মধ্যপ্রাচ্যে ভূরাজনৈতিক উত্তেজনার কারণে তেলের দাম বাড়তে থাকায় চীনের দীর্ঘদিনের মূল্যহ্রাস সমস্যায় সামান্য স্বস্তি আসতে পারে। তবে অর্থনীতিবিদদের সতর্কবার্তা, তেলের দাম দ্রুত বাড়তে থাকলে এমন এক পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে যেখানে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি স্থবির থাকবে কিন্তু মূল্যস্ফীতি বাড়বে—যা চীনের অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারকে আরও জটিল করে তুলতে পারে।
তেলের দাম বাড়লে কেন বাড়ছে স্থবিরতার আশঙ্কা
পেকিং বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতির অধ্যাপক সু জিয়ান বলেন, তেলের দাম বাড়লে মূল্যস্ফীতি বাড়তে পারে, কিন্তু একই সঙ্গে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি কমে যেতে পারে এবং বেকারত্ব বাড়ার ঝুঁকি তৈরি হয়। অর্থনীতিতে এই পরিস্থিতিকেই সাধারণত স্থবির মূল্যস্ফীতি বা স্ট্যাগফ্লেশন বলা হয়।
তিনি উল্লেখ করেন, ইতিহাসে এর আগেও এমন ঘটনা ঘটেছে। ১৯৭৩ সালের ইয়ম কিপুর যুদ্ধের সময় এবং পরে ইরানের বিপ্লব ও ইরান–ইরাক যুদ্ধের সময় তেলের বড় ধরনের সংকট তৈরি হয়েছিল। সেই সময় তেল আমদানিনির্ভর অনেক দেশই একই ধরনের স্থবির মূল্যস্ফীতির মুখে পড়েছিল।
সু জিয়ানের মতে, তেলের দাম বাড়লে শিল্পকারখানার উৎপাদন ব্যয় বেড়ে যায়। ফলে অনেক প্রতিষ্ঠান উৎপাদন কমাতে বাধ্য হয় এবং কর্মী ছাঁটাই করে। একই সময়ে অর্থনীতি ধীরগতিতে চললেও পণ্যের দাম বাড়তে থাকে।

মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত ও বৈশ্বিক জ্বালানি বাজার
ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র–ইসরায়েল জোটের মধ্যে সামরিক উত্তেজনা বুধবার পঞ্চম দিনে গড়ায়। এই সংঘাত এমন একটি অঞ্চলে ঘটছে যা বিশ্বজুড়ে জ্বালানি সরবরাহ এবং সামুদ্রিক বাণিজ্যের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
এই পরিস্থিতিতে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম আরও বেড়েছে। বৈশ্বিক বাজারের অন্যতম প্রধান মানদণ্ড ব্রেন্ট ক্রুডের দাম প্রতি ব্যারেল ৮৪ ডলারের ওপরে উঠে গেছে, যা গত শুক্রবারের তুলনায় প্রায় ১৬ শতাংশ বেশি। একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ মানদণ্ড ওয়েস্ট টেক্সাস ইন্টারমিডিয়েট তেলের দামও ১৫ শতাংশ বেড়ে ৭৭ ডলারের ওপরে পৌঁছেছে।
চীনের অর্থনীতির জন্য এর তাৎপর্য
চীনের অর্থনীতি গত কয়েক বছর ধরে মূল্যহ্রাস বা ডিফ্লেশনের চাপের মধ্যে রয়েছে। দুর্বল অভ্যন্তরীণ চাহিদা এবং অতিরিক্ত সরবরাহের কারণে পণ্যের দাম দীর্ঘদিন ধরে চাপের মুখে।

