অনেকেই ঘুমের মান বিচার করেন কত ঘণ্টা ঘুমিয়েছেন বা রাতে কতবার ঘুম ভেঙেছে তার ওপর ভিত্তি করে। কিন্তু বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ঘুমের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক আছে যা প্রায়ই উপেক্ষিত হয়—ঘুমের সময়সূচির নিয়মিততা। প্রতিদিন একই সময়ে ঘুমানো ও জাগার অভ্যাস শরীরের দীর্ঘমেয়াদি স্বাস্থ্যের জন্য বড় ভূমিকা রাখতে পারে।
ঘুমের নিয়মিততা কী
ঘুমের নিয়মিততা বলতে বোঝায় প্রতিদিন প্রায় একই সময়ে ঘুমাতে যাওয়া এবং একই সময়ে জেগে ওঠা। বিশেষজ্ঞদের মতে, আদর্শভাবে এই সময়সূচির পার্থক্য ৩০ মিনিটের বেশি হওয়া উচিত নয়—এমনকি সপ্তাহান্তেও নয়।
কানাডার অটোয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের চিকিৎসাবিজ্ঞানের অধ্যাপক জ্যঁ-ফিলিপ শাপু বলেন, বাস্তবে অনেক প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের ঘুমের সময়সূচি নিয়মিত থাকে না। আর এই অনিয়ম তাদের স্বাস্থ্যের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।

গবেষণায় কী পাওয়া গেছে
ঘুমের অনিয়ম ও স্বাস্থ্যঝুঁকির সম্পর্ক নিয়ে বেশিরভাগ গবেষণা পর্যবেক্ষণভিত্তিক। অর্থাৎ এগুলো সরাসরি কারণ-প্রভাব সম্পর্ক প্রমাণ করতে পারে না। তবু বিভিন্ন গবেষণায় কিছু স্পষ্ট প্রবণতা দেখা গেছে।
গবেষণাগুলো বলছে, যাদের ঘুমের সময়সূচি বেশি অনিয়মিত, তাদের মধ্যে হৃদরোগ, স্থূলতা, মানসিক সমস্যা যেমন বিষণ্নতা ও উদ্বেগ এবং ডিমেনশিয়ার ঝুঁকি তুলনামূলক বেশি।
২০২০ সালের একটি গবেষণায় যুক্তরাষ্ট্রের ৪৫ থেকে ৮৪ বছর বয়সী প্রায় দুই হাজার মানুষের ঘুমের তথ্য বিশ্লেষণ করা হয়। এতে দেখা যায়, যাদের ঘুমের সময়সূচি সবচেয়ে বেশি অনিয়মিত ছিল, তাদের হৃদরোগে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি নিয়মিত ঘুমের অভ্যাস থাকা মানুষের তুলনায় দ্বিগুণেরও বেশি।
২০২৪ সালে যুক্তরাজ্যের ৮৮ হাজারের বেশি প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের ওপর আরেকটি গবেষণায় “ঘুমের নিয়মিততা” স্কোর নির্ধারণ করা হয়। এতে দেখা যায়, যাদের স্কোর সবচেয়ে কম—অর্থাৎ যাদের ঘুমের সময়সূচি সবচেয়ে অনিয়মিত—তাদের ডিমেনশিয়ায় আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা মাঝামাঝি স্কোরধারীদের তুলনায় প্রায় ৫০ শতাংশ বেশি।
পেনসিলভানিয়া স্টেট ইউনিভার্সিটির ঘুম ও বার্ধক্য বিষয়ক গবেষক সুমি লি বলেন, ঠিক কতটা অনিয়ম স্বাস্থ্যের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ তা এখনও পুরোপুরি স্পষ্ট নয়। তবে যত বেশি কেউ নিজের স্বাভাবিক ঘুমের সময়সূচি থেকে বিচ্যুত হয়—দিনের ভেতরে বা সপ্তাহ- মাসজুড়ে—ঝুঁকিও তত বাড়তে থাকে।
২০২৩ সালে প্রকাশিত বেশ কয়েকটি গবেষণার বিশ্লেষণে ঘুমবিজ্ঞানীরা জানান, নিয়মিত ঘুমের সময়সূচি বজায় রাখা বিপাকীয় স্বাস্থ্য, মানসিক সুস্থতা এবং হৃদস্বাস্থ্যের জন্য উপকারী হতে পারে—এমন পর্যাপ্ত প্রমাণ রয়েছে।
