মানুষের স্বাস্থ্যে পরিবেশের প্রভাব কতটা গভীর, তা বৈজ্ঞানিকভাবে মানচিত্রে আনতে শুরু হয়েছে এক উচ্চাকাঙ্ক্ষী উদ্যোগ। “মানব এক্সপোজোম প্রকল্প” নামে এই প্রচেষ্টা সফল হলে রোগের কারণ বোঝার ক্ষেত্রে বড় ধরনের পরিবর্তন আসতে পারে বলে মনে করছেন গবেষকেরা।
গবেষণার নেতৃত্বে আছেন জনস হপকিন্স বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশ বিষবিদ টমাস হার্টাং। দীর্ঘদিন ধরে প্রাণীর ওপর পরীক্ষার বিকল্প হিসেবে অঙ্গসদৃশ কোষসংস্কৃতি ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহারের চেষ্টা করে আসছেন তিনি। এবার তাঁর লক্ষ্য—মানব জিনোম প্রকল্প যেমন জিনগত প্রভাবের মানচিত্র তৈরি করেছিল, তেমনি পরিবেশগত প্রভাবের পূর্ণ চিত্র তুলে ধরা।
পরিবেশ বনাম জিন: ভারসাম্যহীন গবেষণা
বিভিন্ন গবেষণা ইঙ্গিত দেয়, রোগের পেছনে প্রায় ২০ শতাংশ ভূমিকা জিনগত এবং প্রায় ৮০ শতাংশ পরিবেশগত। কিন্তু বাস্তবে গবেষণার বড় অংশই জিন নিয়ে হয়েছে, পরিবেশগত কারণ নিয়ে কাজ হয়েছে বিচ্ছিন্নভাবে।
কলাম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের বিষবিদ গ্যারি মিলারের মতে, জিনতত্ত্বের শুরুর সময় যেমন পুরো ব্যবস্থাটি অজানা ছিল, এখন পরিবেশগত প্রভাব বোঝার ক্ষেত্রেও একই অবস্থা। এই ঘাটতি পূরণ করতেই “এক্সপোজোমিক্স” নামে এক নতুন শাস্ত্র গড়ে
তোলার চেষ্টা চলছে
জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত নজর
এক্সপোজোমিক্সের লক্ষ্য শুধু রাসায়নিক দূষণ নয়। এতে শারীরিক, জৈবিক, মানসিক, সামাজিক—সব ধরনের পরিবেশগত প্রভাবকে জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত ধারাবাহিকভাবে বিশ্লেষণ করা হবে।
তবে কাজটি জিনোম প্রকল্পের চেয়ে অনেক কঠিন। কারণ এখানে স্থানীয় রাসায়নিক ঘনত্ব থেকে শুরু করে মানুষের সামাজিক সম্পর্ক—অসংখ্য ভিন্ন ধরনের তথ্য সংগ্রহ ও বিশ্লেষণ করতে হবে। এরপর দেখতে হবে এগুলো কীভাবে জিনের সঙ্গে মিলে রোগ সৃষ্টি করে।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার বড় ভূমিকা
বিশাল ও বিচিত্র তথ্য বিশ্লেষণে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাকেই প্রধান ভরসা হিসেবে দেখছেন গবেষকেরা। বড় ভাষা মডেলের মতো পদ্ধতি ব্যবহার করে পরিবেশগত নানা উপাদান ও রোগের মধ্যে সম্পর্ক খুঁজে বের করা সম্ভব হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
