জাপানের পানীয় প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান সান্টোরি হোল্ডিংস ভারতের বাজারে বড় পরিকল্পনা নিয়ে এগোচ্ছে। স্থানীয়ভাবে তৈরি মিশ্র হুইস্কির মাধ্যমে ২০৩০ অর্থবছরের মধ্যে ভারতে তাদের হুইস্কি বিক্রি তিনগুণ করার লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে প্রতিষ্ঠানটি।
ভারতকে কৌশলগত বাজার হিসেবে দেখছে সান্টোরি
সান্টোরি হোল্ডিংসের প্রধান নির্বাহী নোবুহিরো তোরি জানান, বিশ্বের সবচেয়ে বড় হুইস্কি বাজার হিসেবে ভারতকে কোম্পানি এখন কৌশলগত অগ্রাধিকার দিচ্ছে। এ কারণে নয়াদিল্লির কাছাকাছি গুরগাঁওয়ে সান্টোরি গ্লোবাল স্পিরিটসের কারখানায় নতুন কর্মী নিয়োগও বাড়ানো হয়েছে।
নোবুহিরো তোরি আগে সান্টোরি বেভারেজ অ্যান্ড ফুডের প্রধান নির্বাহী ছিলেন। সেই সময় ২০১২ সালে কোম্পানি ভারতে সফট ড্রিংক বাজারে প্রবেশ করলেও প্রায় এক বছরের মধ্যেই সেখান থেকে সরে যেতে হয়েছিল। সেই অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে এবার হুইস্কির মাধ্যমে দ্রুত প্রবৃদ্ধি অর্জনের পরিকল্পনা করছে প্রতিষ্ঠানটি।
ভারতের বাজারে বিক্রির সীমাবদ্ধতা
ধর্মীয় বিধিনিষেধের কারণে ভারতে সব দোকানে মদ বিক্রির অনুমতি নেই। দেশটির প্রায় ৬৭ হাজার মদের দোকানের মধ্যে প্রায় অর্ধেক দোকানে সান্টোরির হুইস্কি ও অন্যান্য স্পিরিটস বিক্রি হয়।

ওকস্মিথ ব্র্যান্ড দিয়ে বাজারে প্রবেশ
সান্টোরি ২০১৪ সালে ভারতের হুইস্কি বাজারে প্রবেশ করে। সে সময় শুধুমাত্র ভারতের জন্য তৈরি স্থানীয়ভাবে মিশ্রিত বোরবন ও স্কচ হুইস্কির ব্র্যান্ড ‘ওকস্মিথ’ চালু করা হয়।
বর্তমানে এই ব্র্যান্ডের তিনটি ভিন্ন সংস্করণ রয়েছে, যেগুলো তিনটি আলাদা মূল্যস্তরে বাজারে বিক্রি হয়।
২০১৯ সালে বাজারে আনা সাধারণ ভোক্তাদের জন্য তৈরি সংস্করণের ৭৫০ মিলিলিটার বোতলের দাম রাজ্যভেদে করের কারণে প্রায় ৫০০ থেকে ২০০০ রুপি পর্যন্ত হয়ে থাকে। স্থানীয় খাবারের সঙ্গে এই হুইস্কি ভালো মানিয়ে যায় বলে মনে করা হয়।
ওকস্মিথ গোল্ড নামের মাঝারি দামের সংস্করণটি তার মসৃণ স্বাদ ও হালকা মিষ্টতার জন্য পরিচিত। এর দামও রাজ্যভেদে ভিন্ন। নয়াদিল্লির কাছের হরিয়ানা রাজ্যে একটি বোতলের দাম প্রায় ৮০০ রুপি, আর মুম্বাইয়ের মহারাষ্ট্র রাজ্যে তা প্রায় ১৬০০ রুপি।
২০২৫ সালের জুলাই মাসে সান্টোরি প্রিমিয়াম মানের ‘ওকস্মিথ নাগোমি’ বাজারে আনে। এটি মূলত উচ্চ আয়ের গ্রাহকদের লক্ষ্য করে তৈরি করা হয়েছে এবং এর দাম মাঝারি মানের পণ্যের তুলনায় প্রায় তিনগুণ বেশি।
বিক্রি দ্রুত বাড়ছে

