বিশ্বের বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ বন সুন্দরবনে আবারও মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে বনদস্যুতা। অপহরণ, মুক্তিপণ দাবি ও অস্ত্রের ভয় দেখিয়ে লুটপাটে অস্থির হয়ে উঠেছে বনাঞ্চল ও উপকূল। বঙ্গোপসাগর থেকে অপহৃত ২০ জেলের এখনও মুক্তি মেলেনি। এমন পরিস্থিতিতে যৌথ বাহিনী সুন্দরবনের বিভিন্ন এলাকায় শুরু করেছে সাঁড়াশি তল্লাশি অভিযান। তবুও প্রথম দফায় মেলেনি কোনো সাফল্য।
দস্যুদের পুনরুত্থান, আতঙ্কে ২০ হাজার জেলে পরিবার
স্থানীয় বনজীবীদের অভিযোগ, নজরদারির ঘাটতিতে নতুন ও পুরোনো মিলিয়ে অন্তত ২০টি দস্যু বাহিনী সক্রিয় হয়ে উঠেছে। গত এক সপ্তাহেই অন্তত ৫০ জেলেকে অপহরণ করা হয়েছে বলে দাবি তাদের। জেলেরা বলছেন, মুক্তিপণের টাকা না দিলে মারধর ও নির্যাতনের শিকার হতে হচ্ছে। ফলে সাগর ও নদীতে মাছ ধরা কার্যত বন্ধ হয়ে গেছে। উপকূলজুড়ে প্রায় ২০ হাজার জেলে ও তাদের পরিবার এখন চরম অনিশ্চয়তায় দিন কাটাচ্ছেন।
২০১৮ সালে দস্যুমুক্ত ঘোষণার পর দীর্ঘ ছয় বছর শান্ত ছিল সুন্দরবন। কিন্তু ২০২৪ সালের আগস্টের পর পাল্টে যায় চিত্র। আত্মসমর্পণ করা কয়েকজন আবারও দস্যুতায় ফিরে আসার অভিযোগ উঠেছে। বনজীবীদের ভাষ্য, অন্তত ১৩ জন সাবেক দস্যু আবার সক্রিয় হয়েছেন। এতে করে বনাঞ্চলে তৈরি হয়েছে নতুন করে আতঙ্কের রাজত্ব।

১০ দিনেও ফেরেননি অপহৃত ২০ জেলে
১৬ ফেব্রুয়ারি রাতে বঙ্গোপসাগরে মাছ ধরার সময় ২০টি ট্রলার থেকে ২০ জেলেকে অপহরণ করা হয়। অপহরণকারীরা প্রতি ট্রলারের জন্য সাড়ে তিন লাখ টাকা করে মুক্তিপণ দাবি করেছে। মোট দাবি করা হয়েছে প্রায় ৭০ লাখ টাকা। মহাজনদের সঙ্গে দস্যুদের দরকষাকষি চলছে, তবে এখনো নির্দিষ্ট সময়সীমা দেয়নি অপহরণকারীরা। এই অনিশ্চয়তায় জেলেদের পরিবার দিশাহারা।
শরণখোলা রেঞ্জসহ উপকূলীয় এলাকায় মাছ ধরা বন্ধ থাকায় দেশের বৃহত্তম শুঁটকি উৎপাদন কেন্দ্রে দেখা দিয়েছে মাছের সংকট। ব্যবসায়ীরা লোকসানে পড়েছেন, হাজারো জেলে পড়েছেন আর্থিক বিপর্যয়ে। দুবলা, হারবাড়িয়া, কোকিলমনি, নন্দবরা ও জোংড়া এলাকার গভীর খালে যৌথ বাহিনী অভিযান চালালেও প্রথম দিনে কাউকে উদ্ধার বা আটক করা যায়নি।
২০ বাহিনীর দাপটে অশান্ত বনাঞ্চল
মুক্তিপণ দিয়ে ফেরা জেলেদের তথ্য অনুযায়ী, সুন্দরবনে বর্তমানে আসাবুর, করিম শরীফ, আবদুল্লাহ, মঞ্জুর, দয়াল, রবি, দুলাভাই, রাঙ্গা, সুমন, আনারুল, হান্নান, আলিফ, জাহাঙ্গীর, দাদাভাই, ইলিয়াস ও মজনু বাহিনীসহ আরও কয়েকটি দল সক্রিয়। প্রতিটি দলে রয়েছে ১৫ থেকে ৪০ জন সদস্য। তাদের হাতে দেশি-বিদেশি আগ্নেয়াস্ত্র রয়েছে। বিশেষ করে জাহাঙ্গীর, মঞ্জুর ও দাদাভাই বাহিনীকে সবচেয়ে দুর্ধর্ষ হিসেবে চিহ্নিত করা হচ্ছে। উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, এদের কয়েকটি দল আগে আত্মসমর্পণ করেছিল।

২০১৬ থেকে ২০১৮ সালের মধ্যে ৩২টি বাহিনীর ৩২৮ জন দস্যু অস্ত্র ও বিপুল গোলাবারুদ জমা দিয়ে আত্মসমর্পণ করেছিল। এরপর ২০১৮ সালের ১ নভেম্বর সুন্দরবনকে দস্যুমুক্ত ঘোষণা করা হয়। কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতি সেই ঘোষণাকে প্রশ্নের মুখে ফেলেছে।
সরকারের কড়া বার্তা, অভিযান চলবে
বন ও পরিবেশ সংশ্লিষ্ট দায়িত্বশীলরা জানিয়েছেন, সুন্দরবনকে আবারও দস্যুমুক্ত করতে সব ধরনের ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। জেলেদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং অপহৃতদের উদ্ধারে অভিযান অব্যাহত থাকবে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী বলছে, দস্যু দমন না হওয়া পর্যন্ত এই অভিযান চলবে।
উপকূলের অর্থনীতি, মৎস্য খাত ও জীববৈচিত্র্যের নিরাপত্তা এখন বড় চ্যালেঞ্জের মুখে। সুন্দরবনে শান্তি না ফিরলে শুধু জেলে পরিবারই নয়, ক্ষতিগ্রস্ত হবে দেশের সামুদ্রিক অর্থনীতিও।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