অনিয়মিত ঘুম কেন ক্ষতিকর হতে পারে
বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, এর মূল কারণ শরীরের সার্কাডিয়ান রিদম বা জৈব ঘড়ি।
এই জৈব ঘড়ি প্রায় ২৪ ঘণ্টার একটি অভ্যন্তরীণ সময়চক্র, যা ঘুম-জাগরণের চক্র নিয়ন্ত্রণ করার পাশাপাশি হরমোন, বিপাকক্রিয়া, হৃদযন্ত্রের কার্যক্রম, রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা, ক্ষুধা এবং মেজাজের ওঠানামাও নিয়ন্ত্রণ করে।
যখন কেউ নিয়মিত ঘুমের সময়সূচি থেকে সরে যায়, তখন এই জৈব ছন্দের ওপর নির্ভরশীল শারীরিক প্রক্রিয়াগুলোও বিঘ্নিত হয়।
উদাহরণস্বরূপ, খুব দেরি করে জেগে থাকা বা অতিরিক্ত দেরিতে ঘুম থেকে ওঠা শরীরের হরমোনের ভারসাম্যে প্রভাব ফেলতে পারে। স্ট্রেস নিয়ন্ত্রণকারী হরমোন কর্টিসল তখন অস্বাভাবিক সময়ে বা অনিয়মিতভাবে নিঃসৃত হতে পারে। এর ফলে শরীরে দীর্ঘমেয়াদে চাপ ও প্রদাহ বাড়তে পারে, যা হৃদযন্ত্র বা বিপাকীয় স্বাস্থ্যের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
এছাড়া জৈব ছন্দের ব্যাঘাতের কারণে মানুষ অস্বাভাবিক সময়ে ক্ষুধা অনুভব করতে পারে। ফলে গভীর রাতে খাবার খাওয়ার প্রবণতা বাড়ে। এতে হজমের সমস্যা দেখা দিতে পারে এবং দীর্ঘমেয়াদে ওজন বৃদ্ধি বা স্থূলতার ঝুঁকি বাড়তে পারে।
কীভাবে ঘুমের সময়সূচি নিয়মিত রাখা যায়
কাজ, পড়াশোনা, পারিবারিক দায়িত্ব বা সামাজিক ব্যস্ততার কারণে নিয়মিত ঘুমের অভ্যাস বজায় রাখা অনেক সময় কঠিন হয়ে পড়ে। তবু বিশেষজ্ঞরা কয়েকটি সহজ উপায় অনুসরণের পরামর্শ দেন।
প্রতিদিন ঘুমানোর নির্ধারিত সময়ের এক ঘণ্টা আগে অ্যালার্ম সেট করা যেতে পারে। এটি শরীরকে মনে করিয়ে দেয় যে এখন ধীরে ধীরে বিশ্রামের জন্য প্রস্তুত হওয়ার সময়। সেই সময়ে বই পড়া, ধ্যান করা বা অন্য কোনো শান্ত কাজ করা ঘুমের জন্য শরীরকে প্রস্তুত করতে সাহায্য করে।

প্রতিদিন সকালে নির্দিষ্ট সময়ে সূর্যের আলোতে অন্তত ২০ থেকে ৩০ মিনিট থাকা গুরুত্বপূর্ণ। সম্ভব হলে বাইরে গিয়ে আলো গ্রহণ করা ভালো, যদিও মেঘলা আবহাওয়াতেও এই অভ্যাস উপকারী। প্রয়োজনে উজ্জ্বল কৃত্রিম আলো বা লাইট থেরাপি ব্যবহার করাও সহায়ক হতে পারে।
আলো আমাদের জৈব ঘড়ির প্রধান সংকেত। সকালে চোখে আলো পড়লে শরীর ধীরে ধীরে দিনের চক্র শুরু করে এবং সন্ধ্যার দিকে ঘুমের হরমোন নিঃসরণের জন্য প্রস্তুত হয়।
বিশেষজ্ঞরা বলেন, অনিয়মিত ঘুম সব সময় তৎক্ষণাৎ ক্লান্তি সৃষ্টি না-ও করতে পারে। তবু দীর্ঘমেয়াদি সুস্থতার জন্য নিয়মিত ঘুমের অভ্যাস বজায় রাখা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ যত বেশি নিয়মিত ঘুমের সময়সূচি অনুসরণ করা যায়, ততই দীর্ঘমেয়াদে স্বাস্থ্যের জন্য তা উপকারী হয়।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