গত বছর চীনের ভোক্তা মূল্যসূচক কার্যত স্থির ছিল। সরকার মূলত খাদ্য ও জ্বালানির দামের বড় পতনকেই এর প্রধান কারণ হিসেবে উল্লেখ করেছিল। নতুনভাবে পুনর্গঠিত সূচক অনুযায়ী চলতি বছরের জানুয়ারিতে মূল্যস্ফীতি বছরে এবং মাসে উভয় হিসাবেই মাত্র শূন্য দশমিক দুই শতাংশ বেড়েছে।
জাতীয় পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্য অনুযায়ী, আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম কমে যাওয়ার প্রভাবেই ২০২৫ সালে চীনে জ্বালানির দাম তিন দশমিক তিন শতাংশ কমেছিল। এতে ভোক্তা মূল্যসূচক শূন্য দশমিক দুই পাঁচ শতাংশ পয়েন্ট কমে যায়।
তেলের দাম বাড়লে কী হতে পারে
নাটিক্সিসের জ্যেষ্ঠ অর্থনীতিবিদ গ্যারি এনজি বলেন, আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির দাম বাড়লে চীনের ভোক্তা মূল্যসূচক কিছুটা বাড়বে। তবে যুদ্ধ কতদিন চলবে তার ওপরই এর প্রকৃত প্রভাব নির্ভর করবে।
তার মতে, তেলের ধাক্কা থেকে চীন অনেকটাই সুরক্ষিত অবস্থায় রয়েছে। কারণ দেশটির তেল আমদানির উৎস বৈচিত্র্যময়, দেশীয় উৎপাদন শক্তিশালী এবং খুচরা জ্বালানি মূল্য সরকার নিয়ন্ত্রণ করে।
তিনি বলেন, বর্তমান ভূরাজনৈতিক পরিস্থিতি আপাতত চীনের মূল্যস্ফীতির লক্ষ্যকে বড় ধরনের প্রভাবিত করবে না, বিশেষ করে যখন অভ্যন্তরীণ চাহিদা এখনো দুর্বল।
২০২৬ সালের অর্থনৈতিক লক্ষ্য ও নীতিনির্ধারণ
চীনের জাতীয় গণকংগ্রেস এবং রাজনৈতিক পরামর্শ সম্মেলনের বার্ষিক বৈঠক, যাকে সাধারণত “টু সেশনস” বলা হয়, সেখানে চলতি সপ্তাহেই ২০২৬ সালের অর্থনৈতিক লক্ষ্য ঘোষণা করা হতে পারে।
ধারণা করা হচ্ছে, সরকার এবারও মূল্যস্ফীতির লক্ষ্য সর্বোচ্চ দুই শতাংশের মধ্যে রাখবে। গত বছরও একই লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছিল, যখন দীর্ঘদিনের তিন শতাংশ লক্ষ্যমাত্রা কমিয়ে আনা হয়।
তবে পেকিং বিশ্ববিদ্যালয়ের সু জিয়ান সতর্ক করে বলেন, চীন একটি বড় তেল আমদানিকারক দেশ এবং এর বড় অংশ মধ্যপ্রাচ্য থেকে আসে। ফলে বৈশ্বিক জাহাজ চলাচলের রুটে বিঘ্ন ঘটলে চীন সরাসরি প্রভাবের মুখে পড়তে পারে।
তার মতে, এই ঝুঁকি মোকাবিলায় সরকার সরবরাহভিত্তিক নীতির দিকে যেতে পারে, যেমন কর ছাড় দিয়ে জ্বালানির বাড়তি ব্যয় সামাল দেওয়া। পাশাপাশি নীতিনির্ধারণের সময় মূল্যস্ফীতির পাশাপাশি কর্মসংস্থান ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিকেও সমান গুরুত্ব দিতে হবে।
সু জিয়ান বলেন, যুক্তরাষ্ট্র–ইরান সংঘাতের প্রভাব মূল্যবৃদ্ধির মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। এর চেয়ে বেশি গুরুত্ব দিতে হবে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও বেকারত্বের সম্ভাব্য প্রভাবের দিকে।

সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















