উপন্যাসিক শংকর নতুন প্রজন্মের কাছে কত পরিচিত তা ঠিক বলতে পারি না।
সত্যজিত রায়ের মহানগর ট্রিলজির দুটো “সীমাবদ্ধ” ও “জন অরণ্যে” শংকরের কাহিনির ওপর নির্ভর করে।
সত্যজিতের গ্রাম ও শহর মিলিয়ে প্রথম ট্রিলজি যেমন বিভূতি ভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়-এর কাহিনির ওপর নির্ভর করে। যা তাকে বিশ্বমাঝে পরিচিত করে প্রথম ধাক্কাতেই— তেমনি “মহানগর ট্রিলজি” নগরকেন্দ্রিক বেড়ে ওঠা মানুষের মাঝে স্থান নেয় অনেক বড়ভাবে। এবং ট্রিলজির দুটো শংকরের উপন্যাসনির্ভর।
তারপরেও হয়তো অনেকে বিভূতি ভূষণের পাশে শংকরকে বসাবেন না। ওপরে রাখবেন লেখক হিসেবে বিভূতি ভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়কে। এ নিয়ে বিতর্কেরও কোনো স্থান নেই।
তবে নাগরিক সমাজে আধুনিক শিক্ষায় গড়ে ওঠায় এক তরুণ যখন তার নিজের বেকার, দরিদ্র বন্ধুর বোন— যে তার পূর্বপরিচিতও, তাকে তার ব্যবসার উপটোকন হিসেবে বড় ব্যবসায়ীর জন্যে হোটেলে পৌঁছে দেয়— এমন একটি ঘটনার ওপর দাঁড়ানো অনেক জটিল। নিজের অর্থ উপার্জনের বাস্তবতা, অন্যদিকে নৈতিকতার পীড়ন— এই পীড়ন বা যন্ত্রণাকে হয়তো তুলনা করা যায় না অপু’র স্ত্রীর মৃত্যু সংবাদ সঙ্গে। তবে শোকের ভয়াবহতা ও মানসিক পীড়নের জটিলতা— এ কোনো স্কেলে মাপা যায় তা নির্ধারণ করা কঠিন। আর এই জটিলতাই নগর।

গ্রাম যেমন মানুষ সৃষ্টি করেছিল, নগরও মানুষ সৃষ্টি করেছে। গ্রামেও জটিলতা ছিল। স্বাভাবিক শোক, দুঃখ, হাসি, কান্নার পাশাপাশি জটিলতা ও মানসিক পীড়নও সেখানে ছিল— যা ইতিহাস থেকে জানা যায়।
মানুষ নিজেই তার সভ্যতার গতি সৃষ্টি করেছে— সেই সভ্যতার গতির প্রয়োজনে নগর হয়েছে। আবার সভ্যতার প্রয়োজনে জীবনের জটিলতার নানান দিক এসেছে।
শংকরের কলকাতা মহানগরী নিয়ে লেখায় এ জটিলতা যা “সীমাবদ্ধ” ও “জন অরণ্য” চলচ্চিত্ররূপের মধ্য দিয়ে বেশি মানুষ জেনেছে ও বুঝতে তাদের আরও সহজ হয়েছে। আর তার সময় ষাটের দশক। কেন্দ্রস্থল মহানগর কলকাতা।
ওই শহর তখন ভাঙনের একটা বড় পর্যায়ে এসে গেছে। ১৯১১ সালে ওই মহানগরী তার রাজধানী মর্যাদা হারিয়েছে। যেদিন থেকে রাজধানী মর্যাদা হারিয়েছে সেদিন থেকে সে মহানগর থেকে ক্রমেই খসে পড়তে শুরু করছে। তার পরে ১৯৪৬ সালের দাঙ্গা ও ১৯৪৭ সালের দেশভাগ— শহরে অবিশ্বাস বাড়িয়েছে, আবার দেশান্তরী মানুষের ভিড় বাড়িয়েছে।
অর্থাৎ একদিকে নগর ভাঙছে অন্যদিকে প্রবেশ করছে নতুন জটিলতায়— যে জটিলতার মূল উপাদান ক্ষুধা ও বিশ্বাসহীনতা। ততদিনে মানুষে মানুষে বিশ্বাস চলে গেছে। রাজনীতির ওপর থেকে বিশ্বাস চলে গেছে। এমনকি রাষ্ট্রকেও সে আপন মনে করছে না।
এমন একটা সময়ে মানুষ যে ভয়াবহ রকম আত্মকেন্দ্রিক হয়ে পড়ে তারই নানান গভীর জটিল দিক ছোট ছোট বাক্য ও ঘটনার ভেতর দিয়ে প্রকাশ পেয়েছে।

ওই সময়ে আরও অনেক লেখকও বিষয়টিকে ছুঁয়েছিলেন, প্রেমেন মিত্র, অচিন্ত্য সেনগুপ্ত, নরেন মিত্র সহ অনেকে। আবার অনেক বড় লেখক ধরতে গিয়ে সেখানে একটু বিভ্রান্ত হয়েছেন— দারিদ্র্যের সঙ্গে বামপন্থাকে— পুঁজিবাদকে জড়াতে গিয়ে।
শংকর লেখক হিসেবে তাদের থেকে বড় কি ছোট সে বিচার করার ক্ষমতা অনেক জ্ঞানীদের। তবে তিনি কোনো ইজমে না ঢুকে শুধু নগরের বাইরের ভাঙন ও সেই জন-অরণ্যে বাস করা সীমাবদ্ধ মানুষ অর্থাৎ সবাই কোনো না কোনো খাঁচায় তার মানসিক ও বাস্তব পীড়নের মধ্যে। এই জটিলতাগুলোর ছবি এঁকেছিলেন।
আজ সভ্যতা ভিন্ন জায়গায় চলে গেছে, মহানগর বা দেশ নয়— এখন প্রতিটি মানুষ— তাই সে যে দেশেরই হোক না কেন, অর্থনৈতিক সম্পদের খেলার ক্রীড়নক।
নতুন এই সময়ের উপন্যাসের ধারাও শুরু হয়েছে। বাংলা সাহিত্য কেন যেন এখনও সমকালকে ধরতে পারেনি। তার নগর নিয়ে কারা খেলছে— সেখানে কী পীড়ন, কী জটিলতা তা এখনও সাহিত্য ছুঁতে পারেনি।
শংকর অর্থাৎ যার পুরোনাম মনি শংকর মুখোপাধ্যায় তিনি তাঁর সময়কালেই নগরের ছবি আঁকতে পেরেছিলেন। জটিলতার গভীরে হয়তো রবীন্দ্রনাথ বা বঙ্কিম না হলে যাওয়া যায় না— তবে ছবি তো তিনি এঁকেছিলেন।
তাই তার কালটা চলে গেলেও তার মৃত্যু মনে করিয়ে দেয়— সাহিত্যকে সময়ের জটিলতাকে চিনতে হয়। — স্বদেশ রায়
স্বদেশ রায় 
























