অনেকের ধারণা শক্তি বাড়াতে হলে অবশ্যই জিমে যেতে হবে বা ভারী ওজন তুলতে হবে। অনেকেই মনে করেন, নতুনদের জন্য হয়তো সাধারণ স্কোয়াট বা শরীরের ওজনের ব্যায়াম ঠিক আছে, কিন্তু সত্যিকারের শক্তি বাড়াতে হলে জিমের যন্ত্রপাতি দরকার।
কিন্তু গবেষণা বলছে বিষয়টি এতটা সহজ নয়। শরীরের ওজন ব্যবহার করে করা ব্যায়াম—যেমন হিপ ব্রিজ, ডিপস বা লাঞ্জ—অনেক ক্ষেত্রেই ওজন তুলে করা ব্যায়ামের মতোই কার্যকর হতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, পেশির জন্য আসল বিষয় হলো চাপ বা টেনশন। আপনি বেঞ্চ প্রেস করছেন নাকি পুশ-আপ দিচ্ছেন—পেশি তা আলাদা করে বোঝে না। নিউইয়র্ক সিটির সিটি ইউনিভার্সিটির ব্যায়ামবিজ্ঞান বিভাগের সহকারী অধ্যাপক অনুপ বালাচন্দ্রন বলেন, পেশির কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো কতটা চাপ পড়ছে।
তবে উভয় ধরনের ব্যায়ামেরই কিছু আলাদা সুবিধা রয়েছে।
শক্তি বাড়ানোর মূল রহস্য
শক্তি বাড়ানোর জন্য যেকোনো ধরনের ব্যায়ামে একটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ—পেশিকে প্রায় ক্লান্তির পর্যায়ে নিয়ে যাওয়া। অর্থাৎ এমনভাবে অনুশীলন করতে হবে, যাতে আর একবারও ঠিকমতো সেই ব্যায়াম করা সম্ভব না হয়।

অস্ট্রেলিয়ার কাইজার এক্সারসাইজ অ্যান্ড হেলথ ক্লিনিকের গবেষণা প্রধান ও ব্যায়ামবিজ্ঞানী জেমস স্টিল বলেন, শক্তি বাড়াতে হলে এমন পর্যায় পর্যন্ত ব্যায়াম করা দরকার, যেখানে সাময়িকভাবে আর চালিয়ে যাওয়া সম্ভব হয় না।
বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, শক্তি বাড়ানোর ক্ষেত্রে শরীরের ওজনের ব্যায়াম এবং ওজন তুলে করা ব্যায়াম প্রায় একই ধরনের ফল দিতে পারে।
২০২২ সালের একটি ছোট গবেষণায় দেখা যায়, যুক্তরাষ্ট্রের মিনেসোটায় কিছু নিয়মিত জিমে যাওয়া মানুষকে তিন সপ্তাহের জন্য তাদের জিমের ব্যায়ামের বদলে ঘরে বসে শরীরের ওজনের ব্যায়াম করতে বলা হয়। তিন সপ্তাহ পর দেখা যায়, তাদের শক্তি বৃদ্ধির ক্ষেত্রে বড় কোনো পার্থক্য হয়নি।
জাপানের আরেকটি পরীক্ষায় পুশ-আপ ও বেঞ্চ প্রেসের তুলনা করা হয়। ফলাফল দেখায়, দুটি ব্যায়ামই প্রায় একইভাবে পেশি ও শক্তি বৃদ্ধি করতে সাহায্য করেছে।
আরেকটি গবেষণায় দেখা যায়, একই ওজন রেখে পুনরাবৃত্তি বাড়ানো এবং একই সংখ্যক পুনরাবৃত্তি রেখে ওজন বাড়ানো—দুই পদ্ধতিই প্রায় সমান কার্যকর।
অর্থাৎ আসল বিষয় হলো পরিশ্রমের মাত্রা, আপনি কী তুলছেন তা নয়।

