কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা সাম্প্রতিক বছরগুলোতে অভূতপূর্ব অগ্রগতি করেছে। একসময় কৌতূহলের বিষয় ছিল যে বৃহৎ ভাষা মডেলগুলো—আজ তারা সফটওয়্যার লেখে, গবেষণায় সহায়তা করে, বিপুল তথ্য বিশ্লেষণ করে, এমনকি ছবি-অডিও-ভিডিও একসঙ্গে বোঝে। ভাষা, যুক্তি ও সৃজনশীলতা—যা আমরা মানুষের বৈশিষ্ট্য ভাবতাম—এখন যন্ত্রেও দৃশ্যমান। কিন্তু প্রশ্ন রয়ে যায়: এআই কি সত্যিই মানব মস্তিষ্কের মতো কাজ করে?
নিউরনের ধারণা থেকে ট্রান্সফর্মার
আধুনিক এআইয়ের ভিত্তি নতুন নয়। ১৯৪৩ সালে ওয়ারেন ম্যাককালক ও ওয়াল্টার পিটস গাণিতিক নিউরন মডেল প্রস্তাব করেন—সংখ্যাগত ইনপুট, ওজন, যোগফল ও নন-লিনিয়ার আউটপুট। এই সরল এককগুলো একত্রে জটিল ফাংশন অনুকরণ করতে পারে—এটিই ‘ইউনিভার্সাল অ্যাপ্রক্সিমেশন’ ধারণা।
গত ১৫ বছরে পরিবর্তন এসেছে কম্পিউটিং শক্তি ও ডেটার প্রাচুর্যে। জিপিইউ-নির্ভর প্রশিক্ষণ, কনভলিউশনাল ও রিকারেন্ট নেটওয়ার্কের উন্নয়ন, এবং সবচেয়ে বড় ব্রেকথ্রু—ট্রান্সফর্মার আর্কিটেকচার ও ‘অ্যাটেনশন’ মেকানিজম। জিপিটি (Generative Pretrained Transformer) বিশাল টেক্সট করপাসে পরবর্তী শব্দ অনুমান করতে শিখে ব্যাকরণ, তথ্য, ধারণা ও আংশিক যুক্তি আয়ত্ত করে।
পরিসরে কাছাকাছি, প্রক্রিয়ায় ভিন্ন
জিপিটি-৩-এ ছিল ১৭৫ বিলিয়ন প্যারামিটার; নতুন মডেলগুলো ট্রিলিয়ন ছুঁয়েছে—মানব মস্তিষ্কের প্রায় ১০০ ট্রিলিয়ন সিন্যাপ্সের সঙ্গে সংখ্যাগত তুলনা টানা হয়। তবু নকশায় পার্থক্য মৌলিক।

বৃহৎ ভাষা মডেল সাধারণত ‘ফিডফরওয়ার্ড’—ইনপুট স্তর থেকে স্তরে গড়িয়ে আউটপুট। এটি স্কেল ও সমান্তরাল প্রশিক্ষণে কার্যকর। মানব মস্তিষ্ক, উল্টোভাবে, ঘন ফিডব্যাক লুপে কাজ করে। সংবেদন থেকে উচ্চতর অঞ্চলে সংকেত যায়, আবার পেছনেও ফিরে আসে। উপলব্ধি তাই একমুখী নয়; প্রেক্ষাপট তাৎক্ষণিকভাবে অর্থ গড়ে তোলে। ‘হ্যারি’ শব্দটি জাদুবিদ্যার গল্পে এক অর্থ, রাজপরিবারের প্রতিবেদনে আরেক অর্থ—প্রত্যাশা ও অভিজ্ঞতা মিলে অর্থ নির্মাণ করে।
রাসায়নিক নিয়ন্ত্রণ ও শক্তি দক্ষতা
মস্তিষ্কে অ্যাসিটাইলকোলিন অনিশ্চয়তা ট্র্যাক করে, নরএপিনেফ্রিন প্রেক্ষাপট বদলালে প্রতিক্রিয়া বদলায়, ডোপামিন পুরস্কার-ভিত্তিক শেখা নিয়ন্ত্রণ করে। নিউরন স্পাইক-ভিত্তিক, ইভেন্ট-ড্রিভেন সংকেত পাঠায়—সব সময় সক্রিয় থাকে না। স্মৃতি ও গণনা সিন্যাপ্সেই সহাবস্থান করে; শেখা স্থানীয় সংযোগে ঘটে।
মাত্র প্রায় ২০ ওয়াট শক্তিতে মস্তিষ্ক কাজ করে। বিপরীতে বৃহৎ এআই মডেল প্রশিক্ষণ ও চালাতে ডেটা সেন্টারে মেগাওয়াট বিদ্যুৎ লাগে। তারা ট্রিলিয়ন শব্দে প্রশিক্ষিত; মানুষ জীবদ্দশায় তার ভগ্নাংশ দেখে, তবু নমনীয় বোঝাপড়া গড়ে তোলে।
জীববিজ্ঞানের অনুকরণ, তবু সীমা
নতুন এআই স্থাপত্যে ‘মিক্সচার অব এক্সপার্টস’—নির্দিষ্ট কাজের জন্য নেটওয়ার্কের বিশেষায়িত অংশ সক্রিয় হয়—মস্তিষ্কের মডুলারিটির অনুকরণ। নিউরোমরফিক চিপ স্পাইক-সদৃশ অপারেশনে শক্তি খরচ কমাতে চায়। তবু এগুলো আনুমানিকতা। প্রকৃত রিকারেন্স প্রশিক্ষণ ও স্কেলে জটিল; অধিকাংশ এলএলএম গভীর ফিডফরওয়ার্ড কাঠামোয় নির্ভর করে।
জৈব নিউরন জটিল বায়োকেমিক্যাল সিস্টেম; কৃত্রিম নিউরন সরল গাণিতিক একক। ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত—এআই কি মস্তিষ্ককে ছাড়িয়ে যাবে, নাকি সম্পূর্ণ ভিন্ন পথে বিকশিত হবে? হয়তো লক্ষ্য ‘মস্তিষ্কের মতো হওয়া’ নয়; বরং কার্যকর বুদ্ধিমত্তা গড়া। পেসমেকার হৃদযন্ত্রের মতো নয়, তবু হৃদস্পন্দন টিকিয়ে রাখে। তেমনি এআই মানব জ্ঞানকে অনুকরণ, সম্প্রসারণ বা সহায়তা করতে পারে—জৈব অনুকৃতি ছাড়াই।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















