০২:০১ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ২৯ জুন ২০২৬
“আমি এ বছরই দেশে ফিরব” – শেখ হাসিনা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার চাহিদায় উড়ছে সিঙ্গাপুরের কারখানা উৎপাদন, টানা নয় মাস প্রবৃদ্ধি নামমাত্র পরিচালক হয়ে বিপাকে সিঙ্গাপুরের নারী, চাকরি হারিয়ে এখনও ১৫ প্রতিষ্ঠানের পরিচালক! নতুন শ্রবণ পরীক্ষা বুথে অপেক্ষার সময় অর্ধেক, দ্রুত সেবা পাচ্ছেন রোগীরা সিঙ্গাপুরে দুই মসজিদের সাবেক চেয়ারম্যানের কারাদণ্ড, ঠিকাদারি কাজ পাইয়ে দিতে দুর্নীতির প্রমাণ এয়ারএশিয়ার বড় সিদ্ধান্ত: ১ জুলাই থেকে বন্ধ সিঙ্গাপুর-জাকার্তা সরাসরি ফ্লাইট, বাড়বে যাত্রার সময় স্থানীয় নির্বাচনে একক প্রার্থী দিতে বহু কৌশল বিএনপির নেশার বিরুদ্ধে বড় অভিযান: ৬৮০ মিলিয়ন ডলারের মাদক আগুনে পুড়িয়ে ধ্বংস করল মিয়ানমার পেন্টাগনের নতুন নীতি: যুদ্ধক্ষেত্রে লক্ষ্য নির্ধারণে বাড়ছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ভূমিকা ইসরায়েল-লেবানন সমঝোতার পথে নতুন উদ্যোগ, দক্ষিণ লেবাননে ‘হিজবুল্লাহমুক্ত অঞ্চল’ নিয়ে আলোচনা

“আমি এ বছরই দেশে ফিরব” – শেখ হাসিনা

বাংলাদেশে তাঁকে ক্ষমতাচ্যুত করার প্রায় দুই বছর হয়ে গেছে। যে দেশটি তাঁর বাবা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান একটি বৈরী পাকিস্তানের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করে প্রতিষ্ঠা করেছিলেন, সেখান থেকেই তাঁকে দেশত্যাগে বাধ্য হতে হয়। মৃত্যুদণ্ডের রায়, বাংলাদেশে আওয়ামী লীগের ওপর নিষেধাজ্ঞা—এসবের পর পরিস্থিতি সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার জন্য এর চেয়ে কঠিন আর কী হতে পারে?

কিন্তু তিনি বিচলিত নন। যুক্তরাষ্ট্রের খ্যাতিমান সেনাপতি ডগলাস ম্যাকআর্থারের মতোই তিনি দৃঢ় কণ্ঠে বলেন, “আমি এ বছরই দেশে ফিরব।” নির্বাসন থেকে তিনি আরও বলেন, আওয়ামী লীগ শুধু একটি রাজনৈতিক দল নয়, এটি একটি “শক্তি”। তাঁর মতে, সংখ্যালঘুদের ওপর যেকোনো হামলা বাংলাদেশের স্বাধীনতার ওপরই হামলার শামিল।

গত মঙ্গলবার (২৩ জুন) দেশব্যাপী নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে আওয়ামী লীগ তাদের ৭৭তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী পালন করে। কঠোর নিরাপত্তার মধ্যেই দলটির বহু নেতা-কর্মীকে গ্রেপ্তার করা হয়।

বাংলাদেশের নানা বিষয় নিয়ে নির্বাসন থেকে এনডিটিভিকে একান্ত ই-মেইল সাক্ষাৎকার দেন শেখ হাসিনা। নিচে সেই সাক্ষাৎকারের বাংলা অনুবাদ তুলে ধরা হলো।

প্রশ্ন: আপনি বহুবার ইঙ্গিত দিয়েছেন—এবং আপনার সমর্থকরাও আশাবাদী—যে আপনি শিগগিরই বাংলাদেশে ফিরবেন। এমনকি দলের কিছু নেতা বলেছেন, এ বছরের মধ্যেই তা সম্ভব হতে পারে। কিন্তু আপনার বিরুদ্ধে মৃত্যুদণ্ডের রায় থাকায় এটি কতটা বাস্তবসম্মত?

শেখ হাসিনা: আমার দেশে ফেরা ব্যক্তিগত উচ্চাকাঙ্ক্ষার বিষয় নয়। এটি বাংলাদেশের মানুষের রাজনৈতিক অধিকার, গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠা, আইনের শাসন এবং আমাদের মুক্তিযুদ্ধের চেতনা পুনরুদ্ধারের সঙ্গে জড়িত। আমি ক্ষমতার জন্য রাজনীতি করি না। আমি রাজনীতি করি বাংলাদেশের মানুষের কল্যাণের জন্য এবং জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের স্বপ্নের সোনার বাংলা গড়ে তোলার লক্ষ্যে।

আমার বিরুদ্ধে যে রায় দেওয়া হয়েছে, তা ন্যায়বিচার নয়। এটি একটি অবৈধ, অসাংবিধানিক এবং রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত প্রক্রিয়ার অংশ। বিচারব্যবস্থাকে রাজনৈতিক প্রতিশোধের হাতিয়ারে পরিণত করা হয়েছে, যাতে আওয়ামী লীগকে নেতৃত্বশূন্য করা যায়। অতীতেও এমন চেষ্টা হয়েছে। তখনও তারা ব্যর্থ হয়েছে, এবারও ব্যর্থ হবে।

আমি মৃত্যুকে ভয় পাই না। ১৯৭৫ সালে আমি আমার বাবা-মা, ভাইদের এবং প্রায় পুরো পরিবারকে হারিয়েছি। ২১ আগস্ট আমাকে হত্যার উদ্দেশ্যে গ্রেনেড হামলা চালানো হয়েছিল। আমার বিরুদ্ধে অসংখ্য ষড়যন্ত্র হয়েছে। কিন্তু প্রতিটি ষড়যন্ত্রের জাল ভেদ করে আমি বাংলাদেশের মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছি।