২০২৫ অর্থবছরে সান্টোরি ওকস্মিথ হুইস্কির প্রায় ১৫ লাখ কেস বিক্রি করেছে, যা আগের বছরের তুলনায় ৪৫ শতাংশ বেশি। কোম্পানির লক্ষ্য ২০৩০ অর্থবছরের মধ্যে এই বিক্রি ৫০ লাখ কেসে পৌঁছানো।
ভারতের বিশাল হুইস্কি বাজার
প্রায় ১৪০ কোটি মানুষের দেশ ভারত বর্তমানে বিশ্বের সবচেয়ে বড় হুইস্কি বাজার। গবেষণা প্রতিষ্ঠান ইউরোমনিটরের হিসাব অনুযায়ী, ২০২৪ সালে ভারতে প্রায় ২২৯ কোটি লিটার হুইস্কি পান করা হয়েছে, যা দ্বিতীয় বৃহত্তম বাজার যুক্তরাষ্ট্রের তুলনায় চার গুণেরও বেশি।
বিশেষজ্ঞদের ধারণা, ২০২৯ সালের মধ্যে ভারতে হুইস্কি ব্যবহারের পরিমাণ ৩০০ কোটি লিটার ছাড়িয়ে যেতে পারে, যা ২০২৪ সালের তুলনায় প্রায় ৩০ শতাংশ বেশি।
ভারতের সংস্কৃতিতে হুইস্কির প্রভাব
ব্রিটিশ শাসনের ইতিহাসের কারণে ভারতে হুইস্কির জনপ্রিয়তা গভীরভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। প্রতি বছর প্রায় দুই কোটি মানুষ দেশটিতে প্রাপ্তবয়স্ক হওয়ার বয়সে পৌঁছায়, ফলে সম্ভাব্য নতুন ভোক্তার সংখ্যা দ্রুত বাড়ছে।

নোবুহিরো তোরি বলেন, জাপানের মতো ভারতে এমন বার বা পানশালা তৈরি করা গুরুত্বপূর্ণ যেখানে হুইস্কিভিত্তিক পানীয় পরিবেশন করা হবে। জাপানে জনপ্রিয় ‘কাকু হাইবল’—যেখানে বরফের সঙ্গে সোডা পানি ও হুইস্কি মিশিয়ে পরিবেশন করা হয়—সেই অভিজ্ঞতা থেকেই ভারতে হুইস্কির প্রচার বাড়াতে চায় সান্টোরি।
তীব্র প্রতিযোগিতার বাজার
তবে ভারতের বাজারে প্রতিযোগিতা খুবই তীব্র। ফ্রান্সের পারনো রিকার্ড এবং যুক্তরাজ্যভিত্তিক ডিয়াজিও—এই দুই বিশ্বনেতা প্রতিষ্ঠান মিলেই প্রায় অর্ধেক বাজার দখল করে আছে। সেখানে সান্টোরির বাজার অংশ এখনো তুলনামূলক ছোট।
নতুন বাজারের খোঁজে পানীয় কোম্পানিগুলো
জাপানসহ উন্নত দেশগুলোতে স্বাস্থ্যসচেতনতা বাড়ার কারণে হুইস্কি ও বিয়ার বিক্রি ধীরগতিতে বাড়ছে। ফলে জনসংখ্যা দ্রুত বাড়ছে এমন উন্নয়নশীল দেশগুলো এখন মদ প্রস্তুতকারী কোম্পানিগুলোর কাছে নতুন সুযোগের বাজার হয়ে উঠছে।

জাপানের আরেক পানীয় প্রতিষ্ঠান আসাহি গ্রুপ হোল্ডিংস প্রায় ৩০০ কোটি ডলারে ডিয়াজিওর একটি সহযোগী প্রতিষ্ঠান কিনে ২০২৬ সালের দ্বিতীয়ার্ধে কেনিয়া ও পূর্ব আফ্রিকার আরও দুটি দেশে প্রবেশের পরিকল্পনা করছে। একইভাবে সাপ্পোরো হোল্ডিংস দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়াকে সম্ভাবনাময় বাজার হিসেবে বিবেচনা করছে এবং ডেনমার্কের কার্লসবার্গের বিতরণ নেটওয়ার্ক ব্যবহার করে সেখানে বিয়ার বিক্রি বাড়াতে চায়।
সান্টোরির বৈশ্বিক ব্যবসায় চাপ
সান্টোরি হোল্ডিংসের বিদেশি ব্যবসা বর্তমানে চাপের মধ্যে রয়েছে। ২০২৫ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত অর্থবছরে কোম্পানির নিট মুনাফা আগের বছরের তুলনায় ৫১ শতাংশ কমে প্রায় ৮৬৫০ কোটি ইয়েনে নেমে এসেছে।
যুক্তরাষ্ট্রে উচ্চমূল্যের কারণে মধ্যবিত্ত ভোক্তাদের মধ্যে স্পিরিটস পানীয়ের ব্যবহার কমে যাওয়ায় বিক্রি কমেছে। এই পরিস্থিতিতে সান্টোরির জন্য ভারতের বাজারে শক্ত অবস্থান তৈরি করা ভবিষ্যতের পুনরুদ্ধারের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















