আগামী কয়েক বছর উড়ন্ত গাড়ি প্রযুক্তির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সময় হতে যাচ্ছে। বিভিন্ন প্রযুক্তিগত পরীক্ষা-নিরীক্ষা এবং বাণিজ্যিক ব্যবহারের প্রস্তুতির মধ্য দিয়ে এই খাত দ্রুত এগোচ্ছে। ইতোমধ্যে চীন ও দুবাইয়ে চলতি বছর থেকেই বাণিজ্যিক কার্যক্রম শুরুর পরিকল্পনা রয়েছে। ফলে উড়ন্ত গাড়ি নির্মাতাদের মধ্যে প্রতিযোগিতা আরও তীব্র হওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। এই প্রতিযোগিতায় জাপানের টয়োটা সিটির স্কাইড্রাইভ নিজেদের পণ্য নিয়ে সরাসরি প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নামার প্রস্তুতি নিচ্ছে।
২০২৮ সালে সরবরাহের লক্ষ্য
স্কাইড্রাইভের ভাইস প্রেসিডেন্ট ইউগো ফুকুহারা জানিয়েছেন, ২০২৮ সালের মধ্যে সফলভাবে তাদের উড়ন্ত গাড়ি সরবরাহের সময়সূচি ধরে কাজ চলছে। দুবাইয়ের হেলিকপ্টার চার্টার সেবা প্রদানকারী অ্যারোগালফ সার্ভিসেস কোম্পানির সঙ্গে ২০টি উড়ন্ত গাড়ি সরবরাহের চুক্তি হয়েছে। এর মধ্যে ২০২৮ সালে ১০টি এবং ২০২৯ সালে আরও ১০টি সরবরাহ করা হবে।

জাপানের অভ্যন্তরীণ বাজারে ওসাকা মেট্রো ও কিউশু রেলওয়ে কোম্পানিও ২০২৮ সালে স্কাইড্রাইভের উড়ন্ত গাড়ি ব্যবহার করে এয়ার ট্যাক্সি চালুর সম্ভাবনা বিবেচনা করছে। তবে বিশ্লেষকদের মতে, এয়ার ট্যাক্সি ব্যাপকভাবে চালু হতে ২০৩০-এর দশক পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হতে পারে।
পরীক্ষা, নিরাপত্তা ও প্রযুক্তিগত বৈশিষ্ট্য
ইয়ামাগুচি প্রিফেকচারে স্কাইড্রাইভের ফ্লাইট পরীক্ষাকেন্দ্রে সম্প্রতি গণমাধ্যমকে আমন্ত্রণ জানানো হয়। ইয়ামাগুচি উপসাগরের পাশের পার্ক এলাকা স্থল ও সমুদ্র—উভয় জায়গায় উড্ডয়ন পরীক্ষার সুযোগ দেয়। তবে নির্ধারিত প্রদর্শনী উড্ডয়ন বাতাসের অনুকূলতা না থাকায় বাতিল করা হয়, কারণ সরকারি নিরাপত্তা মান পূরণ হয়নি।
যদিও একে সাধারণভাবে “উড়ন্ত গাড়ি” বলা হয়, বাস্তবে এটি একটি উড়োজাহাজ শ্রেণির যান। স্কাইড্রাইভের তৈরি মাল্টিকপ্টার ধরনের এই যানে ১২টি আলাদা মোটর ও রটার রয়েছে। প্রতিটি রটারের ব্যাস ২.৫ মিটার এবং কার্বন ফাইবার যৌগ দিয়ে তৈরি। রটারের কোণ স্থির থাকে, মোটরের গতি পরিবর্তনের মাধ্যমেই নিয়ন্ত্রণ করা হয়। পুরো যানের প্রস্থ প্রায় ১২ মিটার এবং ওজন প্রায় দেড় টন—যা একটি সাধারণ সেডান গাড়ির সমান।
এই মডেলটি ক্যালিফোর্নিয়ার জবি এভিয়েশনের তৈরি উড়ন্ত গাড়ির তুলনায় ছোট ও হালকা। স্কাইড্রাইভ তিনজন আরোহীর জন্য নকশা করেছে, যেখানে পাইলটসহ দুই যাত্রীর আসন পেছনে রাখা হয়েছে।