জনগণের ভোটে আমি পাঁচবার বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হয়েছি এবং দেশের অভূতপূর্ব উন্নয়নে কাজ করেছি। আমার প্রায় পুরো জীবন বাংলাদেশের মানুষ, আওয়ামী লীগ, গণতান্ত্রিক সংগ্রাম এবং দেশের উন্নয়নের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। তাই আমি স্পষ্ট করে বলতে চাই—সব বাধা, সব ষড়যন্ত্র অতিক্রম করে আমি এ বছরই আমার দেশে ফিরব।

প্রশ্ন: বাংলাদেশের বর্তমান সরকারের নানা সীমাবদ্ধতা ও ব্যর্থতার কারণে আওয়ামী লীগ আবারও জনসমর্থন ফিরে পাচ্ছে—এমন ইঙ্গিত দেখা যাচ্ছে। এই জনসমর্থনকে রাজনৈতিক সাফল্যে রূপ দেওয়ার মতো সাংগঠনিক শক্তি কি এখনও দলটির রয়েছে?

শেখ হাসিনা: আওয়ামী লীগ কোনো কাগুজে সংগঠন নয়। এটি বাংলার মাটি, বাংলার মানুষ, বাংলার ইতিহাস এবং বাঙালি জাতির পরিচয়ের গভীরে প্রোথিত একটি রাজনৈতিক শক্তি। ৭৭ বছরের যাত্রায় আওয়ামী লীগ বহুবার হামলার শিকার হয়েছে, বহুবার রক্ত দিয়েছে, বহুবার নিষিদ্ধ হয়েছে। কিন্তু প্রতিবারই জনগণের শক্তিতে আবার ঘুরে দাঁড়িয়েছে।

আওয়ামী লীগের প্রত্যাবর্তন অন্য কারও ব্যর্থতা বা দুর্বলতার ওপর নির্ভর করে না। আওয়ামী লীগ জনগণকে সঙ্গে নিয়েই নিজের পথ তৈরি করে। জনগণের সমর্থন সবসময়ই আমাদের সঙ্গে ছিল। সেই শক্তির ভিত্তিতেই আমরা সরকারে থাকাকালে মানুষের জীবনমান উন্নয়নে নিরলসভাবে কাজ করেছি। বাংলাদেশবিরোধী শক্তিগুলো জনগণের একটি অংশকে বিভ্রান্ত করে সুপরিকল্পিত ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে আওয়ামী লীগকে রাষ্ট্রক্ষমতা থেকে সরিয়ে দিয়েছে। কিন্তু সব চেষ্টা সত্ত্বেও তারা জনগণের হৃদয় থেকে আওয়ামী লীগকে মুছে ফেলতে পারেনি।

মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অবৈধ, অসাংবিধানিক ও দখলদার অন্তর্বর্তী সরকারের সময় এবং এখন সাজানো নির্বাচনের মাধ্যমে গঠিত বিএনপি সরকারের অধীনেও মানুষ বাস্তবতা নিজের চোখে দেখছে। দেশে গণতন্ত্র নেই। আইনের শাসন নেই। নিরাপত্তা নেই। অর্থনীতি দুর্বল হয়ে পড়েছে। সংখ্যালঘুরা হামলার শিকার হচ্ছে। উগ্রবাদ ছড়িয়ে পড়ছে। আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীরা অকল্পনীয় রাষ্ট্রীয় নির্যাতনের মুখোমুখি হচ্ছেন। মানুষ তুলনা করতে জানে। তারা বোঝে, আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় থাকলে দেশে স্থিতিশীলতা, উন্নয়ন এবং মানুষের জীবন ও সম্পদের নিরাপত্তা থাকে।

সাংগঠনিক শক্তির প্রশ্নে আমি বলতে চাই, বাংলাদেশের রাজনীতির প্রতিটি অলিগলি আওয়ামী লীগের চেনা। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে এই দলই বাংলাদেশের জন্ম দিয়েছে। দেশের প্রতিটি গণতান্ত্রিক আন্দোলনের নেতৃত্ব দিয়েছে আওয়ামী লীগ। জনগণের সমর্থন ও আকাঙ্ক্ষাকে রাজনৈতিক বাস্তবতায় রূপ দেওয়ার ক্ষমতা আওয়ামী লীগের রক্তে মিশে আছে। আগুনে যেমন সোনা আরও খাঁটি হয়, তেমনি শাসকদের দমন-পীড়ন আওয়ামী লীগকে প্রতিদিন আরও শক্তিশালী করে তুলছে।

আওয়ামী লীগের ৭৭তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে আমি আমাদের নেতা-কর্মী ও সমর্থকদের উদ্দেশে একটি কথাই বলতে চাই—ঐক্যবদ্ধ থাকুন এবং মানুষের পাশে থাকুন। দেশের প্রতিটি গ্রাম, মহল্লা, ওয়ার্ড ও ইউনিয়নের মানুষের সঙ্গে সম্পর্ক আরও গভীর করুন। নির্যাতিত মানুষের পাশে দাঁড়ান। সংখ্যালঘু, নারী, শিশু, শ্রমজীবী মানুষ, দরিদ্র ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর নিরাপত্তা ও মর্যাদার প্রশ্নে কখনও আপস করবেন না। আওয়ামী লীগের রাজনীতি প্রতিশোধের রাজনীতি নয়; এটি অধিকার, নিরাপত্তা, মর্যাদা এবং উন্নয়নের রাজনীতি। আওয়ামী লীগ ছিল মানুষের সঙ্গে, আছে মানুষের সঙ্গে এবং মানুষের সঙ্গেই থাকবে। জনগণের শক্তিতেই আওয়ামী লীগ আবারও ঘুরে দাঁড়াবে।

প্রশ্ন: আওয়ামী লীগের ওপর নিষেধাজ্ঞা এখনও বহাল রয়েছে এবং দলটির নেতা-কর্মীদের বিরুদ্ধে হাজার হাজার মামলা হয়েছে বলে জানা যাচ্ছে। এমন পরিস্থিতিতে নিকট ভবিষ্যতে দলটির রাজনৈতিকভাবে ঘুরে দাঁড়ানো কতটা সম্ভব?

