কলকাতার আলিপুর জাদুঘরের ছায়াঘেরা প্রাঙ্গণে বসে কথোপকথনে মগ্ন ছিলেন পুলিৎজার জয়ী মার্কিন লেখক বারবারা কিংসলভার। একসময়ের ব্রিটিশ কারাগার, যেখানে জওহরলাল নেহরুসহ বহু স্বাধীনতা সংগ্রামী বন্দি ছিলেন, সেই ঐতিহাসিক পরিবেশেই তিনি শহরটিকে অনুভব করার চেষ্টা করেন। কলকাতা সাহিত্য সম্মেলনে যোগ দিতে এসে তিনি বোটানিক্যাল গার্ডেন, হাওড়া সেতুর পাশের বিশাল ফুলবাজার ও ঘাট ঘুরে দেখেন, যেন লেখার জন্য স্থানীয় সুর ও স্পন্দনকে নিজের ভেতরে ধারণ করতে পারেন। জীববিজ্ঞানে প্রশিক্ষিত হলেও পেশায় লেখক কিংসলভারের বই গুলো সবসময় মানুষের বাস্তব জীবন ও সংগ্রামের মাটির গন্ধ বহন করে।
সহানুভূতির গল্প ও ডেমন কপারহেড
চার্লস ডিকেন্সের ডেভিড কপারফিল্ডকে নতুনভাবে কল্পনা করে তিনি রচনা করেন ডেমন কপারহেড। অ্যাপালাচিয়ার এক কিশোরের চোখে মাদকসংকট, দারিদ্র্য ও ভেঙে পড়া সামাজিক কাঠামোর গল্প উঠে আসে সেখানে। কিন্তু একই সঙ্গে থাকে কোমল আশাবাদ, টিকে থাকার শক্তি ও অদম্য দৃঢ়তা। এই মানবিক সুরই বইটিকে এনে দেয় পুলিৎজার পুরস্কার সহ একাধিক সম্মাননা এবং দীর্ঘদিনের বেস্টসেলার স্বীকৃতি। দক্ষিণ অ্যাপালাচিয়ার খামারবাড়ি থেকে বিশ্বজুড়ে পাঠকের কাছে পৌঁছে যায় তার লেখা।

শোনা ও দেখা মানুষের কাহিনি
মাদক সংকটের গল্প কীভাবে বলা যায় তা নিয়ে ভাবতে গিয়েই ডিকেন্সের সৃষ্টির ভেতর নতুন পথ খুঁজে পান কিংসলভার। কেন্টে ডিকেন্সের বাসভবনে অবস্থানের সময় তিনি অনুভব করেন, শিশুর কণ্ঠে বলা গল্পই মানুষের হৃদয়ে গভীরভাবে পৌঁছায়। সেই সূত্র ধরেই পুরোনো কাহিনিকে বর্তমান সময় ও ভৌগোলিক বাস্তবতায় স্থানান্তর করেন তিনি। সাংবাদিকতা জীবনের শুরুতে খনি শ্রমিক নারীদের আন্দোলন কাছ থেকে দেখার অভিজ্ঞতা তাকে শিখিয়েছিল—অনেক মানুষের গল্প শোনা হয় না, অথচ তাদের দেখা ও শোনার প্রয়োজন সবচেয়ে বেশি।
সাহিত্য কেন জরুরি
তার উপন্যাসগুলোতে পুঁজিবাদ ও সাম্রাজ্যবাদের নির্মমতা, ভাঙনের মুখে মানুষের আচরণ, সম্পর্কের উষ্ণতা এবং ভিন্নতাকে সম্মান করার শিক্ষা বারবার ফিরে আসে। বিভক্ত সময়ে মানুষের মধ্যে সংযোগ গড়ে তোলাকেই তিনি সাহিত্যের প্রধান দায়িত্ব মনে করেন। তার বিশ্বাস, কল্পসাহিত্য পড়লে মানুষ নিজের সীমানা ছাড়িয়ে অন্যের জীবন অনুভব করতে শেখে, আর সেই অভিজ্ঞতাই হৃদয়কে প্রসারিত করে পৃথিবীকে বদলে দিতে পারে।
নতুন উপন্যাস ও ব্যক্তিগত লড়াই
আগামী অক্টোবরে প্রকাশের অপেক্ষায় রয়েছে তার নতুন উপন্যাস পার্টিটা। সঙ্গীতধর্মী গঠনে লেখা এই কাহিনিতে এক নারীর জীবনের দুই পর্ব ও নানা বিপর্যয়ের মধ্য দিয়ে ফিরে আসার শক্তি তুলে ধরা হয়েছে। লেখক হওয়ার পাশাপাশি তিনি একজন পিয়ানোবাদকও। তবে দীর্ঘস্থায়ী শারীরিক সমস্যার কারণে তার হাত বারবার অস্ত্রোপচারের প্রয়োজন হয় এবং বইয়ে স্বাক্ষর দেওয়া ও বন্ধ করতে হয়েছে। তবু তার দৃঢ় উচ্চারণ, হাত যদি থাকে তবে লেখা থামবে না।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















