চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের নতুন নির্দেশিকা প্রকাশের পর কমিউনিস্ট পার্টির কর্মকর্তা পদোন্নতি ও মূল্যায়ন ব্যবস্থায় বড় ধরনের পরিবর্তনের ইঙ্গিত মিলেছে। পারফরম্যান্স মূল্যায়ন নিয়ে প্রকাশিত বইটিতে এমন কিছু ভাষা ও সতর্কবার্তা উঠে এসেছে, যা অনেককেই বিস্মিত করেছে। বিশেষ করে ঋণনির্ভর অপ্রয়োজনীয় প্রকল্প ও স্বল্পমেয়াদি রাজনৈতিক সাফল্যের বিরুদ্ধে শির কঠোর অবস্থান স্পষ্ট হয়েছে এতে।
কেন্দ্রীয় পার্টি সাহিত্য প্রকাশনা সংস্থা থেকে প্রকাশিত বইটি এমন সময়ে এসেছে, যখন আগামী বছরের নেতৃত্ব পরিবর্তনকে সামনে রেখে পদোন্নতি ব্যবস্থায় বড় সংস্কার শুরু হয়েছে।
ঋণভিত্তিক ‘সাদা হাতি’ প্রকল্পে কড়া সমালোচনা
২০১৩ সালের কেন্দ্রীয় অর্থনৈতিক কর্ম সম্মেলনে দেওয়া এক ভাষণে শি জিনপিং কর্মকর্তাদের উদ্দেশে কঠোর সতর্কবার্তা দেন। তিনি বলেন, কিছু কর্মকর্তা ঋণ তোলার সময় সেটি কীভাবে শোধ হবে তা ভাবেন না। ঋণের মেয়াদ পূর্ণ হওয়ার সময় তারা আর একই পদে থাকেন না।
তিনি স্পষ্ট ভাষায় বলেন, রাজনৈতিক কৃতিত্ব দেখাতে গিয়ে সরকারকে বিপুল ঋণের বোঝা চাপিয়ে দিয়ে পরে নির্বিকারভাবে সরে যাওয়া এবং তারপর পদোন্নতি পাওয়া চলতে পারে না।

চীনা প্রবাদ “পিঠ চাপড়ে চলে যাওয়া” দিয়ে তিনি বোঝান, সমস্যা তৈরি করে দায়িত্ব এড়িয়ে যাওয়া যাবে না। এই মন্তব্য থেকেই বোঝা যায়, ভবিষ্যতে পদোন্নতির ক্ষেত্রে দায়বদ্ধতা ও দীর্ঘমেয়াদি প্রভাবকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হবে।
‘দুইমুখো’ কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান
নতুন বইয়ের মূল বার্তা হলো, দ্রুত ব্যক্তিগত উন্নতির জন্য জাতীয় স্বার্থ উপেক্ষা করার দিন শেষ। জানুয়ারিতে এক বৈঠকে শি বলেন, নেতৃত্ব পরিবর্তনের সময় বিশেষ সতর্ক থাকতে হবে এবং প্রকৃত অর্থে বিশ্বস্ত, নির্ভরযোগ্য ও দায়িত্বশীল কর্মকর্তাদেরই পদোন্নতি দিতে হবে।
তিনি স্পষ্ট করে দেন, তথাকথিত ‘দুইমুখো’ কর্মকর্তারা যেন কোনোভাবেই ছাঁকনি পেরোতে না পারেন।
জিডিপি-কেন্দ্রিক মূল্যায়ন থেকে সরে আসার ইঙ্গিত
নভেম্বর ২০১২ থেকে দেওয়া বিভিন্ন ভাষণ ও নির্দেশনার সংকলনে দেখা যায়, শি জিনপিং মূল্যায়ন ব্যবস্থাকে নতুনভাবে সাজাতে চান। আগে যেখানে মোট দেশজ উৎপাদন বা জিডিপি বৃদ্ধিই ছিল পদোন্নতির প্রধান মানদণ্ড, এখন তিনি সেই একমুখী দৃষ্টিভঙ্গি থেকে সরে আসার আহ্বান জানিয়েছেন।
তিনি বলেন, শুধু সংখ্যাভিত্তিক পদোন্নতির প্রতিযোগিতা একটি নেতিবাচক চক্র তৈরি করে। তাই স্থানীয় বাস্তবতা অনুযায়ী উন্নয়ন ও উদ্ভূত সমস্যার সমাধানকে গুরুত্ব দিতে হবে।
ক্ষমতা পরিবর্তনের আগে-পরে নীতির ধারাবাহিকতা
শি একাধিকবার বলেছেন, নেতৃত্ব পরিবর্তনের সময় নীতির ধারাবাহিকতা বজায় রাখা জরুরি। কর্মকর্তাদের স্বল্পমেয়াদি নয়, দীর্ঘমেয়াদি ও জাতীয় দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে কাজ করতে হবে।
জানুয়ারিতে দুর্নীতি দমন সংস্থা কেন্দ্রীয় শৃঙ্খলা পরিদর্শন কমিশনকে তিনি সতর্ক থাকতে বলেন, যাতে কেউ ক্ষমতা পরিবর্তনের অপেক্ষায় নিষ্ক্রিয় হয়ে না থাকে।
একই সঙ্গে তিনি নেতৃত্ব বদলের পর আগের নীতি পুরোপুরি উল্টে দিয়ে দ্রুত সাফল্য দেখানোর প্রবণতারও সমালোচনা করেন।
নেতৃত্ব পরিবর্তনের প্রাক্কালে গুরুত্বপূর্ণ সময়
চীনের রাজনৈতিক ক্যালেন্ডারে এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সময়। স্থানীয় ও প্রাদেশিক পর্যায়ে নেতৃত্ব পরিবর্তন চলছে, আর কেন্দ্রীয়ভাবে নতুন পাঁচ বছর মেয়াদি পরিকল্পনা অনুমোদনের প্রস্তুতি চলছে।