শেখ হাসিনা: আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক পুনরুত্থান কোনো সরকারের অনুগ্রহের ওপর নির্ভর করে না। এটি নির্ভর করে জনগণের ওপর। একটি অবৈধ নিষেধাজ্ঞার মাধ্যমে তারা হয়তো আওয়ামী লীগকে একটি সাজানো নির্বাচনের বাইরে রেখেছে। তারা হয়তো দলীয় কার্যালয় বন্ধ করেছে। তারা হয়তো সাময়িকভাবে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড দমন করেছে। কিন্তু তারা জনগণের হৃদয় থেকে আওয়ামী লীগকে মুছে ফেলতে পারেনি। এ কারণেই আওয়ামী লীগ ইতোমধ্যেই আবার ঘুরে দাঁড়াতে শুরু করেছে।

আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সব ধরনের নির্যাতন ও দমন-পীড়নের পরও দেশের বিভিন্ন জেলা, উপজেলা, ইউনিয়ন ও এলাকায় প্রতিদিন আওয়ামী লীগের সমর্থনে মিছিল হচ্ছে। শুধু আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মী ও সমর্থকরাই নন, সাধারণ মানুষও স্বতঃস্ফূর্তভাবে এসব মিছিলে যোগ দিচ্ছেন। মায়েরা তাঁদের সন্তানদের পাশে দাঁড়িয়ে সাহস ও সমর্থন দিচ্ছেন। এগুলোই প্রমাণ করে যে আওয়ামী লীগ আবারও উঠে দাঁড়াচ্ছে।

বর্তমান সরকারের আচরণই প্রমাণ করে, তারা আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক শক্তিকে ভয় পায়। এ কারণেই আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর কর্মসূচি ঠেকাতে তারা সেনাবাহিনী, বিজিবি (বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ) এবং পুলিশ মোতায়েন করেছিল। এটি তাদের দুর্বলতারই লক্ষণ। আওয়ামী লীগকে বলপ্রয়োগ করে দমন করা যাবে না। যে দল জনগণের মধ্যে জাগরণ সৃষ্টি করতে পারে, তাকে ভয়ভীতি বা দমন-পীড়নের মাধ্যমে থামানো সম্ভব নয়। ইতিহাস আমাদের শেখায়, আওয়ামী লীগ কখনো শাসকদের রক্তচক্ষুকে ভয় পায়নি। বরং সেই রক্তচক্ষুকে অগ্রাহ্য করেই বিজয়ের পতাকা উড়িয়েছে।

বাংলাদেশে একটি সুষ্ঠু গণতান্ত্রিক পরিবেশ ও স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করতে হলে আওয়ামী লীগের ওপর আরোপিত অবৈধ নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করতে হবে। মিথ্যা মামলাগুলো প্রত্যাহার করতে হবে। রাজনৈতিক বন্দিদের মুক্তি দিতে হবে। শান্তিপূর্ণ রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড পরিচালনার সুযোগ দিতে হবে। কিন্তু বর্তমানে যারা ক্ষমতা দখল করে আছে, তারা যদি এই ন্যূনতম গণতান্ত্রিক পথও বন্ধ করে রাখে, তাহলে জনগণের মধ্যে জমে থাকা ক্ষোভ, কষ্ট এবং গণতান্ত্রিক আকাঙ্ক্ষাই আওয়ামী লীগের জন্য নতুন পথ তৈরি করবে।

প্রশ্ন: আপনি বলেছেন, ক্ষমতা থেকে অপসারণের পর বাংলাদেশ তার মৌলিক চরিত্র হারিয়েছে এবং পাকিস্তানের মতো একটি রাষ্ট্রব্যবস্থার দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। আপনি এই পরিবর্তনটি কীভাবে ব্যাখ্যা করবেন?

শেখ হাসিনা: আমি কখনোই কোনো দেশের সঙ্গে স্বাভাবিক কূটনৈতিক সম্পর্কের বিরোধিতা করিনি। জনগণের কল্যাণের জন্য বাংলাদেশ সবার সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রাখবে। আমাদের পররাষ্ট্রনীতি সবসময়ই পরিষ্কার ছিল—‘সবার সঙ্গে বন্ধুত্ব, কারও সঙ্গে বৈরিতা নয়।’ কিন্তু সেই সম্পর্ক অবশ্যই রাষ্ট্রের মৌলিক নীতি এবং মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে অক্ষুণ্ন রেখে বজায় রাখতে হবে।

বাংলাদেশের জন্ম হয়েছিল সামরিক শাসন, বৈষম্য, নিপীড়ন, সাম্প্রদায়িক রাজনীতি এবং গণতন্ত্রবিরোধী শক্তির বিরুদ্ধে সংগ্রামের মধ্য দিয়ে। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে আমরা যে রাষ্ট্র গড়ে তুলেছিলাম, তার ভিত্তি ছিল জাতীয়তাবাদ, গণতন্ত্র, সামাজিক ন্যায়বিচার এবং ধর্মনিরপেক্ষতা। সেই ভিত্তিকে দুর্বল করা মানেই বাংলাদেশের অস্তিত্ব ও পরিচয়ের ওপর আঘাত হানা।

শেখ হাসিনা: ৫ আগস্টের পর আমরা মুক্তিযুদ্ধের চেতনার ওপর সর্বাত্মক আক্রমণ প্রত্যক্ষ করেছি। মুক্তিযোদ্ধাদের জুতার মালা পরিয়ে অপমান করা হয়েছে। সারা দেশে মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিস্তম্ভ ভাঙচুর করা হয়েছে। ‘জয় বাংলা’ স্লোগানকে অপরাধ হিসেবে দেখা হয়েছে। জাতির পিতার বাসভবনে বারবার হামলা হয়েছে। সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ওপর আক্রমণ হয়েছে। মন্দির ভাঙচুর করা হয়েছে। সুফি দরগাহ ও সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানে হামলা হয়েছে। সন্ত্রাসবিরোধী কার্যক্রম দুর্বল করে দেওয়া হয়েছে, যার ফলে উগ্রবাদের বিস্তারের সুযোগ তৈরি হয়েছে। অন্য কথায়, বাংলাদেশকে একটি ব্যর্থ রাষ্ট্রে পরিণত করার জন্য প্রয়োজনীয় সব ব্যবস্থাই নেওয়া হয়েছে।