শরীরের ওজনের ব্যায়ামে উন্নতির উপায়
ওজন তুলে ব্যায়াম করলে অগ্রগতি বাড়ানো তুলনামূলক সহজ। শক্তি বাড়লে শুধু আরও বেশি ওজন যোগ করলেই হয়।
কিন্তু শরীরের ওজনের ব্যায়ামে উন্নতি করতে হলে কিছুটা সৃজনশীল হতে হয়। যেমন পুনরাবৃত্তির সংখ্যা বাড়ানো, রেজিস্ট্যান্স ব্যান্ড ব্যবহার করা অথবা একই ব্যায়ামের আরও কঠিন সংস্করণ করা।
উদাহরণ হিসেবে পুশ-আপের সময় পা একটি চেয়ারের ওপর রেখে করলে ব্যায়ামটি আরও কঠিন হয়ে যায় এবং পেশির ওপর চাপও বাড়ে।
ওজন তোলায় কি আঘাতের ঝুঁকি বেশি?
ওজন তোলার ক্ষেত্রে আঘাতের ঝুঁকি থাকতে পারে। তবে বেশিরভাগ সময় তা অতিরিক্ত চাপের কারণে পেশি ছিঁড়ে যাওয়ার জন্য নয়, বরং ওজন পড়ে যাওয়ার মতো দুর্ঘটনার কারণে ঘটে।
১৭ বছর ধরে জরুরি বিভাগে যেসব আঘাতের ঘটনা নথিভুক্ত হয়েছে, সেগুলোর বিশ্লেষণে দেখা গেছে—অনেক ক্ষেত্রে দুর্ঘটনার কারণ ছিল ওজন পড়ে যাওয়া।

কানাডার ম্যাকমাস্টার বিশ্ববিদ্যালয়ের কাইনেসিওলজি বিভাগের অধ্যাপক স্টুয়ার্ট ফিলিপস বলেন, পেশি বা জয়েন্টের আঘাতের ক্ষেত্রে কোন ধরনের ব্যায়ামে ঝুঁকি বেশি—এ বিষয়ে সরাসরি তুলনামূলক গবেষণা খুব কম হয়েছে। তবে ধারণা করা হয়, ভারী ওজন ব্যবহারের কারণে ওজন তোলায় চাপ কিছুটা বেশি হতে পারে।
তবে যেকোনো ধরনের ব্যায়ামের ক্ষেত্রেই সঠিক কৌশল শেখা, ধীরে ধীরে অগ্রগতি করা এবং ব্যায়ামের আগে শরীর গরম করা আঘাতের ঝুঁকি কমাতে সাহায্য করে।
যদি লক্ষ্য শুধু সুস্থ থাকা
সবাই শক্তিশালী শরীর গড়ার জন্য ব্যায়াম করেন না। অনেকেই শুধু সুস্থ থাকতে চান এবং বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে দৈনন্দিন কাজ সহজে করার মতো শক্তি ধরে রাখতে চান।
সে ক্ষেত্রে প্রতিবার ব্যায়ামে সম্পূর্ণ ক্লান্তির পর্যায়ে পৌঁছানো জরুরি নয়। কয়েকবার পুনরাবৃত্তি বাকি রেখেও ব্যায়াম শেষ করা যেতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্র, ব্রিটেন ও কানাডার বেশিরভাগ স্বাস্থ্য নির্দেশনায় সপ্তাহে অন্তত দুই দিন শক্তি বাড়ানোর ব্যায়াম করার পরামর্শ দেওয়া হয়। তবে জেমস স্টিল বলেন, গবেষণায় দেখা গেছে সপ্তাহে একবার করলেও অনেক উপকার পাওয়া যায়।

তবুও তিনি সপ্তাহে দুই দিন করার পরামর্শ দেন। কারণ কোনো সপ্তাহে একটি সেশন বাদ পড়লেও অন্তত ন্যূনতম উপকার পাওয়া সম্ভব।
নিয়মিত করাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ
বিশেষজ্ঞদের মতে, শক্তি বাড়ানোর ব্যায়ামের ধরন বা সংখ্যা যতটা গুরুত্বপূর্ণ, তার চেয়েও বেশি গুরুত্বপূর্ণ হলো নিয়মিত করা।
ব্রিটিশ কলাম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যায়ামবিষয়ক গবেষক জাসমিন মা বলেন, ব্যায়ামকে জীবনযাপনের অংশ করে তুলতে হবে। এটি যেন দাঁত ব্রাশ করার মতোই একটি অভ্যাস হয়ে যায়।
অর্থাৎ আপনি জিমে ওজন তুলুন বা নিজের শরীরের ওজন দিয়ে ব্যায়াম করুন—সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো ধারাবাহিকতা বজায় রাখা। নিয়মিত অনুশীলনই দীর্ঘমেয়াদে শক্তি ও সুস্থতা ধরে রাখতে সাহায্য করে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















