কুষ্টিয়ার কুমারখালী উপজেলার ছেঁউড়িয়া আখড়াবাড়িতে আজ থেকে শুরু হচ্ছে ঐতিহ্যবাহী লালন উৎসব। প্রতি বছর দোল পূর্ণিমা উপলক্ষে তিন দিনব্যাপী এই আয়োজন হলেও রমজান মাসের কারণে এবার তা সীমিত হয়ে একদিনে অনুষ্ঠিত হচ্ছে। ফলে আগের বছরের মতো সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান কিংবা গ্রামীণ মেলা থাকছে না।
ঐতিহ্যের ধারায় সীমিত আয়োজন
আখড়াবাড়ি প্রাঙ্গণ প্রতিবছর ভরে ওঠে ভক্ত, বাউল ও সাধুসঙ্গীদের পদচারণায়। লালনের গান, ভাব বিনিময় আর আধ্যাত্মিক আবহে সৃষ্টি হয় এক অনন্য পরিবেশ। তবে এবার সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয় ও জেলা প্রশাসনের সহায়তায় আয়োজন সীমিত রাখা হয়েছে আলোচনা সভা ও বাউলদের আপ্যায়নের মধ্যে। মঙ্গলবার দুপুরে পূর্ণ সেবার মধ্য দিয়ে অনুষ্ঠান শেষ হবে বলে জানিয়েছেন আখড়াবাড়ির ভারপ্রাপ্ত সেবায়েত মশিউর রহমান।

আগাম আগমন ভক্ত ও বাউলদের
উৎসব শুরুর কয়েক দিন আগেই দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে বাউল ও লালনভক্তরা ছেঁউড়িয়ায় এসে জড়ো হয়েছেন। দল বেঁধে বসে চলছে লালনগীতি পরিবেশন, ভাবের আদান-প্রদান। শনিবার বিকেল থেকেই আখড়াবাড়ি এলাকায় ছিল ভক্তদের সরব উপস্থিতি। অনেকে বলছেন, আয়োজন ছোট হলেও ভক্তির আবহে কোনো ঘাটতি নেই।
লালনের দর্শনেই টান
ঢাকা থেকে আসা ফকির ফাহিম জানান, সারা বছর এই দিনের অপেক্ষায় থাকেন তারা। দোল উৎসব ঘিরে দেশ-বিদেশের বাউল ও সাধুরা এখানে মিলিত হয়ে ভাবের কথা ভাগ করে নেন। যুক্তরাষ্ট্র প্রবাসী মিজানুর রহমান বলেন, ছোটবেলা থেকে লালনের গান শুনে বড় হয়েছেন তিনি। ছেঁউড়িয়ায় এসে সেই দর্শনের আসল রূপ অনুভব করছেন। তার ভাষায়, লালন মানুষকে জাত, ধর্ম, বর্ণের ঊর্ধ্বে মানবতার শিক্ষা দিয়েছেন।

মানিকগঞ্জ থেকে আসা সাধু তোফাজ্জেল হোসেন বলেন, লালনের প্রেম ও মমতার বাণীই তাকে টেনে এনেছে। চুয়াডাঙ্গার শান্ত ফকিরের মতে, দোল পূর্ণিমার এই পবিত্র দিনে লালন শিষ্যদের নিয়ে আধ্যাত্মিক ও দার্শনিক আলোচনা করতেন। এখানে এলে আত্মশুদ্ধি ও জ্ঞানচর্চার সুযোগ তৈরি হয়।
অনুষ্ঠানসূচি ও নিরাপত্তা ব্যবস্থা
সোমবার সন্ধ্যায় গুরুকার্য দিয়ে উৎসবের সূচনা হবে। এরপর থাকবে রাখাল সেবা, মধ্যরাতে অধিবাস এবং মঙ্গলবার ভোরে বাল্য সেবা। দুপুরে পূর্ণ সেবার মাধ্যমে সমাপ্তি ঘটবে এবারের আয়োজনের।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ফারজানা আক্তার জানিয়েছেন, আখড়াবাড়ি এলাকায় নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছে। স্থাপন করা হয়েছে নজরদারি ক্যামেরা। পুলিশ ও আনসার সদস্যদের পাশাপাশি গ্রাম পুলিশ, স্বেচ্ছাসেবক দল ও চিকিৎসাকর্মীরা দায়িত্ব পালন করবেন, যাতে আগত বাউল ও ভক্তরা নির্বিঘ্নে অংশ নিতে পারেন।

রমজানের প্রভাব ও জনসমাগম
আয়োজকরা বলছেন, রমজানের কারণে এবার জনসমাগম কিছুটা কম হতে পারে। তবুও লালনের মানবতাবাদী দর্শন আর সাম্যের বাণীকে ধারণ করেই ছেঁউড়িয়ায় শুরু হচ্ছে এবারের লালন উৎসব ২০২৫।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















