রমাগত গভীর হয়েছে। যদিও এই সম্পর্ককে আনুষ্ঠানিক সামরিক জোট হিসেবে সংজ্ঞায়িত করা হয় না, তবু পারস্পরিক আস্থা এবং কৌশলগত সমন্বয় আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে এর গুরুত্ব বাড়িয়েছে। পশ্চিমা বিশ্বের সঙ্গে উত্তেজনার সময়ে এই সম্পর্ক উভয় দেশের জন্যই একটি গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক ভিত্তি হিসেবে কাজ করছে।

Foreign policy scholars examine the China-Russia relationship | MIT News |  Massachusetts Institute of Technology

আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার ভবিষ্যৎ নিয়ে আলোচনায় জাতিসংঘের প্রশ্নও নতুন করে সামনে এসেছে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তী বিশ্বব্যবস্থার কেন্দ্রীয় প্রতিষ্ঠান হিসেবে জাতিসংঘ এখনও বৈধতা ও প্রতিনিধিত্বের একটি গুরুত্বপূর্ণ উৎস। কিন্তু সমসাময়িক সংকটগুলো দেখিয়েছে যে কেবল প্রতিষ্ঠান থাকা যথেষ্ট নয়; সেগুলোর কার্যকারিতাও নিশ্চিত করতে হবে। নিরাপত্তা পরিষদের স্থায়ী সদস্যদের ওপর তাই বিশেষ দায়িত্ব বর্তায়, কারণ তাদের সিদ্ধান্তই প্রায়শই বৈশ্বিক শান্তি ও নিরাপত্তাকে প্রভাবিত করে।

অর্থনৈতিক ক্ষেত্রেও চীন নিজেকে একটি অপরিহার্য অংশীদার হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে চাইছে। বৈশ্বিক সরবরাহ শৃঙ্খল, শিল্প উৎপাদন এবং বিনিয়োগ প্রবাহের সঙ্গে চীনের গভীর সংযোগ এমন এক বাস্তবতা তৈরি করেছে যেখানে বিচ্ছিন্নতার পরিবর্তে পারস্পরিক নির্ভরতা অধিক কার্যকর বলে মনে হয়। আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক শাসনব্যবস্থাকে আরও অন্তর্ভুক্তিমূলক ও ভারসাম্যপূর্ণ করার পক্ষে বেইজিংয়ের বক্তব্যও এই বৃহত্তর কৌশলের অংশ।

তবে চীনের উত্থান নিয়ে উদ্বেগও একেবারে অমূলক নয়। অনেক দেশই প্রশ্ন তোলে, ক্রমবর্ধমান অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক প্রভাব ভবিষ্যতে কী ধরনের ভূরাজনৈতিক আচরণে রূপ নেবে। আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ইতিহাস দেখায় যে উদীয়মান শক্তি এবং প্রতিষ্ঠিত শক্তির মধ্যে প্রতিযোগিতা প্রায়শই উত্তেজনার জন্ম দেয়। ফলে চীনের ঘোষিত উদ্দেশ্য এবং বাস্তব নীতির মধ্যে সামঞ্জস্য বজায় রাখা বেইজিংয়ের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ।

China Wants to Rule the World by Controlling the Rules - The Atlantic

ভারতের মতো বৃহৎ ও স্বতন্ত্র কৌশলগত অবস্থানের দেশগুলোর জন্যও এই পরিবর্তনশীল বাস্তবতা গুরুত্বপূর্ণ। চীন ও ভারতের মধ্যে প্রতিযোগিতা যেমন রয়েছে, তেমনি সহযোগিতার ক্ষেত্রও কম নয়। দুই দেশই উন্নয়ন, অর্থনৈতিক রূপান্তর এবং আন্তর্জাতিক প্রভাব বৃদ্ধির লক্ষ্যে এগোচ্ছে। তাই পারস্পরিক মতপার্থক্যকে নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি সহযোগিতার ক্ষেত্র সম্প্রসারণ ভবিষ্যৎ আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার জন্য গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে।

সব মিলিয়ে আজকের আন্তর্জাতিক ব্যবস্থায় চীনের ভূমিকা আর কেবল একটি উদীয়মান শক্তির নয়। দেশটি নিজেকে এমন এক কেন্দ্রীয় অংশগ্রহণকারী হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে চাইছে, যে একই সঙ্গে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির চালিকাশক্তি, কূটনৈতিক সংলাপের মধ্যস্থতাকারী এবং বহুপাক্ষিক ব্যবস্থার সমর্থক। এই আকাঙ্ক্ষা কতটা সফল হবে, তা নির্ভর করবে কেবল চীনের ক্ষমতার ওপর নয়, বরং সে ক্ষমতা ব্যবহারের ধরন এবং আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের আস্থাও অর্জন করতে পারে কি না তার ওপর। বিশ্বের ভবিষ্যৎ শক্তির ভারসাম্য নির্ধারণে সেই প্রশ্নই সম্ভবত সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।