১৯৭৩ সালে আরব তেলসমৃদ্ধ দেশগুলোর একটি জোট ইসরায়েলকে সমর্থন দেওয়ার অভিযোগে কিছু দেশের কাছে অপরিশোধিত তেল রপ্তানি বন্ধ করে বিশ্ব অর্থনীতিকে কার্যত জিম্মি করেছিল। জ্বালানির দাম আকাশচুম্বী হয়, পশ্চিমা অর্থনীতি কেঁপে ওঠে। আজ আশঙ্কা করা হচ্ছে, চীনও কি একই কৌশল অন্য প্রাকৃতিক সম্পদ ব্যবহার করে প্রয়োগ করতে পারে? বিশেষ করে তাইওয়ান ইস্যুতে নিজেদের লক্ষ্য পূরণে কি তারা গুরুত্বপূর্ণ খনিজ রপ্তানি অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করবে?
গত বছর বিরল মাটির ধাতু রপ্তানি সীমিত করে চীন ইতিমধ্যে তার শক্তির প্রমাণ দিয়েছে। এ প্রেক্ষাপটে যুক্তরাষ্ট্র কয়েক দশকের মধ্যে পণ্যবাজারে সবচেয়ে বড় হস্তক্ষেপের পথে হাঁটছে।
কৌশলগত লড়াই: ‘ক্রিটিক্যাল’ খনিজের দখল
এখনকার লড়াইয়ের কেন্দ্রবিন্দু ‘গুরুত্বপূর্ণ’ বা ক্রিটিক্যাল খনিজ। আধুনিক সামরিক সরঞ্জাম, বিদ্যুৎ অবকাঠামো, কম্পিউটিং ব্যবস্থা—অর্থাৎ নিরাপদ, উচ্চপ্রযুক্তি ও পরিবেশবান্ধব অর্থনীতির জন্য যেসব ধাতু অপরিহার্য, সেগুলোর জোগান নিয়েই মূল প্রতিযোগিতা।

এ ক্ষেত্রে চীনের আধিপত্য বিস্তৃত। বিশ্বের প্রায় ৮০ শতাংশ টাংস্টেন চীন উত্তোলন করে। গ্যালিয়ামের ক্ষেত্রে তাদের শোধনক্ষমতা ৯৯ শতাংশ। এই প্রভাব কমাতে যুক্তরাষ্ট্র ৬০ ধরনের খনিজের বিকল্প উৎস গড়ে তুলতে সর্বাত্মক অভিযান শুরু করেছে। দেশীয় ও বিদেশি খনিপ্রকল্পে বিলিয়ন ডলার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে। মূল্যসীমা নির্ধারণ, বাণিজ্যজোট গঠন এবং কয়েক মাসের জাতীয় চাহিদা মেটাতে বিশাল মজুত তৈরির ঘোষণাও এসেছে।
তবে প্রশ্ন উঠছে, বিচ্ছিন্ন ও ছড়ানো উদ্যোগের ওপর অতিরিক্ত নির্ভর করে যুক্তরাষ্ট্র কি বৈশ্বিক বাজারব্যবস্থার নমনীয়তা ও স্থিতিস্থাপকতাকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে না?
চীনের কৌশলগত চাপ ও পশ্চিমের দুর্বলতা
চীনের এই নিয়ন্ত্রণ পশ্চিমা বিশ্বের বড় কৌশলগত দুর্বলতা উন্মোচিত করেছে। গত এপ্রিল মাসে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্যযুদ্ধের সময় চীন সাত ধরনের গুরুত্বপূর্ণ বিরল মাটির ধাতু রপ্তানিতে বিধিনিষেধ দেয়। অক্টোবর মাসে আরও পাঁচটির ওপর নিয়ন্ত্রণ আরোপ করে। এর ফলে পেন্টাগনের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ ক্রয় কর্মসূচি ঘাটতির ঝুঁকিতে পড়ে। গাড়ি শিল্প থেকে নবায়নযোগ্য জ্বালানি—বিভিন্ন খাতেই সংকটের আশঙ্কা তৈরি হয়।
বড় ধরনের বিপর্যয়ের সম্ভাবনা তখনকার মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে শি জিনপিংয়ের সঙ্গে বাণিজ্যসমঝোতায় যেতে বাধ্য করে। একই সঙ্গে কিছু প্রযুক্তি রপ্তানির ওপর মার্কিন নিয়ন্ত্রণও শিথিল করা হয়। কিন্তু বাস্তবতা হলো, চীন চাইলে আবারও এই অস্ত্র ব্যবহার করতে পারে। সামরিক ও বেসামরিক ব্যবহারের মধ্যবর্তী ধূসর অঞ্চলে পড়ে এমন বহু বিরল খনিজের রপ্তানি এখনও সীমিত, যা পশ্চিমা পুনরায় অস্ত্রসজ্জার প্রচেষ্টাকে দুর্বল করছে।