অন্যদিকে, আওয়ামী লীগ সরকারের সময় আমরা স্থিতিশীলতা, আত্মবিশ্বাস এবং দৃশ্যমান অগ্রগতির একটি বাংলাদেশ গড়ে তুলেছিলাম। ২০২৩ সালে বাংলাদেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধি ছিল ৭ দশমিক ২৫ শতাংশ এবং মাথাপিছু আয় পৌঁছেছিল ২ হাজার ৭৯৩ মার্কিন ডলারে। বাংলাদেশ বিশ্বের ৩৫তম বৃহত্তম অর্থনীতিতে পরিণত হয়েছিল এবং ২৯ ধাপ এগিয়ে গিয়েছিল। বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ৩৬ গুণ বৃদ্ধি পেয়েছিল। জিডিপির তুলনায় বিনিয়োগের হার দাঁড়িয়েছিল ৩২ দশমিক ০৫ শতাংশ। প্রত্যক্ষ বৈদেশিক বিনিয়োগ পাঁচ গুণ বেড়ে ৩ দশমিক ৪৮ বিলিয়ন মার্কিন ডলারে পৌঁছেছিল।

আমরা দারিদ্র্যের হার ১৮ দশমিক ৭ শতাংশে এবং চরম দারিদ্র্য ৫ দশমিক ৬ শতাংশে নামিয়ে এনেছিলাম। খাদ্যশস্য উৎপাদন চার গুণ বৃদ্ধি পেয়েছিল। শিশুমৃত্যুর হার চার গুণ কমেছিল। বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা আট গুণ বেড়েছিল এবং দেশের শতভাগ মানুষ বিদ্যুতের আওতায় এসেছিল। সাক্ষরতার হার ৭৮ দশমিক ৫ শতাংশে পৌঁছেছিল। কর্মক্ষেত্রে নারীর অংশগ্রহণ বেড়ে ৪৩ দশমিক ৪৪ শতাংশে উন্নীত হয়েছিল। মানুষের দোরগোড়ায় স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছে দিতে আমরা ১৪ হাজার ৯৮৪টি কমিউনিটি ক্লিনিক প্রতিষ্ঠা করেছি।

আমরা ভূমিহীন ও গৃহহীন পরিবারগুলোকে মর্যাদার সঙ্গে পুনর্বাসন করেছি। প্রায় ৪২ লাখ ৮০ হাজার ১১৫ জন মানুষকে সম্পূর্ণ বিনামূল্যে দুই শতক জমিসহ একটি বাড়ির মালিকানা দিয়েছি। পদ্মা সেতু, মেট্রোরেল, কর্ণফুলী টানেল, এক্সপ্রেসওয়ে, ডিজিটাল বাংলাদেশ, বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইটসহ বিভিন্ন মেগা প্রকল্পের মাধ্যমে আমরা বাংলাদেশকে উন্নয়নের একটি বৈশ্বিক রোল মডেলে পরিণত করেছি। আমরা প্রমাণ করেছি, বাঙালি জাতি যদি সুযোগ, শান্তিপূর্ণ পরিবেশ এবং সৎ নেতৃত্ব পায়, তাহলে তারা নিজেদের শক্তিতেই মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে পারে।

৫ আগস্টের পর যেভাবে বাংলাদেশের উন্নয়নের যাত্রাকে ধ্বংস করা হয়েছে এবং যেভাবে উগ্রবাদ ও সন্ত্রাসের শাসন প্রতিষ্ঠিত হয়েছে, সেই পরিস্থিতি থেকে দেশকে মুক্ত করতে পারে একমাত্র আওয়ামী লীগ। জনগণ তা বুঝতে পেরেছে। অবাধ, সুষ্ঠু ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন হলে আওয়ামী লীগই বিজয়ী হবে। ইউনূস এবং বাংলাদেশবিরোধী রাজনৈতিক শক্তিগুলোও এটি খুব ভালো করেই জানে। এ কারণেই অবৈধ অন্তর্বর্তী সরকার ইচ্ছাকৃতভাবে আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধ করেছে, দলটিকে নির্বাচনী প্রক্রিয়ার বাইরে রেখেছে এবং বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক ঐতিহ্য ধ্বংস করেছে। ৫ আগস্টের পর বাংলাদেশে এভাবেই একটি ব্যর্থ রাষ্ট্রের মডেল প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে।

প্রশ্ন: আওয়ামী লীগের ওপর নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার এবং আপনার বিরুদ্ধে বিচারপ্রক্রিয়া সুষ্ঠুভাবে পরিচালনার বিষয়ে বিএনপির নেতৃত্বের সঙ্গে আপনার কোনো অনানুষ্ঠানিক বা গোপন আলোচনা হয়েছে বলে যে খবর প্রকাশিত হয়েছে, তাতে কি কোনো সত্যতা রয়েছে?

