ভোর সাড়ে তিনটা। সরু গলির দুপাশের বাড়িগুলোতে একে একে জ্বলে ওঠে আলো। নীরব শহরকে কাঁপিয়ে ওঠে ছন্দময় ঢোলের শব্দ। তুরস্কের ইস্তাম্বুলে রমজান মানেই এমন এক প্রাচীন ঐতিহ্য, যেখানে সূর্য ওঠার আগে সাহরির জন্য মানুষকে জাগিয়ে তোলেন ঢোলবাদকেরা।
প্রভাতের সেই চেনা সুর
ইস্তাম্বুলের আয়ভানসারায় এলাকার একটি বারান্দায় দাঁড়িয়ে সিবেল সাভাস নাতিকে কোলে নিয়ে নিচের দিকে তাকান। গলিপথ ধরে এগিয়ে যাচ্ছেন এক ঢোলবাদক। তাঁর ঢোলের তালে তালে ঘুম ভাঙছে রোজাদারদের। সূর্যোদয়ের আগে শেষবারের মতো খাবার খাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছেন তারা।
৬৫ বছর বয়সী হাকান ওজবিঙ্গোল টানা ৫৫ বছর ধরে রমজানের প্রতিটি দিনে রাত তিনটায় ঘুম থেকে ওঠেন। কাঁধে ঝোলানো বড় দুই মুখো ঢোল বাজাতে বাজাতে তিনি হেঁটে বেড়ান পাড়ায় পাড়ায়। বাবার কাছ থেকেই এই দায়িত্ব পেয়েছেন। মাত্র ১০ বছর বয়সে বাবার সঙ্গে বের হওয়া শুরু তাঁর।

মাস শেষে এলাকাবাসী সামান্য উপহার দেন। একসময় যা দিয়ে সন্তানদের ভালো কিছু কিনে দেওয়া যেত, এখন তা কষ্টেসৃষ্টে বিল মেটানোর মতো। তুরস্কের অর্থনৈতিক সংকটের প্রভাব পড়েছে এখানেও। তবু হাকানের কণ্ঠে দৃঢ়তা, এটি তাঁর কাছে কাজ নয়, পবিত্র দায়িত্ব। আল্লাহর জন্য এই ঢোল কখনও থামবে না বলেই জানান তিনি।
অটোমান আমল থেকে শুরু
ইস্তাম্বুল বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গীত ইতিহাসবিদ হারুন কোরকমাজের মতে, উনিশ শতকের শেষভাগে অটোমান সামরিক ব্যান্ডের সময় থেকেই এই প্রথার সূচনা। তখন দিনের ছন্দ নির্ধারণ করত সামরিক সঙ্গীত। সেই ঐতিহ্যই এখন ধরে রেখেছেন ঢোলবাদকেরা।
শুধু ঢোল বাজানোই নয়, অনেকেই জানেন ‘মানি’ নামে ছোট ছন্দোবদ্ধ কবিতা আবৃত্তি করতে। জানালার নিচে দাঁড়িয়ে তারা সেই ছড়া শোনান, যা ঘুমজড়ানো মানুষকে আনন্দ দেয়। হাকান বলেন, তুরস্কে এখন খুব কম ঢোলবাদকই এই মানি জানেন। শুধু ঢোল বাজালেই হয় না, ঐতিহ্যের জ্ঞানও দরকার।
রোমা সম্প্রদায়ের অবদান

এই প্রথার সূচনা হয়েছিল ফাতিহ জেলায়। বর্তমানে রমজানের বেশিরভাগ ঢোলবাদকই তুরস্কের রোমা সম্প্রদায় থেকে আসেন। প্রায় ২৭ লাখ মানুষের এই সম্প্রদায়ের সঙ্গে সঙ্গীতের সম্পর্ক দীর্ঘদিনের।
৭১ বছর বয়সী জাফের, যিনি নিজেও একজন সঙ্গীতশিল্পী, বলেন রোমারা না থাকলে ইস্তাম্বুলের রমজানের সুরই থাকত না। তারাই এই ঐতিহ্যের প্রাণ।
আধুনিকতার মাঝেও টিকে থাকা ঐতিহ্য
ইস্তাম্বুলজুড়ে ৯৬১টি এলাকায় প্রায় তিন হাজার ঢোলবাদক প্রতি রাতে বের হন। মহামারির সময় সাময়িক বন্ধ থাকলেও পরে দ্বিগুণসংখ্যক অনুমোদিত ঢোলবাদক নিয়োগ দেয় কর্তৃপক্ষ, যাতে তরুণ প্রজন্ম এই অটোমান ঐতিহ্যের সঙ্গে পরিচিত হতে পারে।
শহরের রাস্তায় এখন আর আগের মতো বোযা বা দই বিক্রেতা দেখা যায় না। সুপারমার্কেটের ভিড়ে হারিয়ে গেছে বহু পুরোনো পেশা। কিন্তু রমজানের ঢোলবাদকেরা এখনও রয়ে গেছেন। ভোরের আঁধারে ঢোলের তালে তালে তারা যেন মনে করিয়ে দেন, ঐতিহ্য কখনও পুরোপুরি হারায় না।


সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