রক্তের রাসায়নিক বিশ্লেষণ থেকে শুরু করে বিপাকীয় উপাদান—সবকিছু মিলিয়ে সম্ভাব্য ঝুঁকি শনাক্ত করা যাবে। ইতিমধ্যে হৃদরোগের ক্ষেত্রে ধূমপান, বায়ুদূষণ ও সীসার বাইরে নতুন ঝুঁকির ইঙ্গিতও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা দিয়েছে।

ডেটার বিশৃঙ্খলা কাটানোর চ্যালেঞ্জ
দশকের পর দশক ধরে বিপুল তথ্য সংগ্রহ হলেও পদ্ধতি ও বিন্যাসের অসঙ্গতির কারণে সেগুলো একত্র করা কঠিন। তবে নতুন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা প্রযুক্তি বড় পরিসরে এসব তথ্য বিশ্লেষণ করে নতুন ধারণা তৈরি করতে পারছে।
টমাস হার্টাংয়ের দল নতুন অণুর বিষাক্ততা পূর্বাভাসেও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার করছে। ২০১৫ সালে যেখানে পূর্বাভাসের সঠিকতা ছিল ৬৫ শতাংশ, সাম্প্রতিক সংস্করণে তা বেড়ে হয়েছে ৯১ শতাংশ।
প্রযুক্তির অগ্রগতি ও নতুন তথ্যের প্রয়োজন
পরিবেশগত তথ্য সংগ্রহের প্রযুক্তিও উন্নত হচ্ছে। রাসায়নিক দূষণ শনাক্তে ব্যবহৃত যন্ত্রের সংবেদনশীলতা প্রতি তিন থেকে চার বছরে প্রায় দ্বিগুণ হচ্ছে। একই সঙ্গে দূষণ শনাক্তকারী সেন্সর ছোট, সস্তা ও বেতার সংযোগযোগ্য হয়ে উঠছে।
এসব সেন্সর পরিবেশে ছড়িয়ে দেওয়া বা পরিধানযোগ্য যন্ত্রে বসিয়ে ব্যক্তিগত এক্সপোজার মাপা সম্ভব হবে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম থেকেও গুরুত্বপূর্ণ মানসিক ও সামাজিক তথ্য পাওয়া যেতে পারে—যদি ব্যবহারকারীরা অনুমতি দেন।

বায়োব্যাংকের বিস্তার
বিশ্বজুড়ে বড় গবেষণা ভান্ডার বা বায়োব্যাংক দ্রুত বাড়ছে। এগুলো অংশগ্রহণকারীদের চিকিৎসা ইতিহাস, জিনগত তথ্য, টিস্যু নমুনা ও পরিবেশসংক্রান্ত তথ্য একসঙ্গে সংগ্রহ করে। যুক্তরাজ্য ও চীনের দুটি বড় বায়োব্যাংক ইতিমধ্যে পাঁচ লাখের বেশি মানুষকে পর্যবেক্ষণে রেখেছে।
অর্থ ও রাজনীতির বাধা
এই উদ্যোগের বড় চ্যালেঞ্জ অর্থায়ন। জিনোম প্রকল্পের শুরু থেকেই শক্তিশালী অর্থদাতা ছিল, কিন্তু এক্সপোজোমিক্স এখনো সীমিত তহবিলে চলছে। যুক্তরাষ্ট্রে নেক্সাস নামে একটি নেটওয়ার্ক গড়া হলেও তহবিল তুলনামূলক কম।
অন্যদিকে ইউরোপ তুলনামূলক এগিয়ে। ইউরোপীয় মানব এক্সপোজোম নেটওয়ার্কের ধারাবাহিকতায় নতুন প্রকল্প শুরু হয়েছে, যা এ ক্ষেত্রকে গতি দিচ্ছে।
ভবিষ্যৎ কতটা উজ্জ্বল
এক্সপোজোমিক্স শেষ পর্যন্ত স্বতন্ত্র বিজ্ঞান শাখা হিসেবে প্রতিষ্ঠা পাবে কি না, তা এখনো অনিশ্চিত। তবে পরিবেশ ও মানবস্বাস্থ্যের সম্পর্ককে একীভূতভাবে বোঝার যে চেষ্টা শুরু হয়েছে, তা বিজ্ঞানকে নতুন পথে নিয়ে যেতে পারে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