শেখ হাসিনা: জনগণকে বিভ্রান্ত করার জন্য ষড়যন্ত্রকারীরা ইচ্ছাকৃতভাবে এ ধরনের প্রচারণা চালিয়ে থাকে। আমার অবস্থান একেবারেই পরিষ্কার। বাংলাদেশের গণতন্ত্র, আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক অধিকার, জনগণের ভোটাধিকার এবং ন্যায়বিচার—এসব কোনো গোপন দরকষাকষির বিষয় নয়। এগুলো জনগণের সাংবিধানিক অধিকার।

আওয়ামী লীগের ওপর নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করা কোনো অনুগ্রহ নয়। এটি একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের ন্যূনতম শর্ত। একইভাবে, ন্যায়বিচারও কোনো দয়া বা অনুগ্রহ নয়; এটি একটি মৌলিক অধিকার। কোনো নাগরিক, রাজনৈতিক নেতা বা রাজনৈতিক দলের বিরুদ্ধে মামলা থাকলে, তা অবশ্যই স্বাধীন, নিরপেক্ষ এবং আইনসম্মত বিচারিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে পরিচালিত হতে হবে। রাজনৈতিক নির্দেশনায় পরিচালিত ট্রাইব্যুনাল, সাজানো মামলা, ভয়ভীতি দেখিয়ে আদায় করা সাক্ষ্য কিংবা বিচার বিভাগের ওপর চাপ সৃষ্টি করে কখনো ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করা যায় না।

জনপ্রিয় সংবাদ

“আমি এ বছরই দেশে ফিরব” – শেখ হাসিনা

“আমি এ বছরই দেশে ফিরব” – শেখ হাসিনা

১২:০৪:১০ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ২৯ জুন ২০২৬

বাংলাদেশে তাঁকে ক্ষমতাচ্যুত করার প্রায় দুই বছর হয়ে গেছে। যে দেশটি তাঁর বাবা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান একটি বৈরী পাকিস্তানের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করে প্রতিষ্ঠা করেছিলেন, সেখান থেকেই তাঁকে দেশত্যাগে বাধ্য হতে হয়। মৃত্যুদণ্ডের রায়, বাংলাদেশে আওয়ামী লীগের ওপর নিষেধাজ্ঞা—এসবের পর পরিস্থিতি সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার জন্য এর চেয়ে কঠিন আর কী হতে পারে?

কিন্তু তিনি বিচলিত নন। যুক্তরাষ্ট্রের খ্যাতিমান সেনাপতি ডগলাস ম্যাকআর্থারের মতোই তিনি দৃঢ় কণ্ঠে বলেন, “আমি এ বছরই দেশে ফিরব।” নির্বাসন থেকে তিনি আরও বলেন, আওয়ামী লীগ শুধু একটি রাজনৈতিক দল নয়, এটি একটি “শক্তি”। তাঁর মতে, সংখ্যালঘুদের ওপর যেকোনো হামলা বাংলাদেশের স্বাধীনতার ওপরই হামলার শামিল।

গত মঙ্গলবার (২৩ জুন) দেশব্যাপী নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে আওয়ামী লীগ তাদের ৭৭তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী পালন করে। কঠোর নিরাপত্তার মধ্যেই দলটির বহু নেতা-কর্মীকে গ্রেপ্তার করা হয়।

বাংলাদেশের নানা বিষয় নিয়ে নির্বাসন থেকে এনডিটিভিকে একান্ত ই-মেইল সাক্ষাৎকার দেন শেখ হাসিনা। নিচে সেই সাক্ষাৎকারের বাংলা অনুবাদ তুলে ধরা হলো।

প্রশ্ন: আপনি বহুবার ইঙ্গিত দিয়েছেন—এবং আপনার সমর্থকরাও আশাবাদী—যে আপনি শিগগিরই বাংলাদেশে ফিরবেন। এমনকি দলের কিছু নেতা বলেছেন, এ বছরের মধ্যেই তা সম্ভব হতে পারে। কিন্তু আপনার বিরুদ্ধে মৃত্যুদণ্ডের রায় থাকায় এটি কতটা বাস্তবসম্মত?

শেখ হাসিনা: আমার দেশে ফেরা ব্যক্তিগত উচ্চাকাঙ্ক্ষার বিষয় নয়। এটি বাংলাদেশের মানুষের রাজনৈতিক অধিকার, গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠা, আইনের শাসন এবং আমাদের মুক্তিযুদ্ধের চেতনা পুনরুদ্ধারের সঙ্গে জড়িত। আমি ক্ষমতার জন্য রাজনীতি করি না। আমি রাজনীতি করি বাংলাদেশের মানুষের কল্যাণের জন্য এবং জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের স্বপ্নের সোনার বাংলা গড়ে তোলার লক্ষ্যে।

আমার বিরুদ্ধে যে রায় দেওয়া হয়েছে, তা ন্যায়বিচার নয়। এটি একটি অবৈধ, অসাংবিধানিক এবং রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত প্রক্রিয়ার অংশ। বিচারব্যবস্থাকে রাজনৈতিক প্রতিশোধের হাতিয়ারে পরিণত করা হয়েছে, যাতে আওয়ামী লীগকে নেতৃত্বশূন্য করা যায়। অতীতেও এমন চেষ্টা হয়েছে। তখনও তারা ব্যর্থ হয়েছে, এবারও ব্যর্থ হবে।

আমি মৃত্যুকে ভয় পাই না। ১৯৭৫ সালে আমি আমার বাবা-মা, ভাইদের এবং প্রায় পুরো পরিবারকে হারিয়েছি। ২১ আগস্ট আমাকে হত্যার উদ্দেশ্যে গ্রেনেড হামলা চালানো হয়েছিল। আমার বিরুদ্ধে অসংখ্য ষড়যন্ত্র হয়েছে। কিন্তু প্রতিটি ষড়যন্ত্রের জাল ভেদ করে আমি বাংলাদেশের মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছি।

জনগণের ভোটে আমি পাঁচবার বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হয়েছি এবং দেশের অভূতপূর্ব উন্নয়নে কাজ করেছি। আমার প্রায় পুরো জীবন বাংলাদেশের মানুষ, আওয়ামী লীগ, গণতান্ত্রিক সংগ্রাম এবং দেশের উন্নয়নের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। তাই আমি স্পষ্ট করে বলতে চাই—সব বাধা, সব ষড়যন্ত্র অতিক্রম করে আমি এ বছরই আমার দেশে ফিরব।

প্রশ্ন: বাংলাদেশের বর্তমান সরকারের নানা সীমাবদ্ধতা ও ব্যর্থতার কারণে আওয়ামী লীগ আবারও জনসমর্থন ফিরে পাচ্ছে—এমন ইঙ্গিত দেখা যাচ্ছে। এই জনসমর্থনকে রাজনৈতিক সাফল্যে রূপ দেওয়ার মতো সাংগঠনিক শক্তি কি এখনও দলটির রয়েছে?

