মধ্যপ্রাচ্যে চলমান সংঘাত আরও তীব্র রূপ নিচ্ছে। ইরানে সামরিক অভিযান জোরদার করার ঘোষণা দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও তার শীর্ষ কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, এই অভিযান কয়েক সপ্তাহ পর্যন্ত চলতে পারে এবং প্রয়োজনে আরও দীর্ঘায়িত হতে পারে। একই সঙ্গে মার্কিন সামরিক বাহিনী অতিরিক্ত সেনা ও যুদ্ধবিমান মোতায়েন করছে।
যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হওয়ার ইঙ্গিত
হোয়াইট হাউসে এক বক্তব্যে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প বলেন, শুরু থেকেই তারা চার থেকে পাঁচ সপ্তাহের অভিযানের কথা ভেবেছিলেন, তবে প্রয়োজনে আরও দীর্ঘ সময় ধরে লড়াই চালানোর সক্ষমতা তাদের রয়েছে। তিনি স্পষ্ট করে জানান, লক্ষ্য অর্জন না হওয়া পর্যন্ত অভিযান থামবে না।
পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও কংগ্রেসে সাংবাদিকদের বলেন, এখনো যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে কঠিন আঘাত বাকি রয়েছে। তার ভাষায়, আগামী ধাপ ইরানের জন্য আরও বিধ্বংসী হবে। যুক্তরাষ্ট্রের লক্ষ্য হলো ইরানের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতা সম্পূর্ণভাবে ধ্বংস করা।

হামলা ও পাল্টা হামলা
গত তিন দিনে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল হাজার হাজার বিমান হামলা চালিয়েছে। এতে শতাধিক মানুষের মৃত্যু হয়েছে। নিহতদের মধ্যে ইরানের বেশ কয়েকজন শীর্ষ সামরিক কর্মকর্তা ও উচ্চপদস্থ নেতা রয়েছেন, যাদের মধ্যে দেশটির সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনিও অন্তর্ভুক্ত।
পাল্টা জবাবে ইরান ইসরায়েল, অঞ্চলে অবস্থিত মার্কিন ঘাঁটি এবং উপসাগরীয় মিত্র দেশগুলোর দিকে ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করেছে। ইসরায়েলে অন্তত ১০ জন নিহত হয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন এলাকায় আরও হতাহতের খবর পাওয়া গেছে।
মার্কিন হতাহতের সংখ্যা বাড়ছে
যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ড জানিয়েছে, আরও দুই মার্কিন সেনা নিহত হয়েছেন। ফলে মোট নিহত মার্কিন সেনার সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ছয় জনে। প্রতিরক্ষা কর্মকর্তারা আগেই সতর্ক করেছিলেন যে যুদ্ধ চলতে থাকলে আরও প্রাণহানির আশঙ্কা রয়েছে।
প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ বলেন, যুদ্ধ সবসময়ই কঠিন বাস্তবতা। তিনি নিহত মার্কিন সেনাদের প্রতি শ্রদ্ধা জানান। যৌথ বাহিনীর প্রধান জেনারেল ড্যান কেইনও স্বীকার করেন, সামনে আরও ক্ষয়ক্ষতির সম্ভাবনা রয়েছে।

অতিরিক্ত সেনা ও যুদ্ধবিমান মোতায়েন
জেনারেল ড্যান কেইন জানান, মধ্যপ্রাচ্যে অতিরিক্ত সেনা ও যুদ্ধবিমান পাঠানো হচ্ছে। তার মতে, কয়েক দিনের মধ্যে নতুন যুদ্ধবিমান পৌঁছালে যুক্তরাষ্ট্র পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধ সক্ষমতায় পৌঁছে যাবে। তবে মোট কত সেনা মোতায়েন করা হবে, সে বিষয়ে তিনি নির্দিষ্ট সংখ্যা জানাননি।
অন্যদিকে প্রতিরক্ষামন্ত্রী হেগসেথ বলেন, এটি ইরাক যুদ্ধের মতো দীর্ঘ ও অনির্দিষ্টকালীন সংঘাত নয়। তার ভাষায়, এই যুদ্ধ অন্তহীন হবে না।
এফ-১৫ যুদ্ধবিমান ভূপাতিতের ঘটনা
সোমবার ভোরে কুয়েত ভুলবশত তিনটি মার্কিন এফ-১৫ যুদ্ধবিমান ভূপাতিত করে। জেনারেল কেইন জানান, এটি শত্রুপক্ষের হামলা ছিল না এবং বিষয়টি তদন্তাধীন। ছয়জন ক্রু সদস্যই নিরাপদে রয়েছেন বলে সেন্ট্রাল কমান্ড নিশ্চিত করেছে।
![]()
মার্কিন নাগরিকদের সতর্কবার্তা
যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তর জরুরি টাস্কফোর্স গঠন করেছে, যাতে কূটনৈতিক স্থাপনা সুরক্ষিত রাখা এবং নাগরিকদের সহায়তা করা যায়। একই সঙ্গে ইসরায়েল, সৌদি আরব, কাতার ও সংযুক্ত আরব আমিরাতসহ ১৪টি মধ্যপ্রাচ্যের দেশ থেকে মার্কিন নাগরিকদের দ্রুত সরে যাওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে। কারণ হিসেবে গুরুতর নিরাপত্তা ঝুঁকির কথা বলা হয়েছে।
স্থল সেনা মোতায়েনের সম্ভাবনা
প্রতিরক্ষামন্ত্রী জানান, বর্তমানে ইরানে কোনো মার্কিন স্থল সেনা নেই। তবে ভবিষ্যতে এমন সম্ভাবনা একেবারে নাকচ করেননি। জেনারেল কেইন বলেন, যুক্তরাষ্ট্র এই লড়াই চালিয়ে যাওয়ার সক্ষমতা রাখে। যদিও সামরিক কর্মকর্তারা ব্যক্তিগতভাবে গোলাবারুদের মজুত নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। এতে আশঙ্কা তৈরি হয়েছে, অন্য সম্ভাব্য সংঘাতের জন্য সংরক্ষিত মজুত থেকেও অস্ত্র নিতে হতে পারে।

ট্রাম্পের কঠোর বার্তা
প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের অবস্থান পুনর্ব্যক্ত করে হেগসেথ বলেন, বিশ্বের যেখানেই আমেরিকানদের হত্যা বা হুমকি দেওয়া হবে, যুক্তরাষ্ট্র বিনা দ্বিধায় তার জবাব দেবে। তিনি বলেন, আমেরিকানদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করাই তাদের প্রধান লক্ষ্য।
সাংবাদিকদের সঙ্গে উত্তেজনা
পেন্টাগনে সংবাদ সম্মেলনের সময় হেগসেথ বেশিরভাগ সময় সাংবাদিকদের প্রশ্নের সমালোচনা করেন। এক সাংবাদিক যখন জানতে চান, দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা আছে কি না, তখন তিনি পাল্টা প্রশ্ন করেন এবং বলেন, আগের প্রশাসনের ভুল নীতির পুনরাবৃত্তি করা হবে না। তাদের লক্ষ্য স্পষ্ট ও নির্দিষ্ট।
যুদ্ধ এখনো প্রাথমিক পর্যায়ে থাকলেও পরিস্থিতি দ্রুত পরিবর্তিত হচ্ছে। মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে উত্তেজনা বাড়ছে এবং যুক্তরাষ্ট্র ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক চাপ আরও বাড়ানোর প্রস্তুতি নিচ্ছে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