আগামী বছরের শরতে অনুষ্ঠিতব্য একুশতম পার্টি কংগ্রেসে পলিটব্যুরো ও কেন্দ্রীয় কমিটির নতুন নেতৃত্ব নির্ধারিত হবে। বর্তমান সংস্কার সেই প্রস্তুতির অংশ হিসেবেই দেখা হচ্ছে।
স্থানভিত্তিক মূল্যায়ন ব্যবস্থার ওপর জোর
শি জিনপিং বারবার বলেছেন, মূল্যায়ন পদ্ধতি স্থানীয় বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হতে হবে। ২০১৪ সালের এক ভাষণে তিনি পানি-সংকটপূর্ণ অঞ্চলে কর্মকর্তাদের মূল্যায়নে পানি সংরক্ষণ সূচক অন্তর্ভুক্ত করার প্রস্তাব দেন।
ইতোমধ্যে কয়েকটি প্রদেশ এই নির্দেশনা অনুসারে পদক্ষেপ নিয়েছে। ঝেজিয়াং ও হুবেই প্রদেশ সাম্প্রতিক বৈঠকে কর্মকর্তাদের মূল্যায়ন ও প্রশিক্ষণ উন্নত করার প্রস্তাব দিয়েছে।
ঝেজিয়াং প্রাদেশিক পার্টি কমিটি দাবি করেছে, গত বছর তারা মূল্যায়ন পদ্ধতি উন্নত করেছে। সেখানে খতিয়ে দেখা হচ্ছে, কর্মকর্তারা লক্ষ্য পূরণের নামে অপ্রয়োজনীয় প্রকল্প বা হঠাৎ তড়িঘড়ি কার্যক্রম চালিয়েছেন কি না।

এছাড়া ২০২৪ সালের তুলনায় মূল্যায়নের মানদণ্ড প্রায় এক-তৃতীয়াংশ কমানো হয়েছে। শহর ও জেলার উন্নয়ন মূল্যায়নে প্রযুক্তিগত উদ্ভাবন, বিনিয়োগ, জনসেবা ও আয়ের মাত্রাকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
একই সঙ্গে পরিবেশগত সূচক যুক্ত করা হয়েছে এবং শুধু বছর শেষে নয়, প্রতিদিনের ভিত্তিতেও মূল্যায়ন শুরু হয়েছে।
ভুয়া তথ্য ও বিকৃত পরিসংখ্যানের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা
জানুয়ারিতে কেন্দ্রীয় শৃঙ্খলা পরিদর্শন কমিশন কিছু স্থানীয় সরকার ও বিভাগকে মানদণ্ড থেকে বিচ্যুত হওয়ার জন্য চিহ্নিত করেছে।
উদাহরণ হিসেবে হেনান প্রদেশের বাণিজ্য বিভাগকে উল্লেখ করা হয়, যারা অতিরঞ্জিত ভিত্তি তথ্য ব্যবহার করেও প্রদেশের বাইরের বিনিয়োগে বার্ষিক প্রবৃদ্ধির অযৌক্তিক লক্ষ্য নির্ধারণ করেছিল।
এই লক্ষ্য পূরণে কিছু স্থানীয় কর্মকর্তা প্রতিষ্ঠানগুলোকে ভুয়া নথি দিতে বাধ্য করেন, এমনকি নিজেরাই তথ্য তৈরি করেন। ফলে সরকারি পরিসংখ্যান বিকৃত হয়ে যায়।
সব মিলিয়ে শি জিনপিংয়ের নতুন নির্দেশনা স্পষ্ট করছে, ভবিষ্যতে পদোন্নতির ক্ষেত্রে শুধু সংখ্যাগত সাফল্য নয়, দায়বদ্ধতা, নীতির ধারাবাহিকতা, পরিবেশগত ভারসাম্য ও দীর্ঘমেয়াদি জাতীয় স্বার্থকেই অগ্রাধিকার দেওয়া হবে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















