নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জে চাঁদা না দেওয়ায় একটি রপ্তানিমুখী কারখানায় হামলা, ভাঙচুর ও লুটপাটের অভিযোগ উঠেছে। হামলার ঘটনায় প্রধান আসামিকে গ্রেপ্তার করেও ছেড়ে দেওয়ার অভিযোগে এলাকায় ব্যাপক আলোচনা ও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। শিল্পাঞ্চলজুড়ে নিরাপত্তা ও চাঁদাবাজি ইস্যু নতুন করে সামনে এসেছে।
রপ্তানিমুখী কারখানায় দেড় ঘণ্টার তাণ্ডব
কারখানার নাম বিএলও ওয়্যার নেইল ইন্ডাস্ট্রিজ। এখানে জিআই তার উৎপাদন হয়, যা সুইজারল্যান্ড ও জার্মানিসহ ১২টি দেশে রপ্তানি করা হয়। কারখানার মালিক শারীরিক প্রতিবন্ধী মনোয়ার হোসেন ওরফে অপু।
কারখানা কর্তৃপক্ষের দাবি, ১৭ ফেব্রুয়ারি সকাল ১১টার দিকে ১৫ থেকে ২০ জনের একটি দল কারখানায় হামলা চালায়। দেড় ঘণ্টা ধরে চলে ভাঙচুর ও লুটপাট। হামলাকারীরা প্রধান ফটক ও সীমানাপ্রাচীর ভেঙে ভেতরে ঢুকে পড়ে। বাধা দিতে গেলে ব্যবস্থাপক অলিউল্লাহ খানকে মারধর করা হয়। তাঁকে বাঁচাতে গেলে কর্মচারী জুলহাস উদ্দিনও আহত হন। পরে তাঁদের হাসপাতালে ভর্তি করা হয়।

কারখানার সিসিটিভি ক্যামেরা ভেঙে ফেলা হয়, আসবাবপত্র নষ্ট করা হয় এবং ট্রাক এনে মূল্যবান যন্ত্রপাতি ও কাঁচামাল নিয়ে যাওয়া হয়। মালিকের অভিযোগ, নগদ অর্থসহ প্রায় ১ কোটি ৬৬ লাখ টাকার পণ্য লুট হয়েছে। হামলার পর দুই দিন উৎপাদন বন্ধ থাকে। পরে শিল্প পুলিশের পাহারায় সীমিত আকারে উৎপাদন শুরু হয়।

চাঁদা দাবি ও রাজনৈতিক নাম ব্যবহারের অভিযোগ
কারখানা মালিকের দাবি, স্থানীয় কিছু ব্যক্তি উপজেলা বিএনপির সভাপতি মাহফুজুর রহমানের নাম ব্যবহার করে তাঁর কাছে এককালীন ১০ লাখ টাকা এবং মাসে ১ লাখ টাকা করে চাঁদা দাবি করেন। চাঁদা না দেওয়ায় এই হামলা চালানো হয়েছে বলে অভিযোগ।
মামলায় উপজেলা বিএনপির সহসভাপতি বেলায়েত আকনকে প্রধান আসামি করা হয়েছে। এ ছাড়া কাজল আকন, নিশাত আকন, সজল হোসেনসহ কয়েকজনের নাম এজাহারে রয়েছে। অধিকাংশের বাড়ি জিন্দা গ্রামে।
মালিকের অভিযোগ, তিনি একাধিকবার বিষয়টি জানালেও কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। বরং অভিযুক্তদের সঙ্গে মীমাংসার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল। এমনকি মামলা করার সময় হুকুমের আসামি হিসেবে এক প্রভাবশালী নেতার নাম অন্তর্ভুক্ত করতে চাইলেও তা নেওয়া হয়নি বলেও অভিযোগ তোলেন তিনি।
পুলিশের বক্তব্য ও গ্রেপ্তার বিতর্ক
রূপগঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মো. সবজেল হোসেন বলেন, মামলায় সত্য ঘটনা দেওয়ার কথাই বলা হয়েছে, কারও নাম বাদ দিতে বলা হয়নি। তিনি জানান, এখন পর্যন্ত কাউকে গ্রেপ্তার করা হয়নি এবং মামলাটি গুরুত্ব দিয়ে দেখা হচ্ছে।

তবে স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রধান আসামি বেলায়েত আকনকে জিন্দাপার্ক এলাকা থেকে আটক করা হলেও কিছুক্ষণ পর ছেড়ে দেওয়া হয়। এ বিষয়ে ওসি বলেন, প্রধান আসামিকে ধরে ছেড়ে দেওয়ার অভিযোগ সঠিক নয়, ভিড়ের মধ্যে কেউ কৌশলে সরে যেতে পারে।
জেলার পুলিশ সুপার মোহাম্মদ মিজানুর রহমান মুন্সী জানিয়েছেন, বিষয়টি তিনি খোঁজ রাখছেন এবং প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
বিএনপির প্রতিক্রিয়া
উপজেলা বিএনপির সভাপতি মাহফুজুর রহমান অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, কারখানা মালিককে তিনি চেনেন না। চাঁদা দাবির বিষয়টি সম্পূর্ণ মিথ্যা। ঘটনার দিন থানা থেকে ফোন পেয়ে তিনি খোঁজ নিতে লোক পাঠিয়েছিলেন বলেও দাবি করেন।
অন্যদিকে জেলা বিএনপির সভাপতি মামুন মাহমুদ বলেন, অভিযোগ সত্য হলে তা ফৌজদারি অপরাধ। জড়িতরা যত বড় নেতাই হোন না কেন, দল তাদের ছাড় দেবে না এবং দলীয়ভাবেও তদন্ত করা হবে।
ব্যবসায়ীদের মধ্যে আতঙ্ক
কারখানায় হামলার ঘটনায় স্থানীয় ব্যবসায়ীদের মধ্যে উদ্বেগ বেড়েছে। অনেকেই বলছেন, বিভিন্নভাবে চাঁদা দেওয়ার চাপ থাকলেও এভাবে প্রকাশ্য হামলা ও লুটপাট শিল্পাঞ্চলের জন্য অশনিসংকেত। নিরাপত্তা ও বিনিয়োগ পরিবেশ নিয়ে প্রশ্ন উঠছে নতুন করে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















