যুদ্ধক্ষেত্রে লক্ষ্য নির্বাচন ও হামলার সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ব্যবহার আরও বাড়ানোর পথে এগোচ্ছে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা দপ্তর। সম্প্রতি অনুমোদিত একটি সংশোধিত নীতিমালায় ভবিষ্যতে এমন ব্যবস্থার কথা বলা হয়েছে, যেখানে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নিজেই প্রাথমিক পদক্ষেপ শুরু করবে এবং মানুষ সেই কার্যক্রম পর্যবেক্ষণ করবে।
এই পরিবর্তনকে সামরিক প্রযুক্তির ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ মোড় হিসেবে দেখা হচ্ছে। কারণ এতদিন প্রচলিত ব্যবস্থায় মানুষের নির্দেশনার পর প্রযুক্তি কাজ করত। নতুন ধারণায় সেই সম্পর্ক উল্টো হতে পারে, যেখানে প্রযুক্তি দ্রুত সিদ্ধান্তের প্রস্তাব দেবে এবং মানুষ তা পর্যবেক্ষণ করবে।
মানবনির্ভরতা কমানোর ইঙ্গিত
নতুন নীতিমালায় ভবিষ্যৎ যুদ্ধের গতি ও জটিলতার কথা উল্লেখ করে বলা হয়েছে, প্রতিদ্বন্দ্বী দেশগুলোর কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা সক্ষমতা দ্রুত বাড়ছে। ফলে সামরিক বাহিনীকে আরও স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থার দিকে এগোতে হতে পারে।
নথিতে বলা হয়েছে, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা সেন্সর থেকে অস্ত্র ব্যবহারের মধ্যবর্তী সময় উল্লেখযোগ্যভাবে কমিয়ে দিতে পারে এবং সামরিক অভিযানের গতি বাড়াতে পারে। এর ফলে যুদ্ধক্ষেত্রে দ্রুত প্রতিক্রিয়া জানানো সম্ভব হবে।
নতুন লক্ষ্য নির্ধারণ ব্যবস্থা
সংশোধিত নির্দেশিকায় যৌথ লক্ষ্য নির্ধারণ প্রক্রিয়ার ভবিষ্যৎ নিয়ে একটি নতুন অধ্যায় যুক্ত করা হয়েছে। এতে ব্যাখ্যা করা হয়েছে কীভাবে বিভিন্ন উৎস থেকে সংগৃহীত তথ্য বিশ্লেষণ করে দ্রুত লক্ষ্য নির্বাচন করা যাবে।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বিপুল পরিমাণ গোয়েন্দা তথ্য খুব অল্প সময়ে বিশ্লেষণ করতে পারে। বিভিন্ন প্ল্যাটফর্ম থেকে প্রাপ্ত তথ্যের সত্যতা যাচাই ও তুলনা করতেও এটি সহায়তা করতে পারে বলে নীতিমালায় উল্লেখ করা হয়েছে।
নৈতিক ও আইনি প্রশ্ন
তবে প্রযুক্তির এই অগ্রগতির সঙ্গে বড় ধরনের নৈতিক ও আইনি উদ্বেগও উঠে এসেছে। নতুন নথিতে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা গুরুতর নৈতিক ও আইনগত সমস্যার জন্ম দিতে পারে।
এ কারণে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক সিদ্ধান্ত ব্যবস্থার জন্য সুস্পষ্ট নৈতিক নির্দেশিকা প্রয়োজন বলে উল্লেখ করা হয়েছে। যদিও সংশোধিত নীতিমালায় সেই নির্দেশিকা এখনো অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি।
বিশেষজ্ঞদের একটি অংশ মনে করেন, যুদ্ধক্ষেত্রে সম্পূর্ণ স্বয়ংক্রিয় প্রাণঘাতী অস্ত্র ব্যবস্থার ব্যবহার মানবিক ও রাজনৈতিকভাবে অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। আন্তর্জাতিক পর্যায়েও এমন অস্ত্র নিষিদ্ধ করার দাবি দীর্ঘদিন ধরে উঠছে।
মানুষের ভূমিকা এখনো থাকছে
সামরিক বাহিনী জোর দিয়ে বলছে, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহারের লক্ষ্য হলো কমান্ডারদের দ্রুত ও উন্নত বিকল্প সরবরাহ করা, স্বয়ংক্রিয়ভাবে হামলা চালানো নয়।
নীতিমালায় বলা হয়েছে, কোনো স্বয়ংক্রিয় প্রযুক্তি ব্যবহার করা হলেও চূড়ান্ত দায়িত্ব কমান্ডারদের ওপরই থাকবে। যুদ্ধের আইন, সামরিক নিয়ম এবং অভিযানের সময় ও অগ্রাধিকার নির্ধারণের দায়িত্ব মানুষের হাতেই থাকবে।
একই সঙ্গে সতর্ক করে বলা হয়েছে, স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থা কখনোই মানবিক চিন্তাভাবনা, বিচক্ষণতা বা সক্রিয় যোগাযোগের বিকল্প হতে পারে না।
ভবিষ্যৎ যুদ্ধের নতুন বাস্তবতা
বিশ্লেষকদের মতে, আধুনিক যুদ্ধক্ষেত্রে তথ্যের পরিমাণ ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের গতি এত দ্রুত বাড়ছে যে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ছাড়া সেই চাপ সামাল দেওয়া কঠিন হয়ে পড়ছে। ফলে সামরিক বাহিনী একদিকে প্রযুক্তির সুবিধা নিতে চাইছে, অন্যদিকে মানুষের নিয়ন্ত্রণ ও জবাবদিহিতা বজায় রাখার চ্যালেঞ্জও মোকাবিলা করতে হচ্ছে।
নতুন নীতিমালা সেই দুই বাস্তবতার মধ্যেই ভারসাম্য খোঁজার একটি প্রচেষ্টা হিসেবে দেখা হচ্ছে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