বাজার বনাম রাষ্ট্রীয় হস্তক্ষেপ
অনেকে মনে করতে পারেন, চীনের কৌশলের জবাব হিসেবে বৈশ্বিক বাজারব্যবস্থার ওপর আরও আস্থা রাখা উচিত। ইতিহাস বলছে, বাজার বহুবার ধাক্কা সামলাতে সক্ষম হয়েছে। সত্তরের দশকের তেল সংকট পণ্যবাণিজ্য ব্যবস্থার বিকাশকে ত্বরান্বিত করে। প্রতিদিন লাখো ক্রেতা-বিক্রেতার অংশগ্রহণে কোটি কোটি ডেরিভেটিভ চুক্তির মাধ্যমে মূল্য নির্ধারিত হয়। যুদ্ধ, ধর্মঘট বা প্রাকৃতিক দুর্যোগের ধাক্কাও বাজার প্রায়ই সরকারি পরিকল্পনার চেয়ে দক্ষভাবে সামলেছে।
তবে চীনের দীর্ঘমেয়াদি কৌশল এই যুক্তিকে দুর্বল করে। দেশটি দশকের পর দশক ধরে নিজ দেশে বিনিয়োগ ও বিদেশে সম্পদ অধিগ্রহণের মাধ্যমে খনিজখাতে শক্ত ঘাঁটি গড়েছে। উৎপাদকদের একীভূত করে রাষ্ট্রনিয়ন্ত্রিত বৃহৎ প্রতিষ্ঠানে রূপ দিয়েছে। প্রয়োজনে সাময়িক লোকসান মেনে বিশ্ববাজারে অতিরিক্ত সরবরাহ ছুড়ে প্রতিদ্বন্দ্বীদের নিরুৎসাহিত করার সক্ষমতাও তাদের আছে।
তিন নীতির প্রস্তাব
এই বাস্তবতায় যুক্তরাষ্ট্রের কাজ হলো ভারসাম্য রক্ষা করা। একদিকে রপ্তানি বন্ধের ঝুঁকি থেকে সুরক্ষা, অন্যদিকে বাজারব্যবস্থাকে টিকিয়ে রাখা।
![]()
প্রথমত, ক্ষেত্র সংকুচিত করা জরুরি। ঘোষিত ৬০টি খনিজের সবকটিই সমান গুরুত্বপূর্ণ নয়। অ্যালুমিনিয়াম, সিসা বা দস্তা সহজলভ্য, পুনর্ব্যবহারযোগ্য ও বিকল্পযোগ্য। তামার মতো বিশাল শিল্পধাতুর বাজার চীনের পক্ষে পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন। তাই যুক্তরাষ্ট্রের মনোযোগ থাকা উচিত বিশেষায়িত ও অপরিহার্য ধাতুতে, বিশেষ করে কিছু বিরল মাটির উপাদানে, যেখানে চীন সহজে রপ্তানি আটকে দিতে পারে। অগ্রাধিকার পেতে পারে প্রতিরক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবা খাত। সমাপ্তির পথে থাকা প্রকল্পে বিনিয়োগ বাড়ালে দ্রুত ফল মিলবে। সরবরাহের সামান্য অংশও যদি চীনের নিয়ন্ত্রণের বাইরে আনা যায়, তাহলে তাদের একচেটিয়া ক্ষমতা ভাঙতে পারে।
দ্বিতীয়ত, সব উপকরণ ব্যবহার করতে হবে। কৌশলগত মজুত তাৎক্ষণিক সংকটে সহায়তা করতে পারে। পূর্বনির্ধারিত দামে ক্রয়চুক্তি বেসরকারি বিনিয়োগ টানতে পারে। তবে শুধু খনন নয়, শোধন ও প্রক্রিয়াকরণেও নজর দেওয়া জরুরি। অনেক শোধনাগার মূল ধাতু উৎপাদনের সময় মূল্যবান উপউৎপাদন ফেলে দেয়, কারণ প্রক্রিয়াকরণ ব্যয়বহুল। শর্তসাপেক্ষ রাষ্ট্রীয় সহায়তা এ ক্ষেত্রে পরিবর্তন আনতে পারে।
তৃতীয়ত, মূল্যসংকেত বিকৃত করা যাবে না। সরবরাহ কমে গেলে দাম বাড়বে—এই সংকেত ক্রেতা-বিক্রেতাকে সাশ্রয় ও উদ্ভাবনে উৎসাহিত করে। কৃত্রিমভাবে কম নির্দিষ্ট মূল্য নির্ধারণ করলে নির্ভরতা আরও বাড়তে পারে।

‘আমেরিকা ফার্স্ট’ বনাম জোট রাজনীতি
ট্রাম্প প্রশাসনের জাতীয় নিরাপত্তা দর্শন ‘আমেরিকা ফার্স্ট’-এ সীমাবদ্ধ। ফলে অন্যদের আগে দুষ্প্রাপ্য সম্পদ নিশ্চিত করার প্রতিযোগিতা তৈরি হয়েছে, যা মিত্রদেশগুলোর উদ্বেগ বাড়াচ্ছে। তবে সামরিক জোটের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে সন্দেহ থাকলেও প্রাকৃতিক সম্পদের ক্ষেত্রে সহযোগিতা অপরিহার্য।
ইউরোপের প্রকৌশল দক্ষতা আছে, জাপান অতীতে চীনের খনিজ চাপের শিকার হয়ে সরবরাহশৃঙ্খল সুরক্ষায় অভিজ্ঞতা অর্জন করেছে। সম্মিলিতভাবে তারা বাজারকে শক্তিশালী করতে পারে। চীনের ভূতাত্ত্বিক সুবিধা, শ্রমনিষ্ঠা ও রাজনৈতিক কাঠামোর বিপরীতে যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় শক্তি হলো অন্যদের সঙ্গে কাজ করার সক্ষমতা।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