শহুরে চলাচলে নতুন সম্ভাবনা
স্কাইড্রাইভের ধারণা মূলত দীর্ঘ দূরত্বের শহর-থেকে-শহর ভ্রমণের বদলে ব্যক্তিগত শহুরে চলাচল সহজ করা। যান ছোট ও হালকা হওয়ায় উড্ডয়ন ও অবতরণের স্থান স্থাপন করা সহজ এবং বিদ্যুৎ খরচও কম। ব্যাটারি চালিত এই উড়োজাহাজগুলোকে ইলেকট্রিক ভার্টিক্যাল টেক-অফ অ্যান্ড ল্যান্ডিং বা ইভিটল বলা হয়।
বিশেষজ্ঞদের মতে, উন্নত গণপরিবহন থাকা সত্ত্বেও টোকিওর কিছু এলাকায় প্রধান গন্তব্য—যেমন বিমানবন্দর—পৌঁছাতে একাধিকবার যানবাহন বদলাতে হয়। এ ধরনের রুটে উড়ন্ত গাড়ি নতুন পরিবহন মাধ্যম হিসেবে গুরুত্ব পেতে পারে। তবে শহরে পর্যাপ্ত ভার্টিপোর্ট বা উড্ডয়ন-অবতরণ কেন্দ্র স্থাপনই বড় চ্যালেঞ্জ।
বিধিনিষেধ ও অনুমোদনের বাধা
উড়ন্ত গাড়ি বাজারজাত করতে সবচেয়ে বড় বাধা হলো বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের আনুষ্ঠানিক অনুমোদন বা টাইপ সার্টিফিকেট পাওয়া। এটি বহু বছরের প্রক্রিয়া, যেখানে নিরাপত্তা ও পরিবেশগত মান পূরণের প্রমাণ দিতে হয়।

জাপান ২০২৫ সালের ওসাকা এক্সপোতে বাণিজ্যিক উড্ডয়ন চালুর লক্ষ্য নিলেও কোনো নির্মাতা টাইপ সার্টিফিকেট না পাওয়ায় তা সম্ভব হয়নি। ফলে প্রদর্শনী উড্ডয়নেই সীমাবদ্ধ থাকতে হয়। স্কাইড্রাইভের আবেদন ২০২১ সালে গ্রহণ করা হয়েছে এবং ২০২৮ সালের মধ্যে সরবরাহ নিশ্চিত করতে তারা কর্তৃপক্ষের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করছে। যুক্তরাষ্ট্রেও একই অনুমোদনের জন্য আবেদন করা হয়েছে।
এখন পর্যন্ত চীনের গুয়াংঝৌভিত্তিক এয়ার ট্যাক্সি নির্মাতা ইহ্যাং ছাড়া আর কোনো প্রতিষ্ঠান টাইপ সার্টিফিকেট পায়নি, এবং তাদের কার্যক্রমও চীনের মধ্যেই সীমিত।
উৎপাদন পরিকল্পনা ও শিল্প সহযোগিতা
২০১৮ সালে একটি স্বেচ্ছাসেবী গবেষণা দলের সদস্যদের মাধ্যমে স্কাইড্রাইভ প্রতিষ্ঠিত হয়। উড়ন্ত গাড়ি উৎপাদনে তারা শিজুওকার সুজুকির সঙ্গে কাজ করছে, যেখানে উৎপাদনকেন্দ্র স্থাপন করা হয়েছে। পূর্ণ সক্ষমতায় বছরে প্রায় ৫০টি উড়োজাহাজ তৈরি করা সম্ভব হবে এবং ভবিষ্যতে এই সক্ষমতা বাড়ানোর পরিকল্পনা রয়েছে।
প্রচলিত উড়োজাহাজ উৎপাদনের তুলনায় বড় পরিসরে উৎপাদন লক্ষ্য রেখে খরচ কমাতে গাড়ি শিল্পের গণউৎপাদন পদ্ধতি ব্যবহারের পরিকল্পনা করছে স্কাইড্রাইভ। সুজুকির সঙ্গে অংশীদারত্বের মাধ্যমে সেই অভিজ্ঞতা কাজে লাগানোই তাদের কৌশল।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















