আফগানিস্তানে মেয়েদের জন্য মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষার দরজা বন্ধ হওয়ার প্রায় পাঁচ বছর পার হয়ে গেছে। এই দীর্ঘ সময়ে হাজার হাজার কিশোরীর জীবন বদলে গেছে ভয়, অনিশ্চয়তা আর জোরপূর্বক বিয়ের চাপে। শিক্ষা থেকে দূরে সরে গিয়ে অনেকেই এখন এমন এক জীবনের মুখোমুখি, যেখানে নিজের স্বপ্ন দেখাও যেন অপরাধ।
দেশটির এক তরুণী আলিয়া, নিরাপত্তার কারণে যার নাম পরিবর্তন করা হয়েছে, নিজের গ্রাম ছেড়ে রাজধানী কাবুলে পালিয়ে আসেন শুধুমাত্র বিয়ে এড়াতে। পরিবারের চাপ থেকে বাঁচতে তিনি এক আত্মীয়কে সঙ্গে নিয়ে দীর্ঘ পথ পাড়ি দেন। আফগানিস্তানের কঠোর নিয়ম অনুযায়ী, কোনো নারী পুরুষ অভিভাবক ছাড়া দূরপাল্লার ভ্রমণ করতে পারেন না। তবুও ঝুঁকি নিয়েই তিনি কাবুলে পৌঁছান।
স্বপ্ন থেকে বাস্তবের দূরত্ব

আলিয়ার স্বপ্ন ছিল পাইলট হওয়ার। কিন্তু বর্তমান বাস্তবতায় সেই স্বপ্ন এখন প্রায় অসম্ভব। তিনি একটি ইংরেজি ভাষার কোর্সে ভর্তি হয়েছেন, কারণ মেয়েদের জন্য এখন এ ধরনের ছোটখাটো কোর্স বা ধর্মীয় শিক্ষাকেন্দ্র ছাড়া আর কোনো শিক্ষার সুযোগ নেই। তবে এগুলো কখনোই পূর্ণাঙ্গ শিক্ষার বিকল্প নয়।
আলিয়া বলেন, আগে তার পরিবার তাকে লেখাপড়ায় উৎসাহ দিত। কিন্তু এখন তার বাবা-মাও মনে করেন, বিয়েই মেয়েদের ভবিষ্যৎ। কারণ স্কুল নেই, বিশ্ববিদ্যালয় নেই, চাকরির সুযোগও নেই। ফলে মেয়েদের জন্য বিয়েই যেন একমাত্র পথ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
জোরপূর্বক বিয়ের ভয়
আরেক তরুণী শামার জীবনও একইভাবে বদলে গেছে। ডাক্তার হওয়ার স্বপ্ন ছিল তার। কিন্তু শিক্ষার সুযোগ বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর পরিবার তাকে বিয়ে দিতে বাধ্য হয়। এখন তিনি দুই সন্তানের মা। নিজের অসমাপ্ত স্বপ্নের কথা বলতে গিয়ে তিনি জানান, তিনি যেন ঘরের ভেতর বন্দি হয়ে গেছেন। তার কাছে জীবন এখন শুধুই সন্তানদের ঘিরে।

শামার মা কামিলা বলেন, মেয়েকে বিয়ে দেওয়া ছাড়া তার আর কোনো পথ ছিল না। তিনি আশঙ্কা করতেন, অবিবাহিত মেয়েকে নিয়ে সমাজ ও শাসকগোষ্ঠীর চাপ বাড়তে পারে। অথচ তিনি নিজে নিরক্ষর হওয়ায় সবসময় চেয়েছিলেন মেয়েরা যেন শিক্ষিত হয়ে নিজের পায়ে দাঁড়াতে পারে।
অপেক্ষা, কিন্তু কোনো আশার আলো নেই
আফগানিস্তানের বহু কিশোরী এখন প্রতিদিন অপেক্ষা করছে স্কুল খুলে দেওয়ার ঘোষণার জন্য। কিন্তু বছরের পর বছর কেটে গেলেও বাস্তবে কোনো পরিবর্তন আসেনি। অনেকের বিশ্বাস, বর্তমান পরিস্থিতিতে আর কখনোই তারা স্কুলে ফিরতে পারবে না।
জাতিসংঘের আশঙ্কা, এই নিষেধাজ্ঞা চলতে থাকলে ২০৩০ সালের মধ্যে ২০ লাখের বেশি মেয়ে প্রাথমিক শিক্ষার পর আর কোনো শিক্ষা পাবে না। এমনিতেই দেশটিতে নারীদের সাক্ষরতার হার বিশ্বের অন্যতম কম।
নারীদের জনজীবন থেকে সরিয়ে দেওয়া হচ্ছে

শুধু শিক্ষাই নয়, আফগান নারীদের ওপর আরও নানা ধরনের বিধিনিষেধ জারি রয়েছে। অনেক এলাকায় নারীদের চলাফেরা, কাজ করা বা প্রকাশ্যে উপস্থিত হওয়ার ক্ষেত্রেও কড়াকড়ি রয়েছে। ফলে ধীরে ধীরে জনজীবন থেকে নারীদের উপস্থিতি প্রায় অদৃশ্য হয়ে যাচ্ছে।
এদিকে সম্প্রতি এমন কিছু আইন কার্যকর করা হয়েছে, যা অপ্রাপ্তবয়স্ক মেয়েদের বিয়েকে আরও সহজ করে দিতে পারে বলে আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। ফলে জোরপূর্বক ও অল্প বয়সে বিয়ের ঘটনা বাড়ছে বলে মনে করছেন অনেকে।
হতাশার মধ্যে প্রশ্ন
আলিয়া এখনো নিজের স্বপ্ন ছাড়তে চান না। তিনি বলেন, যদি পরিবার জোর না করে, তাহলে শেষ পর্যন্ত তিনি বিয়ে প্রতিরোধ করার চেষ্টা করবেন। তবে ভবিষ্যৎ নিয়ে তার ভেতরে ভয় ও অনিশ্চয়তা কাজ করছে।
অন্যদিকে নোরা নামের আরেক তরুণীর প্রশ্ন, “আমরা কেন আফগানিস্তানে জন্ম নিলাম?” এই প্রশ্নই যেন আজকের আফগান কিশোরীদের অসহায় বাস্তবতাকে সবচেয়ে স্পষ্টভাবে তুলে ধরে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