শেখ হাসিনা: আওয়ামী লীগ কোনো কাগুজে সংগঠন নয়। এটি বাংলার মাটি, বাংলার মানুষ, বাংলার ইতিহাস এবং বাঙালি জাতির পরিচয়ের গভীরে প্রোথিত একটি রাজনৈতিক শক্তি। ৭৭ বছরের যাত্রায় আওয়ামী লীগ বহুবার হামলার শিকার হয়েছে, বহুবার রক্ত দিয়েছে, বহুবার নিষিদ্ধ হয়েছে। কিন্তু প্রতিবারই জনগণের শক্তিতে আবার ঘুরে দাঁড়িয়েছে।

আওয়ামী লীগের প্রত্যাবর্তন অন্য কারও ব্যর্থতা বা দুর্বলতার ওপর নির্ভর করে না। আওয়ামী লীগ জনগণকে সঙ্গে নিয়েই নিজের পথ তৈরি করে। জনগণের সমর্থন সবসময়ই আমাদের সঙ্গে ছিল। সেই শক্তির ভিত্তিতেই আমরা সরকারে থাকাকালে মানুষের জীবনমান উন্নয়নে নিরলসভাবে কাজ করেছি। বাংলাদেশবিরোধী শক্তিগুলো জনগণের একটি অংশকে বিভ্রান্ত করে সুপরিকল্পিত ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে আওয়ামী লীগকে রাষ্ট্রক্ষমতা থেকে সরিয়ে দিয়েছে। কিন্তু সব চেষ্টা সত্ত্বেও তারা জনগণের হৃদয় থেকে আওয়ামী লীগকে মুছে ফেলতে পারেনি।

মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অবৈধ, অসাংবিধানিক ও দখলদার অন্তর্বর্তী সরকারের সময় এবং এখন সাজানো নির্বাচনের মাধ্যমে গঠিত বিএনপি সরকারের অধীনেও মানুষ বাস্তবতা নিজের চোখে দেখছে। দেশে গণতন্ত্র নেই। আইনের শাসন নেই। নিরাপত্তা নেই। অর্থনীতি দুর্বল হয়ে পড়েছে। সংখ্যালঘুরা হামলার শিকার হচ্ছে। উগ্রবাদ ছড়িয়ে পড়ছে। আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীরা অকল্পনীয় রাষ্ট্রীয় নির্যাতনের মুখোমুখি হচ্ছেন। মানুষ তুলনা করতে জানে। তারা বোঝে, আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় থাকলে দেশে স্থিতিশীলতা, উন্নয়ন এবং মানুষের জীবন ও সম্পদের নিরাপত্তা থাকে।

সাংগঠনিক শক্তির প্রশ্নে আমি বলতে চাই, বাংলাদেশের রাজনীতির প্রতিটি অলিগলি আওয়ামী লীগের চেনা। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে এই দলই বাংলাদেশের জন্ম দিয়েছে। দেশের প্রতিটি গণতান্ত্রিক আন্দোলনের নেতৃত্ব দিয়েছে আওয়ামী লীগ। জনগণের সমর্থন ও আকাঙ্ক্ষাকে রাজনৈতিক বাস্তবতায় রূপ দেওয়ার ক্ষমতা আওয়ামী লীগের রক্তে মিশে আছে। আগুনে যেমন সোনা আরও খাঁটি হয়, তেমনি শাসকদের দমন-পীড়ন আওয়ামী লীগকে প্রতিদিন আরও শক্তিশালী করে তুলছে।

আওয়ামী লীগের ৭৭তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে আমি আমাদের নেতা-কর্মী ও সমর্থকদের উদ্দেশে একটি কথাই বলতে চাই—ঐক্যবদ্ধ থাকুন এবং মানুষের পাশে থাকুন। দেশের প্রতিটি গ্রাম, মহল্লা, ওয়ার্ড ও ইউনিয়নের মানুষের সঙ্গে সম্পর্ক আরও গভীর করুন। নির্যাতিত মানুষের পাশে দাঁড়ান। সংখ্যালঘু, নারী, শিশু, শ্রমজীবী মানুষ, দরিদ্র ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর নিরাপত্তা ও মর্যাদার প্রশ্নে কখনও আপস করবেন না। আওয়ামী লীগের রাজনীতি প্রতিশোধের রাজনীতি নয়; এটি অধিকার, নিরাপত্তা, মর্যাদা এবং উন্নয়নের রাজনীতি। আওয়ামী লীগ ছিল মানুষের সঙ্গে, আছে মানুষের সঙ্গে এবং মানুষের সঙ্গেই থাকবে। জনগণের শক্তিতেই আওয়ামী লীগ আবারও ঘুরে দাঁড়াবে।

প্রশ্ন: আওয়ামী লীগের ওপর নিষেধাজ্ঞা এখনও বহাল রয়েছে এবং দলটির নেতা-কর্মীদের বিরুদ্ধে হাজার হাজার মামলা হয়েছে বলে জানা যাচ্ছে। এমন পরিস্থিতিতে নিকট ভবিষ্যতে দলটির রাজনৈতিকভাবে ঘুরে দাঁড়ানো কতটা সম্ভব?

