ভারতের রাজধানী দিল্লির অন্যতম ঐতিহাসিক ও অভিজাত প্রতিষ্ঠান জিমখানা ক্লাব এখন অস্তিত্ব সংকটে। কেন্দ্রীয় সরকারের উচ্ছেদ নোটিশ ঘিরে শুরু হয়েছে তীব্র বিতর্ক। একদিকে নিরাপত্তা ও সরকারি প্রয়োজনের যুক্তি, অন্যদিকে শতবর্ষী ঐতিহ্য ও স্মৃতির প্রশ্ন—দুইয়ের সংঘাতে আলোচনার কেন্দ্রে উঠে এসেছে দিল্লির এই বিখ্যাত ক্লাব।
সরকার ইতোমধ্যে ক্লাব কর্তৃপক্ষকে আগামী ৫ জুনের মধ্যে ২৭ একর জমি খালি করার নির্দেশ দিয়েছে। সরকারের দাবি, প্রধানমন্ত্রীর বাসভবনের কাছাকাছি এই এলাকা কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং জাতীয় নিরাপত্তা ও প্রতিরক্ষা অবকাঠামোর প্রয়োজনে জমিটি দরকার।
ঐতিহ্যের প্রতীক হয়ে ওঠা এক ক্লাব

১৯১৩ সালে প্রতিষ্ঠিত এই ক্লাবটি ব্রিটিশ আমলে “ইম্পেরিয়াল দিল্লি জিমখানা ক্লাব” নামে পরিচিত ছিল। পরে স্বাধীনতার পর নাম থেকে “ইম্পেরিয়াল” শব্দটি বাদ দেওয়া হলেও ক্লাবের অভিজাত পরিবেশ ও ঐতিহ্য রয়ে যায় আগের মতোই।
দিল্লির কেন্দ্রস্থলে অবস্থিত এই ক্লাব বহু দশক ধরে অবসরপ্রাপ্ত সেনা কর্মকর্তা, কূটনীতিক, আমলা ও ব্যবসায়ী পরিবারগুলোর সামাজিক আড্ডাকেন্দ্র হিসেবে পরিচিত। বিশাল সবুজ চত্বর, পুরোনো স্থাপত্য, প্রশস্ত বারান্দা ও নীরব পরিবেশের কারণে এটি রাজধানীর এক বিশেষ পরিচয়ের অংশ হয়ে ওঠে।
অনেকের মতে, দিল্লির দ্রুত পরিবর্তনের মাঝেও জিমখানা ক্লাব যেন পুরোনো শহরের স্মৃতিকে ধরে রেখেছিল।
সদস্যপদ ঘিরে বিতর্ক

জিমখানা ক্লাবের সদস্য হওয়া বরাবরই কঠিন ছিল। আবেদনকারীদের জন্য প্রয়োজন হতো বিদ্যমান সদস্যদের সুপারিশ ও অনুমোদন। এই প্রক্রিয়াকে ঘিরে দীর্ঘদিন ধরে সমালোচনা ছিল যে, এটি মূলত প্রভাবশালী ও অভিজাত শ্রেণির জন্য সংরক্ষিত একটি জায়গায় পরিণত হয়েছিল।
অনেকের মতে, এই ক্লাব দিল্লির ক্ষমতাকেন্দ্রিক সংস্কৃতির প্রতীক হয়ে উঠেছিল। আবার অন্যরা মনে করেন, এটি ছিল সামাজিক ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের অংশ, যেখানে প্রজন্মের পর প্রজন্ম স্মৃতি তৈরি হয়েছে।
সরকারের কড়া অবস্থান
গত কয়েক বছর ধরেই ক্লাবটির আর্থিক অনিয়ম ও সদস্যপদ নীতির বিষয়ে তদন্ত চলছিল। এরই ধারাবাহিকতায় সরকার পরিচালনা কমিটি ভেঙে প্রশাসক নিয়োগ দেয়। সর্বশেষ উচ্ছেদ নোটিশ সেই বিতর্ককে আরও তীব্র করেছে।
সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, জমিটি সরকারের মালিকানাধীন এবং আইন অনুযায়ী সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। তবে সমালোচকরা বলছেন, ঐতিহাসিক প্রতিষ্ঠানটি সংস্কারের মাধ্যমে আরও উন্মুক্ত করা যেত, সম্পূর্ণ বন্ধের পথে না গিয়ে।

দিল্লির স্মৃতির সঙ্গে জড়িয়ে থাকা এক নাম
জিমখানা ক্লাব নিয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যেও এখন নস্টালজিয়া কাজ করছে। অনেকেই বলছেন, দিল্লির পুরোনো সংস্কৃতি ও সামাজিক ইতিহাসের একটি অংশ হারিয়ে যেতে পারে।
দিল্লির বহু পুরোনো স্থাপনা, সিনেমা হল ও সাংস্কৃতিক কেন্দ্র ইতোমধ্যে হারিয়ে গেছে। সেই তালিকায় জিমখানা ক্লাবও যুক্ত হলে শহরটি আরও একটি ঐতিহাসিক পরিচয় হারাবে বলে আশঙ্কা করছেন অনেকে।
এখন আদালতের সিদ্ধান্তের দিকেই তাকিয়ে আছে ক্লাবের সদস্য ও দিল্লিবাসী। কারণ এই ক্লাব শুধু একটি ভবন নয়, বরং বহু মানুষের কাছে এটি স্মৃতি, ইতিহাস ও এক সময়ের দিল্লির প্রতিচ্ছবি।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















