আফগানিস্তানে মেয়েদের মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বন্ধ থাকার দীর্ঘ প্রভাব এখন আরও স্পষ্ট হয়ে উঠছে। স্কুল-কলেজের দরজা বন্ধ হয়ে যাওয়ায় হাজার হাজার কিশোরীর জীবনে বিয়ে যেন একমাত্র পথ হয়ে দাঁড়িয়েছে। কেউ বাধ্য হয়ে বিয়ে করছে, কেউ পরিবার ও সমাজের চাপ এড়াতে ঘর ছেড়ে পালানোর পথ বেছে নিচ্ছে।
১৯ বছর বয়সী আলিয়া নিজের গ্রামের বাড়ি ছেড়ে রাজধানী কাবুলে চলে আসে শুধুমাত্র বাল্যবিয়ে এড়ানোর জন্য। পরিবারের কাছে বন্ধুর সঙ্গে দেখা করার কথা বললেও তার প্রকৃত উদ্দেশ্য ছিল অন্য। সে ভয় পাচ্ছিল, গ্রামে থাকলে তাকে জোর করে বিয়ে দেওয়া হবে। কাবুলে এসে সে একটি ইংরেজি ভাষা শিক্ষার কোর্সে ভর্তি হয়। এখন এই ধরনের ছোট কোর্স বা ধর্মীয় শিক্ষাকেন্দ্রই আফগান মেয়েদের জন্য সীমিত শিক্ষার একমাত্র সুযোগ হয়ে আছে।
স্বপ্ন থেকে বাস্তবতার দূরত্ব
আলিয়ার স্বপ্ন ছিল পাইলট হওয়ার। একসময় তার পরিবারও সেই স্বপ্নকে সমর্থন করত। কিন্তু এখন পরিস্থিতি বদলে গেছে। পরিবার বলছে, স্কুল-কলেজ বা চাকরির সুযোগ না থাকায় বিয়েই তার ভবিষ্যৎ নিরাপত্তার একমাত্র পথ। ইতোমধ্যে তার জন্য একাধিক বিয়ের প্রস্তাব এসেছে। তবে আলিয়া এখনও নিজের স্বপ্ন ছাড়তে রাজি নয়।
তার আশঙ্কা, বিয়ের পর হয়তো আর নিজের মতো করে বাঁচার সুযোগ থাকবে না। অনেক পরিবার মেয়েদের কঠোর নিয়ন্ত্রণে রাখে। তাই সে এখনও প্রতিরোধ চালিয়ে যেতে চায়।
শিক্ষা বন্ধ, বদলে গেছে জীবনের গতি
কাবুলের আরেক তরুণী শামার জীবনও একই বাস্তবতার প্রতিচ্ছবি। স্কুল বন্ধ হওয়ার পর ১৮ বছর বয়সেই তাকে বিয়ে দেওয়া হয়। একসময় চিকিৎসক হওয়ার স্বপ্ন দেখা শামা এখন দুই সন্তানের মা। তার কথায়, যদি স্কুল বন্ধ না হতো, তাহলে হয়তো সে পড়াশোনার শেষ পর্যায়ে থাকত।
শামার মা নিজেও নিরক্ষর। স্বামীর মৃত্যুর পর কষ্ট করে মেয়েদের পড়াশোনা চালিয়েছিলেন। কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতিতে মেয়েকে অবিবাহিত রাখা নিয়ে তিনি ভয় পেতে শুরু করেন। সমাজ ও শাসকগোষ্ঠীর চাপ তাকে সিদ্ধান্ত বদলাতে বাধ্য করেছে।
অপেক্ষা আর অনিশ্চয়তা
শামার ছোট বোন নোরাও একই আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছে। তার বয়স মাত্র ১৮, কিন্তু পরিবার থেকে বিয়ের চাপ বাড়ছে। সে আবার স্কুলে ফিরতে চাইলেও ভবিষ্যৎ নিয়ে আশাবাদী হতে পারছে না। তার ভাষায়, প্রতিদিন মনে হয় যেন কারাগারের ভেতরে আটকে আছে।
আফগানিস্তানে মেয়েদের মাধ্যমিক শিক্ষা বন্ধ রয়েছে প্রায় পাঁচ বছর। এই দীর্ঘ সময় ধরে নানা ব্যাখ্যা এলেও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান আর খুলে দেওয়া হয়নি। ফলে একটি পুরো প্রজন্মের ভবিষ্যৎ অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়ে গেছে।

জনজীবন থেকে হারিয়ে যাচ্ছে নারীরা
শুধু শিক্ষা নয়, নারীদের চলাফেরা, কাজ এবং সামাজিক উপস্থিতির ওপরও কড়াকড়ি বাড়ছে। বিভিন্ন বিধিনিষেধের কারণে নারীরা ধীরে ধীরে জনজীবন থেকে হারিয়ে যাচ্ছে। অনেক পরিবার মেয়েদের বাইরে পাঠাতেই ভয় পাচ্ছে।
আফগান তরুণীদের বড় অংশ এখন মনে করছে, বিশ্ব তাদের ভুলে গেছে। তাদের কণ্ঠে হতাশা, ক্ষোভ এবং ভবিষ্যৎ হারানোর বেদনা স্পষ্ট। কেউ কেউ প্রশ্ন তুলছে, কেন তাদের জন্ম এমন এক দেশে, যেখানে স্বপ্ন দেখা পর্যন্ত কঠিন হয়ে উঠেছে।
আফগানিস্তানের এই বাস্তবতা শুধু একটি দেশের সংকট নয়, এটি নারীশিক্ষা ও মানবাধিকারের বড় এক বৈশ্বিক প্রশ্ন হিসেবেও সামনে আসছে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