শেখ হাসিনা: আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক পুনরুত্থান কোনো সরকারের অনুগ্রহের ওপর নির্ভর করে না। এটি নির্ভর করে জনগণের ওপর। একটি অবৈধ নিষেধাজ্ঞার মাধ্যমে তারা হয়তো আওয়ামী লীগকে একটি সাজানো নির্বাচনের বাইরে রেখেছে। তারা হয়তো দলীয় কার্যালয় বন্ধ করেছে। তারা হয়তো সাময়িকভাবে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড দমন করেছে। কিন্তু তারা জনগণের হৃদয় থেকে আওয়ামী লীগকে মুছে ফেলতে পারেনি। এ কারণেই আওয়ামী লীগ ইতোমধ্যেই আবার ঘুরে দাঁড়াতে শুরু করেছে।

আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সব ধরনের নির্যাতন ও দমন-পীড়নের পরও দেশের বিভিন্ন জেলা, উপজেলা, ইউনিয়ন ও এলাকায় প্রতিদিন আওয়ামী লীগের সমর্থনে মিছিল হচ্ছে। শুধু আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মী ও সমর্থকরাই নন, সাধারণ মানুষও স্বতঃস্ফূর্তভাবে এসব মিছিলে যোগ দিচ্ছেন। মায়েরা তাঁদের সন্তানদের পাশে দাঁড়িয়ে সাহস ও সমর্থন দিচ্ছেন। এগুলোই প্রমাণ করে যে আওয়ামী লীগ আবারও উঠে দাঁড়াচ্ছে।

বর্তমান সরকারের আচরণই প্রমাণ করে, তারা আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক শক্তিকে ভয় পায়। এ কারণেই আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর কর্মসূচি ঠেকাতে তারা সেনাবাহিনী, বিজিবি (বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ) এবং পুলিশ মোতায়েন করেছিল। এটি তাদের দুর্বলতারই লক্ষণ। আওয়ামী লীগকে বলপ্রয়োগ করে দমন করা যাবে না। যে দল জনগণের মধ্যে জাগরণ সৃষ্টি করতে পারে, তাকে ভয়ভীতি বা দমন-পীড়নের মাধ্যমে থামানো সম্ভব নয়। ইতিহাস আমাদের শেখায়, আওয়ামী লীগ কখনো শাসকদের রক্তচক্ষুকে ভয় পায়নি। বরং সেই রক্তচক্ষুকে অগ্রাহ্য করেই বিজয়ের পতাকা উড়িয়েছে।

বাংলাদেশে একটি সুষ্ঠু গণতান্ত্রিক পরিবেশ ও স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করতে হলে আওয়ামী লীগের ওপর আরোপিত অবৈধ নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করতে হবে। মিথ্যা মামলাগুলো প্রত্যাহার করতে হবে। রাজনৈতিক বন্দিদের মুক্তি দিতে হবে। শান্তিপূর্ণ রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড পরিচালনার সুযোগ দিতে হবে। কিন্তু বর্তমানে যারা ক্ষমতা দখল করে আছে, তারা যদি এই ন্যূনতম গণতান্ত্রিক পথও বন্ধ করে রাখে, তাহলে জনগণের মধ্যে জমে থাকা ক্ষোভ, কষ্ট এবং গণতান্ত্রিক আকাঙ্ক্ষাই আওয়ামী লীগের জন্য নতুন পথ তৈরি করবে।

প্রশ্ন: আপনি বলেছেন, ক্ষমতা থেকে অপসারণের পর বাংলাদেশ তার মৌলিক চরিত্র হারিয়েছে এবং পাকিস্তানের মতো একটি রাষ্ট্রব্যবস্থার দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। আপনি এই পরিবর্তনটি কীভাবে ব্যাখ্যা করবেন?

শেখ হাসিনা: আমি কখনোই কোনো দেশের সঙ্গে স্বাভাবিক কূটনৈতিক সম্পর্কের বিরোধিতা করিনি। জনগণের কল্যাণের জন্য বাংলাদেশ সবার সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রাখবে। আমাদের পররাষ্ট্রনীতি সবসময়ই পরিষ্কার ছিল—‘সবার সঙ্গে বন্ধুত্ব, কারও সঙ্গে বৈরিতা নয়।’ কিন্তু সেই সম্পর্ক অবশ্যই রাষ্ট্রের মৌলিক নীতি এবং মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে অক্ষুণ্ন রেখে বজায় রাখতে হবে।

বাংলাদেশের জন্ম হয়েছিল সামরিক শাসন, বৈষম্য, নিপীড়ন, সাম্প্রদায়িক রাজনীতি এবং গণতন্ত্রবিরোধী শক্তির বিরুদ্ধে সংগ্রামের মধ্য দিয়ে। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে আমরা যে রাষ্ট্র গড়ে তুলেছিলাম, তার ভিত্তি ছিল জাতীয়তাবাদ, গণতন্ত্র, সামাজিক ন্যায়বিচার এবং ধর্মনিরপেক্ষতা। সেই ভিত্তিকে দুর্বল করা মানেই বাংলাদেশের অস্তিত্ব ও পরিচয়ের ওপর আঘাত হানা।

শেখ হাসিনা: ৫ আগস্টের পর আমরা মুক্তিযুদ্ধের চেতনার ওপর সর্বাত্মক আক্রমণ প্রত্যক্ষ করেছি। মুক্তিযোদ্ধাদের জুতার মালা পরিয়ে অপমান করা হয়েছে। সারা দেশে মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিস্তম্ভ ভাঙচুর করা হয়েছে। ‘জয় বাংলা’ স্লোগানকে অপরাধ হিসেবে দেখা হয়েছে। জাতির পিতার বাসভবনে বারবার হামলা হয়েছে। সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ওপর আক্রমণ হয়েছে। মন্দির ভাঙচুর করা হয়েছে। সুফি দরগাহ ও সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানে হামলা হয়েছে। সন্ত্রাসবিরোধী কার্যক্রম দুর্বল করে দেওয়া হয়েছে, যার ফলে উগ্রবাদের বিস্তারের সুযোগ তৈরি হয়েছে। অন্য কথায়, বাংলাদেশকে একটি ব্যর্থ রাষ্ট্রে পরিণত করার জন্য প্রয়োজনীয় সব ব্যবস্থাই নেওয়া হয়েছে।

অন্যদিকে, আওয়ামী লীগ সরকারের সময় আমরা স্থিতিশীলতা, আত্মবিশ্বাস এবং দৃশ্যমান অগ্রগতির একটি বাংলাদেশ গড়ে তুলেছিলাম। ২০২৩ সালে বাংলাদেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধি ছিল ৭ দশমিক ২৫ শতাংশ এবং মাথাপিছু আয় পৌঁছেছিল ২ হাজার ৭৯৩ মার্কিন ডলারে। বাংলাদেশ বিশ্বের ৩৫তম বৃহত্তম অর্থনীতিতে পরিণত হয়েছিল এবং ২৯ ধাপ এগিয়ে গিয়েছিল। বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ৩৬ গুণ বৃদ্ধি পেয়েছিল। জিডিপির তুলনায় বিনিয়োগের হার দাঁড়িয়েছিল ৩২ দশমিক ০৫ শতাংশ। প্রত্যক্ষ বৈদেশিক বিনিয়োগ পাঁচ গুণ বেড়ে ৩ দশমিক ৪৮ বিলিয়ন মার্কিন ডলারে পৌঁছেছিল।

আমরা দারিদ্র্যের হার ১৮ দশমিক ৭ শতাংশে এবং চরম দারিদ্র্য ৫ দশমিক ৬ শতাংশে নামিয়ে এনেছিলাম। খাদ্যশস্য উৎপাদন চার গুণ বৃদ্ধি পেয়েছিল। শিশুমৃত্যুর হার চার গুণ কমেছিল। বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা আট গুণ বেড়েছিল এবং দেশের শতভাগ মানুষ বিদ্যুতের আওতায় এসেছিল। সাক্ষরতার হার ৭৮ দশমিক ৫ শতাংশে পৌঁছেছিল। কর্মক্ষেত্রে নারীর অংশগ্রহণ বেড়ে ৪৩ দশমিক ৪৪ শতাংশে উন্নীত হয়েছিল। মানুষের দোরগোড়ায় স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছে দিতে আমরা ১৪ হাজার ৯৮৪টি কমিউনিটি ক্লিনিক প্রতিষ্ঠা করেছি।

আমরা ভূমিহীন ও গৃহহীন পরিবারগুলোকে মর্যাদার সঙ্গে পুনর্বাসন করেছি। প্রায় ৪২ লাখ ৮০ হাজার ১১৫ জন মানুষকে সম্পূর্ণ বিনামূল্যে দুই শতক জমিসহ একটি বাড়ির মালিকানা দিয়েছি। পদ্মা সেতু, মেট্রোরেল, কর্ণফুলী টানেল, এক্সপ্রেসওয়ে, ডিজিটাল বাংলাদেশ, বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইটসহ বিভিন্ন মেগা প্রকল্পের মাধ্যমে আমরা বাংলাদেশকে উন্নয়নের একটি বৈশ্বিক রোল মডেলে পরিণত করেছি। আমরা প্রমাণ করেছি, বাঙালি জাতি যদি সুযোগ, শান্তিপূর্ণ পরিবেশ এবং সৎ নেতৃত্ব পায়, তাহলে তারা নিজেদের শক্তিতেই মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে পারে।

৫ আগস্টের পর যেভাবে বাংলাদেশের উন্নয়নের যাত্রাকে ধ্বংস করা হয়েছে এবং যেভাবে উগ্রবাদ ও সন্ত্রাসের শাসন প্রতিষ্ঠিত হয়েছে, সেই পরিস্থিতি থেকে দেশকে মুক্ত করতে পারে একমাত্র আওয়ামী লীগ। জনগণ তা বুঝতে পেরেছে। অবাধ, সুষ্ঠু ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন হলে আওয়ামী লীগই বিজয়ী হবে। ইউনূস এবং বাংলাদেশবিরোধী রাজনৈতিক শক্তিগুলোও এটি খুব ভালো করেই জানে। এ কারণেই অবৈধ অন্তর্বর্তী সরকার ইচ্ছাকৃতভাবে আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধ করেছে, দলটিকে নির্বাচনী প্রক্রিয়ার বাইরে রেখেছে এবং বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক ঐতিহ্য ধ্বংস করেছে। ৫ আগস্টের পর বাংলাদেশে এভাবেই একটি ব্যর্থ রাষ্ট্রের মডেল প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে।

প্রশ্ন: আওয়ামী লীগের ওপর নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার এবং আপনার বিরুদ্ধে বিচারপ্রক্রিয়া সুষ্ঠুভাবে পরিচালনার বিষয়ে বিএনপির নেতৃত্বের সঙ্গে আপনার কোনো অনানুষ্ঠানিক বা গোপন আলোচনা হয়েছে বলে যে খবর প্রকাশিত হয়েছে, তাতে কি কোনো সত্যতা রয়েছে?

শেখ হাসিনা: জনগণকে বিভ্রান্ত করার জন্য ষড়যন্ত্রকারীরা ইচ্ছাকৃতভাবে এ ধরনের প্রচারণা চালিয়ে থাকে। আমার অবস্থান একেবারেই পরিষ্কার। বাংলাদেশের গণতন্ত্র, আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক অধিকার, জনগণের ভোটাধিকার এবং ন্যায়বিচার—এসব কোনো গোপন দরকষাকষির বিষয় নয়। এগুলো জনগণের সাংবিধানিক অধিকার।

আওয়ামী লীগের ওপর নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করা কোনো অনুগ্রহ নয়। এটি একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের ন্যূনতম শর্ত। একইভাবে, ন্যায়বিচারও কোনো দয়া বা অনুগ্রহ নয়; এটি একটি মৌলিক অধিকার। কোনো নাগরিক, রাজনৈতিক নেতা বা রাজনৈতিক দলের বিরুদ্ধে মামলা থাকলে, তা অবশ্যই স্বাধীন, নিরপেক্ষ এবং আইনসম্মত বিচারিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে পরিচালিত হতে হবে। রাজনৈতিক নির্দেশনায় পরিচালিত ট্রাইব্যুনাল, সাজানো মামলা, ভয়ভীতি দেখিয়ে আদায় করা সাক্ষ্য কিংবা বিচার বিভাগের ওপর চাপ সৃষ্টি করে কখনো ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করা যায় না।